|

Advertisement
×

মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ থমকে, চালু কারখানা মাত্র ১৬টি

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬   প্রিন্ট   ১৭ বার পঠিত

মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ থমকে, চালু কারখানা মাত্র ১৬টি

৩৩ হাজার একরের মেগা প্রকল্পে অবকাঠামো ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, নেই শ্রমিকদের পর্যাপ্ত আবাসন

দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার এক দশক পরও চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এনএসইজেড) প্রত্যাশিত গতি পায়নি। অবকাঠামোগত বিলম্ব, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহসংকট এবং শ্রমিকদের আবাসনসহ প্রয়োজনীয় সহায়ক সুবিধার অভাবে বিশাল এই শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগ ও শিল্পকারখানা চালুর অগ্রগতি ধীরগতিতে চলছে।

৩৩ হাজার একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এখানে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে মাত্র ১৬টি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক উৎপাদনে গেছে। নির্মাণাধীন রয়েছে আরও ১৫টি প্রতিষ্ঠান।

সম্প্রতি বেজা ইনভেস্ট বাংলাদেশে একীভূত হয়েছে।

এ পর্যন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলটির মাত্র ৫ হাজার ৫০০ একর জমি উন্নয়ন করা হয়েছে এবং ১৩৪টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়িত বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে স্থানীয় উৎস থেকে ১২ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা এবং বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) থেকে ১৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অঞ্চলটিতে সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৮ হাজার মানুষের।

রপ্তানির চিত্রও হতাশাজনক। এ পর্যন্ত এনএসইজেডের কারখানাগুলো থেকে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৭২ লাখ ডলারের পণ্য। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে ৪ হাজার কোটি ডলারের রপ্তানি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

২০২৬ সালের মধ্যে ৫৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ২ লাখ ৩৮ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছিল বেজা। এ ছাড়া সংশ্লিষ্টদের পূর্বাভাস ছিল, দশকের শেষ নাগাদ মোট বিনিয়োগ ১ হাজার ৯০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

জমি বরাদ্দেও দীর্ঘসূত্রতা

বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, জমি বরাদ্দ পেলেও অনেক ক্ষেত্রে কারখানা নির্মাণের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। জমির সীমানা নির্ধারণ, উন্নয়নকাজ এবং আনুষ্ঠানিকভাবে প্লট বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় বিলম্বের কারণে আটকে আছে বিভিন্ন প্রকল্প।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতিকে (বিজিএমইএ) প্রায় ৫০০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও এর কিছু অংশের সীমানা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি কিংবা আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়নি।

বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, বিনিয়োগকারীরা অর্থ পরিশোধসহ প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ করেও অপেক্ষায় রয়েছেন।

তিনি বলেন, প্লট বুঝিয়ে দেওয়া, সড়ক নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগকারীরা কারখানা চালুর উদ্যোগ নিতে পারবেন। এসব সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে চাইবেন না।

গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানির সংকটে উদ্বেগ

শিল্পাঞ্চলটিতে উৎপাদন শুরু করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে কারখানা স্থাপন করা মডার্ন সিনটেক্সের জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক সফল বড়ুয়া বলেন, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান লাভজনকভাবে পরিচালনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সরবরাহ অপরিহার্য।

তিনি জানান, এখনো অনেক কারখানাকে পানির জন্য ভূগর্ভস্থ উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। স্থায়ী ইউটিলিটি সংযোগ চালু না হওয়া পর্যন্ত নতুন বিনিয়োগকারীরা এ অঞ্চলে বিনিয়োগের বিষয়ে সতর্ক থাকবেন।

বেজা জানিয়েছে, অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে পানি সরবরাহের অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। পরিকল্পিত ৩৮টি পাম্প হাউসের মধ্যে ১৫টি চালু হয়েছে। একটি পানি শোধনাগার নির্মাণাধীন রয়েছে। এর প্রথম পর্যায়ের কাজ ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ পর্যায়ে দৈনিক ৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অঞ্চলটির গ্রিডে ট্রান্সফরমারের মোট সক্ষমতা ২ হাজার ২৮০ এমভিএ। পল্লী বিদ্যুতায়ন এলাকার আওতায় সংযুক্ত লোড প্রায় ২৩০ মেগাওয়াট, যেখানে সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ৬০ মেগাওয়াট।

এ ছাড়া কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি তিনটি স্টেশন স্থাপন করেছে। এসব স্টেশনের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছে বেজা।

শ্রমিকদের আবাসন ও নিরাপত্তার অভাব

শিল্পাঞ্চলটির ভৌগোলিক অবস্থানও বিনিয়োগ ও জনবল ব্যবস্থাপনায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। প্রধান মহাসড়ক থেকে ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে এবং উপকূলসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় পণ্য পরিবহন ও শ্রমিকদের যাতায়াতে বাড়তি চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা এসকিউ ইলেকট্রিক্যালসের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা এহসানুল কবির নিজামী বলেন, কর্মী নিয়োগ ও ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

তাঁর ভাষ্য, রাতে এলাকাটি নির্জন ও অন্ধকার হয়ে যায়। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয় এবং সেখানে কাজ করতে তাঁরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।

সরকারের ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) ব্যবস্থাও আরও কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, পরিবেশ ছাড়পত্র, অগ্নিনিরাপত্তা, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন অনুমোদনের জন্য বিনিয়োগকারীদের এখনো একাধিক সরকারি সংস্থার সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ করতে হয়।

বেজার দাবি, ওএসএস পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে ৬২ ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থার সঙ্গে এর সমন্বয় প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ চলছে।

এদিকে শ্রমিকদের আবাসনসংকট মোকাবিলায় সাব-জোন ১৮-তে স্বল্প ব্যয়ের আবাসন নির্মাণ করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, শিল্পাঞ্চলের উন্নয়নের সঙ্গে শ্রমিকদের জন্য আবাসন ও সামাজিক অবকাঠামোও গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, এখানে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের জন্য আশপাশে পর্যাপ্ত আবাসন নেই। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও আবাসন নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন হবে না।

সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণেও ধীরগতি

শিল্পাঞ্চলটির প্রয়োজনীয় সহায়ক স্থাপনাগুলোর নির্মাণকাজও এখনো শেষ হয়নি। বেজার দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র ও শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের নির্মাণকাজ ৮৭ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। পরিবেশ পরীক্ষাগারের কাজ শেষ হয়েছে ৯৪ শতাংশ এবং জরুরি সাড়াদান কেন্দ্রের কাজ ৭২ শতাংশ।

এনএসইজেডের সাবেক পরামর্শক আবদুল কাদের খান মনে করেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পরিষেবা নিশ্চিত করা গেলে অঞ্চলটি দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ১৪ লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।

তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ সড়ক, পানি সরবরাহব্যবস্থা, গ্যাস পাইপলাইন ও বিদ্যুৎ গ্রিডের উন্নয়ন সমন্বিতভাবে করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি।

দেশীয় বড় শিল্পগোষ্ঠী ও চীনা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে এ অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি নিয়েছে। তবে বরাদ্দ পাওয়া জমিকে দ্রুত ব্যবহারোপযোগী শিল্পপ্লটে রূপান্তর করাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ।

‘অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী প্রকল্প’

ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেছেন, এনএসইজেড ছিল অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী একটি প্রকল্প। এর প্রাথমিক প্রত্যাশা ও বাস্তব অগ্রগতির মধ্যে ব্যবধান কমানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট একটি জাতীয় সমস্যা। শুধু পৃথক অর্থনৈতিক অঞ্চলের সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে এ সংকট দূর করা সম্ভব নয়। সরকার দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছে, তবে প্রয়োজনীয় সব বিকল্প ও সক্ষমতা একসঙ্গে না থাকায় বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষা করতে হবে।

নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আশিক চৌধুরী আশা প্রকাশ করেন, আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে। নজরদারি জোরদার এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের জন্য ডিজিটাল পর্যবেক্ষণব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে একটি হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে এ বিষয়ে অগ্রগতি সামান্য। বিদ্যমান এক বা দুটি ভবনকে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে রূপান্তর করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ জন্য সরকারি সহায়তা প্রয়োজন হবে বলেও জানান তিনি।

বিনিয়োগের সম্ভাবনা কাজে লাগানোই এখন চ্যালেঞ্জ

বিশাল জমি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের আগ্রহ এবং বিপুল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল এখনো প্রত্যাশিত শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হতে পারেনি। জমি হস্তান্তরে দীর্ঘসূত্রতা, নিরবচ্ছিন্ন ইউটিলিটি সেবার ঘাটতি, শ্রমিকদের আবাসন ও নিরাপত্তার অভাব এবং অনুমোদনপ্রক্রিয়ার জটিলতা দূর করা না গেলে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ কঠিন হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটির সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে দ্রুত অবকাঠামো নির্মাণ, নির্ভরযোগ্য গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি সরবরাহ, শ্রমিকদের জন্য আবাসন এবং সরকারি সেবার সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরও দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।

Facebook Comments Box

Posted ১০:০৪ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com