Ad
x

বীমায় আস্থা ফেরানোর লড়াই

রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬   প্রিন্ট   ৪০ বার পঠিত

বীমায় আস্থা ফেরানোর লড়াই

বীমা ব্যবসার মূল ভিত্তি আস্থা। কিন্তু বছরের পর বছর দাবি পরিশোধে বিলম্ব, আর্থিক অনিয়ম, করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রক তদারকির সীমাবদ্ধতায় সেই আস্থাই এখন সবচেয়ে বড় সংকটে। ফলে সম্ভাবনাময় এই খাত অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার, অনিয়মের লাগাম টেনে ধরা এবং আন্তর্জাতিক মানের একটি বীমা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত সংস্কারের নতুন রোডম্যাপ বাস্তবায়নে নেমেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। একই সময়ে বীমা খাতের অনিয়ম তদন্ত শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, আর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জোর দিয়েছেন শক্তিশালী আইনি কাঠামো গড়ে তোলার ওপর।

জাতীয় সংসদে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন,বীমা কোম্পানিগুলোর অর্থ লুটপাট ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করছে আইডিআরএ। তদন্ত কার্যক্রম শেষ হলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গতি বাড়াতে বীমা খাতকে একটি শক্ত ও সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে জনগণের আস্থা ফেরানো জরুরি।
এ খাতে সুশাসন, কার্যকর নীতিমালা ও শক্তিশালী আইনি কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়বে। বিমার প্রতি মানুষের বিশ্বাস তৈরি হলে ব্যক্তি ও পরিবার যেমন আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম হবে, তেমনই বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে বীমা শিল্পের সবচেয়ে বড় সংকট আর্থিক নয়, বরং বিশ্বাসের। বহু বছর ধরে বিভিন্ন বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে দাবি পরিশোধে অস্বাভাবিক বিলম্ব, তহবিল অপব্যবহার, বিনিয়োগে অনিয়ম, করপোরেট সুশাসনের অভাব এবং পরিচালনা পর্ষদের দুর্বল জবাবদিহিতার অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বীমা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে এবং নতুন গ্রাহক আকর্ষণও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদেও একজন সংসদ সদস্য বীমা খাতের এই অনিয়মের কথা তুলে ধরে বলেছেন, দেশের কিছু বীমা কোম্পানি যারা বিভিন্ন সময়ে প্রতারণামূলক অফার দিয়ে বীমা করিয়ে গ্রাহকের টাকা আত্মসাত করেছে, আওয়ামী লীগের সময়ে কোম্পানিগুলো থেকে অর্থ লুটপাট করেছে।

আইডিআরএর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জীবন ও সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর কাছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। নতুন চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভীন দায়িত্ব গ্রহণের পর এসব বকেয়া দাবি নিষ্পত্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। প্রয়োজনে সংকটে থাকা কোম্পানিগুলোর জন্য বিশেষ পুনর্বাসন পরিকল্পনা এবং গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

চলমান বাস্তবতায় আইডিআরএ একটি সমন্বিত সংস্কার কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে
আইডিআরএ’র নতুন চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন জানিয়েছেন, তিনি কেবল সমস্যা চিহ্নিত নয়, সমাধানভিত্তিক সংস্কারে বিশ্বাসী। সে লক্ষ্যেই একটি সংস্কার কাঠামো (রিফর্ম ফ্রেমওয়ার্ক) তৈরি করা হয়েছে।

তার ভাষ্য, সংস্কারের প্রথম স্তম্ভ হলো পলিসিধারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, দ্বিতীয় স্তম্ভ বিমাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং তৃতীয় স্তম্ভ খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, যাতে দীর্ঘমেয়াদে একটি টেকসই বিমা শিল্প গড়ে ওঠে।

চেয়ারম্যান বলেন, প্রতিটি বিমা কোম্পানির সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করে তাদের আর্থিক ও পরিচালনাগত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হবে। কোথাও সম্পদ বিক্রি, কোথাও আটকে থাকা অর্থ উদ্ধার কিংবা অন্য কোনো উপায়ে দাবি পরিশোধের সুযোগ থাকলে আইডিআরএ তা সমন্বয় করবে।

তিনি জানান, অনেক প্রতিষ্ঠানের এফডিআরের অর্থ দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংকে আটকে আছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা অর্থ নগদায়নের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।

এসব উদ্যোগের পরও যদি বড় অঙ্কের দায় থেকে যায়, তাহলে এককালীন বেইলআউট প্যাকেজের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, সরকারের কাছে যাওয়ার আগে বিমা কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিজেদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। একই ধরনের সংকট যাতে ভবিষ্যতে আর সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে আস্থা দিতে হবে। এজন্য কোম্পানিগুলোতে সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কী পরিবর্তন আনা হচ্ছে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আইডিআরএ কী ধরনের সংস্কার করছে, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।

মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ৩ হাজার ডলারের বেশি এবং দেশের অর্থনীতির আকার অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ভবিষ্যতে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে একটি শক্তিশালী বিমা খাত অপরিহার্য।

তিনি বলেন, সমমানের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বিমা খাত এখনও পিছিয়ে। অথচ উন্নত অর্থনীতিতে বিমা খাত শুধু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যম নয়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান উৎস।

আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, দেশের পুঁজিবাজারে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অভাব রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিমা কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারের অন্যতম বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, বিশেষ করে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ইস্যুতে।

তার মতে, শক্তিশালী বিমা খাত গড়ে উঠলে পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নতুন উৎস তৈরি হবে।

বাংলাদেশকে দুর্যোগপ্রবণ দেশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরকারের আর্থিক চাপ কমাতে বিমা খাতকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।

এছাড়া ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাইক্রোইনস্যুরেন্স সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ইসলামি বিমা বা তাকাফুল খাতের জন্যও পৃথক নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরির পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিমা বিষয়ে বিভাগ, মেজর, মাইনর কিংবা সার্টিফিকেশন কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এতে দক্ষ জনবল তৈরি হবে এবং তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, কোনো খাতের সংস্কার সফল করতে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শিল্পমালিকদের আন্তরিকতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ভূমিকা এই তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, আইডিআরএ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। তবে সংস্কার সফল করতে বিমা কোম্পানিগুলোকেও সমানভাবে আন্তরিক হতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিমা কোম্পানি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার হিসেবে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু নিয়ন্ত্রকের উদ্যোগ নয়, বীমা কোম্পানিগুলোকেও ব্যবসায়িক সংস্কৃতি বদলাতে হবে। সময়মতো দাবি পরিশোধ, স্বচ্ছ আর্থিক প্রতিবেদন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নয়ন ছাড়া আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নত বিশ্বে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম চালিকাশক্তি বীমা শিল্প। বাংলাদেশেও অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কৃষি, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বীমা খাতের ভূমিকা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রথমেই ফিরিয়ে আনতে হবে মানুষের আস্থা।

প্রধানমন্ত্রীর অনিয়ম তদন্তের ঘোষণা, তথ্য মন্ত্রীর শক্তিশালী আইনি কাঠামোর আহ্বান এবং আইডিআরএর নতুন সংস্কার রোডম্যাপ-এই তিনটি উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে দেশের বীমা খাত নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তখনই বীমা শিল্প কেবল একটি আর্থিক সেবা খাত নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে।

 

 

 

 

 

Facebook Comments Box

Posted ০৯:৩৬ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com