অনলাইন ডেস্ক
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ৯ বার পঠিত
বিস্কুট-স্ন্যাকস থেকে মসলা ও চাল—বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের পরিধি বাড়ছে মালয়েশিয়ার খুচরা বাজারে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের গণ্ডি পেরিয়ে স্থানীয় ও অন্যান্য দেশের ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন রপ্তানিকারকরা।
কুয়ালালামপুর: মালয়েশিয়ার বড় সুপারশপ থেকে শুরু করে পাড়ার মুদি দোকান—বিভিন্ন খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে বাংলাদেশি খাদ্যপণ্য। বিস্কুট, নুডলস, জুস, স্ন্যাকস, মসলা, চাল, ডাল ও রান্নার তেলের পাশাপাশি নানা ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাবারও জায়গা করে নিচ্ছে দেশটির বাজারে।
বাংলাদেশি ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিস্তৃত উপস্থিতি রয়েছে প্রাণের। প্রায় দেড় দশক ধরে মালয়েশিয়ায় কার্যক্রম চালিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানটি এখন বড় খুচরা চেইনের পাশাপাশি নিজস্ব বিতরণব্যবস্থার মাধ্যমে পণ্য বাজারজাত করছে।
প্রাণের বাইরে এসিআই ফুডসের ‘পিওর’ ও ‘ফান’, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের বিস্কুট ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য এবং আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ‘আফি’, ‘স্পিড’ ও ‘ক্লেমন’-এর মতো ব্র্যান্ডও মালয়েশিয়ার বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। তবে এসব ব্র্যান্ডের বাজার উপস্থিতি প্রাণের তুলনায় এখনো সীমিত।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের চাহিদার শুরুটা মূলত বাংলাদেশি অভিবাসীদের ঘিরেই। দেশটিতে প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন বলে বিভিন্ন সরকারি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে জানা যায়। তবে দুই দেশের সরকারি পরিসংখ্যানে এ সংখ্যা নিয়ে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য শুধু প্রবাসী বাংলাদেশি নয়। মালয়েশীয়দের পাশাপাশি ভারতীয়, ইন্দোনেশীয়, নেপালি এবং অন্যান্য অভিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছেও পণ্য পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এ জন্য পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি খুচরা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, প্যাকেজিং এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে মালয়েশিয়ায় তাদের কার্যক্রম চলছে। প্রতিষ্ঠানটির কৌশলগত অংশীদার পিনাকল ফুডস (এম) এসডিএন মালয়েশিয়ায় প্রাণের পণ্য বাজারজাত করছে।
বর্তমানে প্রায় ৮৫০ ধরনের প্রাণ পণ্য দেশটির বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। তালিকায় রয়েছে পানীয়, বিস্কুট, স্ন্যাকস, চাল, মসলা, আচার, নুডলস ও ক্যানজাত খাবারসহ বিভিন্ন পণ্য।
মালয়েশিয়ার মাইদিন, কেকে সুপার মার্ট, ইকনসেভ, জায়ান্ট, এইওন, এনএসকে, এইওন বিগ, লোটাস, এসটি রোজিয়াম মার্ট, সেগি ফ্রেশ ও লুলুর মতো খুচরা চেইনে প্রাণের পণ্য পাওয়া যায়। নির্বাচিত পেট্রোনাস ও শেল স্টেশনেও এসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে।
ফলে বাংলাদেশি ক্রেতাদের পাশাপাশি স্থানীয় ভোক্তাদের কাছেও ব্র্যান্ডটির পরিচিতি বাড়ছে।
মালয়েশিয়ার বাজারে শুধু পণ্য আমদানি করেই থেমে থাকেনি পিনাকল। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব বিতরণ অবকাঠামোও গড়ে তুলেছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম ভুইয়ার তথ্য অনুযায়ী, সুঙ্গাই বুলোহেতে প্রায় ৫ একর জায়গায় একটি কেন্দ্রীয় ওয়্যারহাউজ রয়েছে। পাশাপাশি কুয়ালালামপুর, কোটাবারু, জোহর বাহরু, ইপোহ, পেনাং, মালাক্কা, তেরেংগানু, কুয়ানতান ও সাবাহতে আঞ্চলিক ওয়্যারহাউজ পরিচালিত হচ্ছে।
পণ্য সরবরাহে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রায় ১৫০টি ব্র্যান্ডেড গাড়ি। বিপণন ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে কাজ করছেন প্রায় ৭০০ জন। তাদের বেশিরভাগ বাংলাদেশি হলেও মালয়েশিয়ার শ্রম আইন অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের কর্মীরাও প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
সেলিমের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে বাংলাদেশ থেকে গড়ে প্রায় ৩০০ কনটেইনার পণ্য আমদানি করে পিনাকল। মালয়েশিয়া ও আশপাশের বাজার মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ ৭ কোটি ডলারের বেশি এবং ব্যবসা বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির।
মালয়েশিয়ার বাজারের জন্য সব পণ্য বাংলাদেশ থেকে আনা হচ্ছে না। কিছু পণ্য স্থানীয়ভাবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে।
নারকেলের পানি, পানীয়, এনার্জি ড্রিংক, বিস্কুট, স্ন্যাকস, কনডেন্সড মিল্ক, চাল, ডাল ও রান্নার তেলের মতো কিছু পণ্য মালয়েশিয়া ও আশপাশের দেশে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ভারত থেকে চাল, মিয়ানমার থেকে ইলিশ এবং পাকিস্তান থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে পুনরায় প্যাকেটজাত ও বাজারজাত করা হচ্ছে।
অর্থাৎ মালয়েশিয়াকে শুধু একটি রপ্তানি বাজার হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক খাদ্যপণ্যের বাজার হিসেবেও ব্যবহার করার চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিতরণ ব্যবসার পাশাপাশি নিজস্ব খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রেও প্রবেশ করেছে পিনাকল।
‘পাসার রায়া পিনাকল’ নামে কুয়ালালামপুরের আশপাশে বর্তমানে তিনটি দোকান পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। ভবিষ্যতে এই নেটওয়ার্ক আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
এ ধরনের নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের সরাসরি বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি ভোক্তাদের পছন্দ ও চাহিদা বোঝার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।
মালয়েশিয়ার বড় মুসলিম ভোক্তা বাজার এবং শক্তিশালী হালাল অর্থনীতি বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
মালয়েশিয়া হালাল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির হালাল পণ্য রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ১০ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৬৮৫ কোটি ২০ লাখ রিঙ্গিতে পৌঁছেছে। এর মধ্যে খাদ্য ও পানীয় খাতের রপ্তানি ছিল ৩৬৮ কোটি ৬০ লাখ রিঙ্গিত, যা মোট হালাল রপ্তানির ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
এই বড় বাজারে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের আরও বিস্তারের সুযোগ রয়েছে। তবে এজন্য শুধু বাংলাদেশি ক্রেতাদের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; স্থানীয় ভোক্তাদের পছন্দ ও বাজারের মানদণ্ডও বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সামগ্রিক বাণিজ্য বাড়লেও খাদ্যপণ্য এখনো বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে বড় অংশ দখল করতে পারেনি।
মালয়েশিয়া সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ২১৮ কোটি রিঙ্গিত। এর মধ্যে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ায় প্রায় ২১০ কোটি রিঙ্গিতের পণ্য রপ্তানি করেছে। বিপরীতে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে প্রায় ১ হাজার ৮ কোটি রিঙ্গিতের পণ্য।
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, বস্ত্র ও জুতা। তবে বাংলাদেশ হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সবজি, আলু, শস্য, ফলের জুস, মাছ, ওষুধ, প্লাস্টিক, চা ও মসলাসহ আরও বেশ কিছু পণ্যও মালয়েশিয়ায় রপ্তানি হচ্ছে।
মালয়েশিয়ার খাদ্যবাজারে আরও বড় পরিসরে প্রবেশের ক্ষেত্রে হালাল সনদ, খাদ্যনিরাপত্তা, প্যাকেজিং এবং স্থানীয় বাজারের নিয়ম মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পিনাকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিমের মতে, হালাল সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের রপ্তানি আরও বাড়তে পারে।
তবে মালয়েশিয়ার বৃহত্তর ভোক্তা বাজারে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দাম, পণ্যের স্বাদ, প্যাকেজিং, সনদ এবং সরবরাহব্যবস্থার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের কাছে দেশের পরিচিত ব্র্যান্ডগুলোর উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই আলাদা আকর্ষণ তৈরি করছে।
আইএনটিআই ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রাকিবুল হারিস প্রায় এক বছর ধরে মালয়েশিয়ায় রয়েছেন। তার মতে, দেশটিতে বাংলাদেশি পণ্য দেখলে ভালো লাগে এবং প্রয়োজন হলে তিনি প্রাণের মতো পরিচিত ব্র্যান্ডের পণ্য কেনেন।
তবে বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের ভবিষ্যৎ বাজার কেবল প্রবাসী বাংলাদেশিদের ওপর নির্ভরশীল থাকবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ মালয়েশিয়ার মূলধারার ভোক্তাদের কাছে পণ্যকে পরিচিত করানো গেলে বাজারের পরিসর আরও বড় হতে পারে।
সব মিলিয়ে, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের উপস্থিতি এখন আর শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের দোকানকেন্দ্রিক নয়। বড় খুচরা চেইন, নিজস্ব বিতরণব্যবস্থা ও স্থানীয় বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে কিছু বাংলাদেশি ব্র্যান্ড ধীরে ধীরে মূলধারার বাজারে জায়গা তৈরির চেষ্টা করছে।
এই প্রবণতা কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করবে পণ্যের মান, মূল্য, হালাল ও খাদ্যসনদ, স্থানীয় ভোক্তার চাহিদা এবং কার্যকর বিতরণব্যবস্থার ওপর।
Posted ০২:৫৮ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | Animator Alif
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com