অনলাইন ডেস্ক
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ৭ বার পঠিত
চার বছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি ৪৫.১ শতাংশ কমেছে। ১৫ বছরের হিসাবে পতন ৪১.৫ শতাংশ। একই সময়ে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিও নেমেছে এক দশকের সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
নতুন কারখানা স্থাপন, উৎপাদন লাইন সম্প্রসারণ ও শিল্প সক্ষমতা বাড়ানোর অন্যতম প্রধান সূচক মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি। বাংলাদেশে সেই আমদানিতেই গত কয়েক বছর ধরে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে মূলধনি যন্ত্রপাতি, চিকিৎসাসামগ্রী, যানবাহন ও ভারী সরঞ্জামসহ সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি ৪৫.১ শতাংশ কমেছে।
২০২১-২২ অর্থবছরে এসব পণ্যের আমদানি ছিল প্রায় ২২ লাখ ৬০ হাজার টন। তিন বছর ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ১২ লাখ ৪০ হাজার টনে। পরের অর্থবছরে কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়ে ২০২৫-২৬ সালে আমদানি বেড়ে ১৪ লাখ ১০ হাজার টনে পৌঁছায়—আগের বছরের তুলনায় ১৩.৭ শতাংশ বেশি।
তবে সাম্প্রতিক এই বৃদ্ধির পরও দীর্ঘমেয়াদি চিত্রে বিনিয়োগের দুর্বলতার ইঙ্গিত রয়েছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে এসব পণ্যের আমদানি ছিল ২৪ লাখ ১০ হাজার টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ১৪ লাখ ১০ হাজার টনে। অর্থাৎ ১৫ বছরে সম্মিলিত আমদানির পরিমাণ কমেছে ৪১.৫ শতাংশ।
আমদানির পরিমাণ কমলেও মূল্যমানের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থবছরে এসব পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ১৩ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা—বৃদ্ধি ১৫২.৭ শতাংশ।
অর্থাৎ দেশে প্রবেশ করা যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের ভৌত পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও, সেগুলোর পেছনে ব্যয় বেড়েছে। তবে এই ব্যবধানের পুরোটা কেবল মূল্যস্ফীতি বা টাকার অবমূল্যায়নের কারণে হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত কাস্টমসের পরিসংখ্যান থেকে এককভাবে দেওয়া যায় না। আমদানিকৃত পণ্যের ধরন ও দামের পরিবর্তনও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
যন্ত্রপাতি আমদানির নিম্নমুখী প্রবণতার সঙ্গে একই সময়ে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিতেও উল্লেখযোগ্য ধীরগতি দেখা গেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.১৮ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৩.৭১ শতাংশে এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও নেমে ২.৮৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি গত এক দশকের মধ্যে শিল্প খাতের সবচেয়ে ধীর প্রবৃদ্ধি।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, উচ্চ সুদহার, অর্থায়নের সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, এলসি খোলার জটিলতা এবং গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা শিল্প বিনিয়োগের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
তবে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে বলেই দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ একই হারে কমেছে—এমন সরাসরি সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ বিনিয়োগের পরিমাণ নির্ধারণে দেশীয় অর্থায়ন, সেবা খাত, নির্মাণ এবং অন্যান্য উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরীর মতে, অর্থায়ন ও ইউটিলিটি সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়ীরা বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে আগের তুলনায় বেশি সতর্ক।
তার মতে, বড় টেক্সটাইল কারখানা স্থাপনে বিপুল মূলধনের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ এবং তুলনামূলক কম খরচের অর্থায়ন প্রয়োজন। এসব বিষয়ে নিশ্চয়তা না থাকলে উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন বিনিয়োগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
পোশাক খাতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, নিট কাপড়ের বড় অংশ এখন দেশে উৎপাদন করা সম্ভব হলেও ওভেন কাপড়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও আমদানিনির্ভর। স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো গেলে এ খাতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের (আইবিএফবি) চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি এস এম আবু তৈয়বের মতে, যেসব পণ্য দেশে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা সম্ভব, সেসব ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে আমদানির বিকল্প হিসেবে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা প্রয়োজন।
তার মতে, অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন, যুদ্ধ কিংবা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতির পরিবর্তনের মতো বাহ্যিক ঝুঁকির প্রভাব বাড়িয়ে দিতে পারে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতেও এর একটি বড় উদাহরণ রয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানিমুখী শিল্প হওয়া সত্ত্বেও এ খাতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা এখনও উল্লেখযোগ্য।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক মহিউদ্দিন চৌধুরীর মতে, মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমে যাওয়া বিনিয়োগ চাহিদার দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
তার মতে, উচ্চ সুদহার, টাকার অবমূল্যায়ন, ডলার সংকট ও এলসি-সংক্রান্ত জটিলতা ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা থাকায় নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির সিদ্ধান্ত আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যেও শিল্প আমদানিতে দুর্বলতার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি মূল্য ১০.৬৮ শতাংশ কমে ১.৮০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও ৩.৩৩ শতাংশ কমেছে।
তবে পুরো চিত্র একমুখী নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলার পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেড়ে ১.০৭৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
এতে ব্যবসায়ীদের একটি অংশের মধ্যে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা ইতিবাচক প্রত্যাশার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও, পরবর্তী সময়ে সামগ্রিক আমদানি ও শিল্প কার্যক্রমের দুর্বলতা পুরোপুরি কাটেনি।
অর্থনীতিতে ভোগের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু শিল্পের নতুন যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও উৎপাদন সরঞ্জাম আমদানিতে দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা থাকলে ভবিষ্যতে সরবরাহ সক্ষমতা নিয়ে চাপ তৈরি হতে পারে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু আমদানি কমানো নয়। বরং কোন কোন পণ্য দেশে প্রতিযোগিতামূলকভাবে উৎপাদন করা সম্ভব, কোথায় আমদানিনির্ভরতা কমানো বাস্তবসম্মত এবং কোন শিল্পে নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন—এসব বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, প্রতিযোগিতামূলক অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার সহজলভ্যতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আমদানির বিকল্প হিসেবে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যন্ত্রপাতি আমদানিতে আংশিক পুনরুদ্ধার দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা এখনো শিল্প বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। আগামী দিনে বিনিয়োগের গতি কতটা ফিরবে, তা অনেকাংশেই অর্থায়ন, জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের ওপর নির্ভর করবে।
Posted ০২:৪৯ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | Animator Alif
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com