অনলাইন ডেস্ক
শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬ প্রিন্ট ১৯ বার পঠিত
একসময় দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিপর্যস্ত ছিল চীন। সেই দেশই কয়েক দশকের ব্যবধানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে চীন এখন বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার অন্যতম প্রধান শক্তি।
২০১০ সালে জাপানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির অবস্থান নেয় চীন। এর মধ্য দিয়ে দেশটির অর্থনৈতিক উত্থান নতুন মাত্রা পায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং ভূরাজনীতিতে বেইজিংয়ের প্রভাবও বাড়তে থাকে।
কেন চীনের এই উত্থান এত গুরুত্বপূর্ণ? এর উত্তর বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে দেশটির ইতিহাস, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং বিশ্বব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের কৌশলের দিকে।
চীনের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর দেশটির অর্থনীতি দ্রুত বদলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এসব উদ্যোগের কিছু ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ও ডেকে আনে।
১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে চীনের তৎকালীন নেতা মাও সেতুং কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে দ্রুত শিল্পায়িত করার লক্ষ্যে ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচি চালু করেন। কিন্তু পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হয় এবং ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, এ দুর্ভিক্ষে এক থেকে চার কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
এরপর ১৯৬০-এর দশকে শুরু হওয়া সাংস্কৃতিক বিপ্লব দেশটির অর্থনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামোয় আরও বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করে।
তবে ১৯৭৬ সালে মাও সেতুংয়ের মৃত্যুর পর চীনের অর্থনৈতিক নীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। দেং শিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে শুরু হয় সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের নতুন অধ্যায়।
কৃষকদের উৎপাদন ও জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি স্বাধীনতা দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, বাণিজ্যের বাধা কমানো এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ আরও বাড়ে। কম শ্রমব্যয় ও উৎপাদন খরচের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে চীন আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
বিপুল বিদেশি পুঁজি, সস্তা শ্রম, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের সমন্বয়ে ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যতম উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয় দেশটি।
১৯৯০-এর দশকে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যোগ দেওয়ার পর দেশটির রপ্তানি আরও সম্প্রসারিত হয়।
শুল্ক ও বাণিজ্যবাধা কমে আসায় আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা পণ্যের প্রবেশ সহজ হয়। ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রপাতি, পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানিতে দেশটি শক্ত অবস্থান তৈরি করে।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের উদ্ধৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭৮ সালে চীনের রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের ১ শতাংশেরও কম। ১৯৮৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ বিলিয়ন ডলারে।
পরবর্তী কয়েক দশকে চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। তবে ৪.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের যে রপ্তানির পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হয়েছে, সেটির নির্দিষ্ট বছর ও পরিমাপের ভিত্তি যাচাই করা প্রয়োজন।
চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের অন্যতম বড় অর্জন হলো দারিদ্র্য হ্রাস। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, কয়েক দশকের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে দেশটিতে প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে।
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, নগরায়ণ, কর্মসংস্থান এবং অবকাঠামো উন্নয়ন এ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
একই সঙ্গে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নেও বিনিয়োগ বেড়েছে। উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের ফলে দেশটির কর্মশক্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত মানুষের অংশ বাড়ছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের কর্মশক্তির প্রায় ২৭ শতাংশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা থাকতে পারে।
তবে অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠলেও মাথাপিছু আয়ের বিচারে চীন এখনো অনেক উন্নত অর্থনীতির তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্য হিসেবে উদ্ধৃত পরিসংখ্যানে দেশটির বার্ষিক মাথাপিছু আয় প্রায় ১৩ হাজার ৮৬১ ডলার বলা হয়েছে। এ ধরনের পরিসংখ্যান তুলনার ক্ষেত্রে কোন বছরের তথ্য এবং কোন পদ্ধতিতে আয় গণনা করা হয়েছে, তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
চীনের উত্থান শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গল্প নয়; এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনেরও গল্প।
একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে চীন বিদ্যমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও নিয়মের কাঠামোর মধ্যেই নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার দিকে বেশি মনোযোগী ছিল। অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণেও দেশটি আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে।
চীনের বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের কৌশলকে মোটামুটি চারটি ভাগে দেখা যায়।
প্রথমত, জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো প্রতিষ্ঠানে নিজেদের ভূমিকা বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনীতিতে প্রভাব বিস্তার করা। তৃতীয়ত, নিজস্ব উদ্যোগে নতুন আন্তর্জাতিক আর্থিক ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। চতুর্থত, বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার প্রচলিত নিয়ম ও কাঠামোয় পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
২০১০ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও চীনের গুরুত্ব আরও দৃশ্যমান হয়। একই সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় চীনা নাগরিকদের শীর্ষ পদে নিয়োগ পাওয়ার ঘটনাও বাড়তে থাকে।
২০০৬ সালে মার্গারেট চ্যান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক নির্বাচিত হন। তাঁর মেয়াদে ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংস্থাটির উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থার নেতৃত্বে কোনো দেশের নাগরিকের উপস্থিতি থাকলেই সংশ্লিষ্ট সংস্থার নীতিতে সেই দেশের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় চীন অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সচল রাখতে প্রায় ৫৮০ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর লক্ষ্য ছিল বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম ধরে রাখা।
এ সময় চীন আন্তর্জাতিক অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে নিজেদের ভূমিকা তুলে ধরে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও অন্যান্য প্রচারমাধ্যমেও দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অবদানের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
পরবর্তী সময়ে চীনের অর্থনৈতিক শক্তি আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ভূরাজনীতিতে দেশটির অবস্থানকে আরও প্রভাবশালী করে তোলে।
বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ এখন আর শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল নয়। চীনসহ একাধিক শক্তিশালী অর্থনীতির উত্থানে বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই বহুমেরুকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও নিরাপত্তার মতো বিষয়ে বিভিন্ন দেশের স্বার্থের সংঘাতও বাড়ছে।
তবে চীনের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। মাথাপিছু আয়, অভ্যন্তরীণ চাহিদা, জনসংখ্যার বার্ধক্য, কর্মসংস্থান এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ে বিরোধ দেশটির অর্থনীতির ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে।
সব মিলিয়ে, কয়েক দশকের অর্থনৈতিক সংস্কার ও শিল্পায়নের মধ্য দিয়ে চীন যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তা বিশ্বরাজনীতির হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই অর্থনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বেইজিং কতটা আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতা বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যাবে।
Posted ০৪:৫৬ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | Animator Alif
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com