অনলাইন ডেস্ক
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ প্রিন্ট ৮ বার পঠিত
রমজান শুরু হতে এখনো চার মাস বাকি। এর মধ্যেই ছোল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, মসুর ডাল, চিনি ও খেজুরের মতো রোজায় বেশি চাহিদা থাকা ছয়টি পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামের চাপে আগে থেকেই নাজেহাল সাধারণ মানুষ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রান্নার গ্যাস, সাবান-শ্যাম্পু ও অন্যান্য নিত্যব্যবহার্য পণ্যের বাড়তি খরচ। অথচ সেই অনুপাতে বাড়েনি মানুষের আয়। ফলে সংসারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
রাজধানীর খুচরা বাজারে সাম্প্রতিক দর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ছোলার দাম কেজিতে ১৫ টাকা বেড়ে ১২৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। খোলা সয়াবিন তেলের লিটারপ্রতি দাম ১৯৫ থেকে বেড়ে ২০০ টাকা হয়েছে। তিন দিনের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ৬০ টাকায় উঠেছে। একইভাবে মসুর ডাল, চিনি ও খেজুরের দামেও ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।
শুক্রবার রাজধানীর একাধিক খুচরা বাজার ঘুরে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। ক্রেতাদের আশঙ্কা, রমজান ঘনিয়ে আসার আগেই গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকলে উৎসবের মাসে সংসারের বাজেট সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
বাজারের তথ্য অনুযায়ী, ভালো মানের ছোট দানার মসুর ডাল কেজিপ্রতি ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ১৬০ টাকা। খোলা চিনি কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে সর্বোচ্চ ১২০ টাকায় উঠেছে। অন্যদিকে, মাবরুম খেজুরের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ৩০০ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৩০০ টাকায় পৌঁছেছে। এক সপ্তাহ আগেও এই খেজুর ১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।
রমজানে ছোলা ও খেজুরের চাহিদা বাড়ে। তাই আগেভাগে এসব পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহ পরিস্থিতি ও বাজারের চাহিদা পণ্যের দামে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে দাম বৃদ্ধির পেছনে এসব কারণ কতটা দায়ী, তা যাচাই করা জরুরি।
রাজধানীর কাওরান বাজারে শুক্রবার নিত্যপণ্য কিনতে এসে মো. আবু সালেহ বলেন, ছেলেমেয়ের জন্য তিনি প্রতি সপ্তাহে ছোলা ও খেজুর কেনেন। এবার বাজারে এসে ছোলা ও খেজুরের দাম বেড়ে যেতে দেখেছেন।
তিনি বলেন, ছোলার কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা এবং খেজুরে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। রোজা শুরুর চার মাস আগেই অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়তে শুরু করেছে। এতে তাঁর মতো সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
কাওরান বাজারের ব্যবসায়ী মো. আকবর আলী বলেন, পেঁয়াজ, ডাল, চিনি ও ছোলার দাম বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য, বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি করে বর্তমানে তুলনামূলক কম কমিশন পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি মিল থেকে সরবরাহও কম। এ কারণে খোলা সয়াবিন তেলের চাহিদা বেড়েছে এবং দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে সরবরাহ বাড়লে দাম কমতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও নিত্যব্যবহার্য পণ্যের দাম আগে থেকেই বেশি। মানুষের আয় না বাড়লেও ব্যয় বেড়েছে। ফলে সব শ্রেণির মানুষ চাপের মধ্যে রয়েছেন।
তিনি বলেন, রমজান সামনে রেখে ছোলা, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, মসুর ডাল, চিনি ও খেজুরের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এ অবস্থায় পণ্যের দাম যৌক্তিক কারণে বাড়ছে কি না, তা সরকারকে খতিয়ে দেখতে হবে।
অন্যদিকে, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের দাবি, মৌসুমি কারণে ডিম ও শাকসবজির দামে সাময়িক ওঠানামা থাকলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। তাঁর মতে, পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা সচল, জোগান পর্যাপ্ত এবং আমদানি ও দেশীয় উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে। তাই বাজারে বড় ধরনের সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা নেই।
মন্ত্রী জানান, আসন্ন রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রস্তুতি রয়েছে। পেঁয়াজের মতো একসময় আমদানিনির্ভর পণ্যে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। রোজায় ক্রেতাদের স্বস্তি দিতে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
রমজানকেন্দ্রিক ছয় পণ্যের পাশাপাশি রাজধানীর বাজারে অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দামেও মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। শুক্রবার ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গত সপ্তাহে এর দাম ছিল ১৯০ টাকা।
অন্যদিকে, কমেছে ফার্মের ডিমের দাম। খুচরা বাজারে বাদামি রঙের ডিমের ডজন বিক্রি হয়েছে ১৪০ টাকায়। সাদা ডিমের ডজনের দাম ছিল ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা। এক সপ্তাহ আগে দুই ধরনের ডিমের ডজনই ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে বাজারে দাম কমলেও পাড়া-মহল্লার মুদি দোকানগুলোতে ডিমের ডজন এখনো ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
গরুর মাংসের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ৩০০ টাকায়।
রাজধানীর খুচরা বাজারে মাছের দামও ক্রেতাদের নাগালের বাইরে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাজারে প্রতি কেজি তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙাশ ২০০ থেকে ২২০ টাকা, কাতল ৩৫০ থেকে ৮০০ টাকা এবং চিংড়ি ৮০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া পাবদা প্রতি কেজি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, ট্যাংরা ৭০০ টাকা, ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা এবং মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি কইয়ের কেজি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা এবং শোল মাছ ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম, সীমিত আয় ও আসন্ন রমজানের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের উদ্বেগ বাড়ছে। একদিকে ব্যবসায়ীরা পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কথা বলছেন, অন্যদিকে ভোক্তা অধিকারকর্মীরা দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা যাচাই এবং বাজার তদারকি জোরদারের দাবি জানাচ্ছেন। রমজানে ক্রেতাদের স্বস্তি দিতে সরকারের সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারে পণ্যের প্রকৃত মজুত, সরবরাহব্যবস্থা ও মূল্যবৃদ্ধির কারণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
Posted ০৯:২০ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | Animator Alif
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com
✎ মন্তব্য করুন