নিজস্ব প্রতিবেদক
সোমবার, ২১ জুলাই ২০২৫ প্রিন্ট ৪২৯ বার পঠিত
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সাধারণ বীমা খাতের কোম্পানি এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের ২৫তম বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) ১ জুলাই হাইব্রিড পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ৮ ঘন্টাব্যাপী চলা সভায় সভাপতিত্ব করেন কোম্পানির চেয়ারম্যান মাজাকাত হারুন। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও বদিউজ্জামান লস্কর প্রতিষ্ঠানের সার্বিক বিষয়ে তুলে ধরেন। দীর্ঘ সময় চলা এজিএমে পরিচালনা পর্ষদকে অসহায় দেখা গেছে। তবে সাধারণ সভায় সিইও শেয়ারহোল্ডারদের মিথ্যা তথ্য দেন যা বীমা আইন বহির্ভূত। তিনি বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ‘ওয়ার্কারস প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড’ (ডব্লিউপিপিএফ) বাতিল করা হয়েছে। তবে এরকম কোন সিদ্ধান্ত সরকারের তরফ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি। এ সম্পর্কে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দ কুতুব বলেন, আইডিআর থেকে এরকম চিঠি আমরা পেয়েছিলাম কিন্তু এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত আসেনি।
ডব্লিউপিপিএফ পালনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬, (সংশোধিত-২০১৩)-এর ২৩২ ধারা মোতাবেক এ ফান্ড গঠন ও পরিচালনার জন্য ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের নির্দেশনা থাকলেও তা পরিপালন করেনি এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড। মূলত গ্রস প্রফিটের ৫ শতাংশ টাকা এ ফান্ডে রাখার নিয়ম। ১১ অক্টোবর ২০০৬ সালে গেজেট আকারে এ আইন প্রকাশ হয়। আইনটি পাস হওয়ার এক মাসের মধ্যে পরিপালনের নির্দেশনা আছে। অন্যথায় আইনে বলা আছে- “কোম্পানির প্রত্যেক পরিচালক, উহার ব্যবস্থাপক বা ব্যবস্থাপনার কাজের সাথে জড়িত যে কেউ অথবা ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান বা সদস্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে অনধিক ১ লাখ টাকা এবং ব্যর্থতার প্রথম তারিখের পর থেকে প্রতিদিনের জন্য ৫ হাজার টাকা জরিমানা আরোপ করে ৩০ দিনের মধ্যে জরিমানা পরিশোধের জন্য সরকার নির্দেশ প্রদান করতে পারে। পুনরায় কোনোরূপ আইনের বিধান অথবা সরকারের আদেশ পালনে ব্যর্থ হলে তাহার বিরুদ্ধে দ্বিগুণ জরিমানা আরোপিত হবে।”
![]()
এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের সাধারণ সভায় শেয়ারহোল্ডারদের প্রশ্নের উত্তর কোনরকম পাশ কাটিয়ে তাড়াতাড়ি সভা শেষ করার চেষ্টায় ছিলেন কর্তৃপক্ষ। লভ্যাংশ শতকরা ৫ শতাংশের পরিবর্তে ৭ শতাংশ দেওয়ার দাবি জানান সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা। দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান বলেন, এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের এমডির বিরুদ্ধে যে অর্থপাচার মামলা হয়েছিল তার চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখনও আমরা জানি না। দ্রুত সাধারণ সভা শেষ করার তাদিগ নিশ্চয় বড় কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বার্ষিক সাধারণ সভায় উপস্থিত শেয়ারহোল্ডারগণ সিইও বদিউজ্জামান লস্করের বিরুদ্ধে তার সামনেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। শেয়ারহোল্ডার সিদ্দিকুর রহমান লিটন বলেন, অর্থ পাচারের অভিযোগে জেল খাটা কেউ যদি মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হন তাহলে আর আমরা বা কী বলতে পারি? আইডিআরএ বা কীভাবে এর অনুমোদন দিল? টাকা খেয়ে? আরেক শেয়ারহোল্ডার নাজমুল ইসলাম সুমন বলেন, আপনারা তো অনেকভাবেই টাকা খেয়েছেন এখন সামনাসামনিই খান, দয়া করে লভ্যাংশ আর ২% বাড়িয়ে ৭% ঘোষণা দেন। সভায় উপস্থিত আফসার উদ্দীন সরকার বলেন, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যেমন ফিলিস্তিনীদের পানি ও খাদ্য না দিয়ে মারছেন এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স তাদের বার্ষিক সাধারণ সভায় পানি না দিয়ে সেরকম অবস্থায় ফেলেছেন।
শেয়ারহোল্ডার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব কোম্পানিকে উন্নতির দিকে নিয়ে যাওয়া। ২০২২ ও ২০২৩ সালে ৭% লভ্যাংশ দিলেও এবার ৫% লভ্যাংশ দেওয়া হল। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্যই এরকম অবস্থা হয়েছে এবং আগামীতে নিশ্চয় লভ্যাংশ আরও বেশি দেওয়া হবে বলে আশা করছি। তবে পক্ষান্তরে আরেক শেয়ারহোল্ডার মাহাবুবুল হক বাবু বলেন, এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান আগে ব্যাংক পরিচালনা করে এসেছেন বিধায় আমরা মনে করেছিলাম বীমার অবস্থা আরও ভাল হবে কিন্তু তা হয়নি বরং খারাপের দিকে গেছে। গত বছরের তুলনায় এবছরের ইপিএস-এ ধাক্কা খেয়েছি বলে ডিভিডেন্টে প্রভাব পড়েছে। আসলে সভা হয়, কথা বার্তা হয় কিন্তু ম্যানেজমেন্টের কোন জবাবদিহিতা থাকে না। সুতরাং কোম্পানি লসে পড়লেও ম্যানেজন্টের কোন যায় আসে না।
শেয়ারহোল্ডার সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ডেইলি স্টারের রিপোর্ট অনুযায়ী ১৬ টা নন-লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানিকে ৮৩ লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স ১১ লক্ষ টাকা জরিমানা দিয়েছে অনিয়মিতর কারণে। এই ১১ লক্ষ টাকা কার? আপনাদের বিচক্ষণতার অভাবে এই জরিমানা দিতে হয়েছে। মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা তাহলে কী করলেন? সাজ্জাদ হোসেন বার্ষিক সভার বিরতি দিয়ে ৭% লভ্যাংশ দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
শেয়ারহোল্ডার সোহরাব হোসেন লিংকন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ইপিএস যেখানে ১ টাকা ২৩ পয়সা তখন আপনি ১০% ডিভিডেন্ট দিতে পারতেন। আশা করি আগামী বছর তা সম্ভব হবে। এমডির ভুল বিনিয়োগের কারণে শেয়াহোল্ডারগণ ঝুঁকির মুখে আছেন বলে মনে করেন তিনি এবং বার্ষিক রিপোর্ট এত ছোট ফন্টে প্রিন্ট করার সমালোচনা করেন।
সাধারণ সভায় উপস্থিত শেয়ারহোল্ডার মো. মহিউদ্দীন শামীম বলেন, এমডির বিচক্ষণতার অভাবে এফডিআর থেকে কোন লাভ আসেনি। বিভিন্ন নামে বাকিতে ব্যবসা করেছেন এমডি তার প্রমাণও আছে। কিন্তু বোর্ড জেনেও চুপ থাকেন কেন? ৩০৫ নং বোর্ড মিটিংয়ে অধিকাংশ পরিচালক তার বিরোধীতা করলেও বদিউজ্জামান লস্কর কীভাবে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হন তাও বোধগম্য নয়। যে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার নামে এত এত সমালোচনা তার ওই পদে না থাকাই ভাল। শেয়ারহোল্ডার লুৎফর গণি টিটু বলেন, এই বোর্ড অযোগ্য বোর্ড। সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের কোন দাম নেই তাদের কাছে। আমি ৪ কোটি টাকার শেয়ার নিয়ে বসে আছি আর চেয়ারম্যানের শেয়ার হলো মাত্র ১ কোটি টাকার কিছু বেশি। তাহলে তাদের কষ্টের কিছু নেই। আমার মত শেয়ারহোল্ডারদেরই তো কষ্ট থাকবে বেশি। আমাদের কথার কোন দামই নেই এখানে। আপনারা যে এখনও মব জাস্টিস-এর শিকার হননি তা-ই আপনাদের কপাল।
শেয়ারহোল্ডার রেজাউল করিম বলেন, বীমা আইন অনুযায়ী প্রত্যেক শেয়ারহোল্ডারকে ১৫ দিন আগে বার্ষিক প্রতিবেদন পাঠানোর কথা কিন্তু এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স তা পাঠায়নি। আমরা কয়েকজন শেয়ারহোল্ডার অফিসে গেলেও নানান অজুহাত দেখিয়ে প্রতিবেদন দিতে ব্যর্থ হন। আমি আমার এক পরিচিতর কাছ থেকে এক কপি বার্ষিক প্রতিবেদন সংগ্রহ করেছিলাম। এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সে অনিয়মই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বীমা আইনে কোন বোর্ড মেম্বার অডিট কমিটিতে থাকতে পারেন না কিন্তু এখানে বোর্ড মেম্বার অডিট কমিটিতেও আছেন। কেন আছেন তা বোর্ড পরিস্কার কোন উত্তর দিতে পারেননি। ফিক্সড অ্যাসেটের একটা অংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে ৪৯ লক্ষ ৮৪ হাজার ৪শ টাকা। কস্টিং ভ্যালু দাড়ায় ৮ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা, তা কোথায় গেল রিপোর্টে উল্লেখ নাই।
শেয়ারহোল্ডার শাহ আলম বাবু বলেন, আমাদের বাচ্চাদের কাছে মুখ দেখাতে হয়। প্রত্যেকদিন আমি বাচ্চাদের কাছে দোয়া চাই যেন মাথা উঁচু করে তাদের সাথে কথা বলতে পারি। তিনি চেয়ারম্যান ও এমডি’র উদ্দ্যেশে বলেন, আমরা নিজের চেহারা আয়নায় দেখলেই নিজেদের দোষ বুঝতে পারি। তিনি স্বচ্ছতার সঙ্গে কোম্পানি পরিচালনা করার কথা বলেন।
সভায় কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান এবিএম কায়ছার, স্বতন্ত্র পরিচালক আমির হামজা সরকার, সৈয়দ আল ফারুক, পলিসি হোল্ডার অ্যান্ড প্রোটেকশন কমিটির চেয়ারম্যান আসিফুর রহমান সহ সকল পরিচালক ও উল্লেখযোগ্য শেয়ারহোল্ডার স্বশরীরে উপস্থিত ছিলেন।
সভায় কোম্পানির ২০২৪ সালের মুনাফা হতে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৫% নগদ লভ্যাংশ অনুমোদন দেয়া হয়। সভায় উপস্থিত শেয়ারহোল্ডারগণ কোম্পানির ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ সমাপ্ত বছরের বার্ষিক হিসাব বিবরণ, পরিচালকবৃন্দের প্রতিবেদন ও নিরীক্ষকের প্রতিবেদনের উপর বিভিন্ন প্রশ্ন, আলোকপাত এবং বক্তব্য রাখেন।
একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে নিয়োগ মানে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ দিক নির্দেশনা নির্ধারণ। তবে এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডে বদিউজ্জামান লস্করের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদে নিয়োগ যেন গোটা বীমা খাতকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
২০১৪ সালে বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের অভিযোগে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হন বদিউজ্জামান লস্কর। কাস্টমসের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার সময় তার কাছ থেকে ২৬ লাখ টাকার সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়, যা তার জুতার সোল ও মানিব্যাগে লুকানো ছিল। শুধু গ্রেপ্তারই নয়, এই ঘটনায় তিনি কয়েকদিন জেলও খেটেছেন যা তিনি নিজেই আইডিআরএ’র তদন্তে স্বীকার করেন।
তবে প্রশ্ন উঠেছে এমন একজন বিতর্কিত ও দন্ডিত ব্যক্তিকে কীভাবে একটি তালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানির সিইও পদে নিয়োগ দেওয়া হলো? ২০২৩ সালের অক্টোবরে পরিচালনা পর্ষদের ৩০৫তম সভায় তাকে সিইও হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। নিয়ম অনুযায়ী, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের জন্য পরিচালনা পর্ষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতি আবশ্যক। অথচ বদিউজ্জামানের নিয়োগের ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি। বরং মাত্র কয়েকজন সুবিধাভোগী পরিচালকের সম্মতিতে নিয়োগ অনুমোদনের নথিপত্র পাঠানো হয়। বেশিরভাগ পরিচালক এই নিয়োগের বিরোধিতা করলেও তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, যা পরিচালনা পর্ষদের ভেতর তীব্র দ্বন্দ্ব ও অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
Posted ০৮:৫৮ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২১ জুলাই ২০২৫
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: ই-মেইল: bankbima1@gmail.com