সজল সরকার
শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬ প্রিন্ট ১৬৫ বার পঠিত
বিশ্ব অর্থনীতিতে অপরিশোধিত তেল এখনো সবচেয়ে প্রভাবশালী পণ্যের একটি। শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে বৈশ্বিক লজিস্টিক ব্যবস্থার বড় অংশই তেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে যেসব দেশ তেল রপ্তানিতে শীর্ষে রয়েছে, তারা শুধু অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী নয় বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের গড় আন্তর্জাতিক মূল্য প্রতি ব্যারেল প্রায় ৭০ থেকে ৯০ মার্কিন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। তবে দেশভেদে তেলের মান, পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ ও চুক্তির ধরন অনুযায়ী রপ্তানি মূল্য কিছুটা কম-বেশি হয়। নিচে শীর্ষ ১০ তেল রপ্তানিকারক দেশের বিস্তারিত বিশ্লেষণ দেওয়া হলো।
১. সৌদি আরব: সৌদি আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির গড়ে দৈনিক কোটি ব্যারেলের কাছাকাছি তেল রপ্তানি সক্ষমতা রয়েছে। তাদের তেলের প্রধান ধরন হালকা ও মাঝারি গ্রেডের যা আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন।
গড় রপ্তানি মূল্য সাধারণত প্রতি ব্যারেল ৭৫ থেকে ৮৫ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে। ওপেকের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে সৌদি আরব উৎপাদন কম-বেশি করে বৈশ্বিক দাম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তেল খাত দেশটির মোট রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস।
২. রাশিয়া: রাশিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক। ইউরোপীয় বাজারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও দেশটি এশিয়া, বিশেষ করে চীন ও ভারতীয় বাজারে ব্যাপকভাবে তেল রপ্তানি করছে।
রাশিয়ার তেলের গড় রপ্তানি মূল্য তুলনামূলকভাবে কম—প্রতি ব্যারেল প্রায় ৬০ থেকে ৭৫ ডলারের মধ্যে, কারণ অনেক ক্ষেত্রে ছাড় দিয়ে বিক্রি করতে হয়। তবুও বিপুল পরিমাণ রপ্তানির কারণে দেশটির আয় শক্তিশালী রয়েছে।
৩. ইরাক: ইরাক ওপেকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং শীর্ষ রপ্তানিকারকদের মধ্যে অন্যতম। দেশটির তেল মজুদ অত্যন্ত বড় এবং উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম।
গড় রপ্তানি মূল্য প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ডলার প্রতি ব্যারেল। রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলেও তেল খাতই ইরাকের অর্থনীতির মূল ভিত্তি।
৪. সংযুক্ত আরব আমিরাত: সংযুক্ত আরব আমিরাত উচ্চমানের অবকাঠামো ও আধুনিক প্রযুক্তির কারণে তেল রপ্তানিতে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। দেশটি একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে। তাদের তেলের গড় রপ্তানি মূল্য ৭৫ থেকে ৮৮ ডলারের মধ্যে থাকে। স্থিতিশীল উৎপাদন ও উন্নত লজিস্টিক ব্যবস্থার কারণে তারা আন্তর্জাতিক বাজারে নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত।
৫. কানাডা: কানাডা উত্তর আমেরিকার অন্যতম বড় তেল রপ্তানিকারক। দেশটির তেলের বড় অংশ আসে তেলের বালু থেকে, যা তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল উৎপাদন প্রক্রিয়া। গড় রপ্তানি মূল্য প্রায় ৬৫ থেকে ৮০ ডলারের মধ্যে থাকে। পরিবহন খরচ বেশি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র প্রধান ক্রেতা হিসেবে কাজ করে।
৬. যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্র শেল তেল বিপ্লবের কারণে বিশ্ববাজারে বড় রপ্তানিকারক হিসেবে উঠে এসেছে। প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে দেশটি দ্রুত সরবরাহ সক্ষমতা বাড়াতে পেরেছে। গড় রপ্তানি মূল্য ৭০ থেকে ৮৫ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত উৎপাদন রপ্তানি করা হয়, বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে।
৭. কুয়েত: কুয়েত ছোট দেশ হলেও বিশাল তেল মজুদের কারণে শীর্ষ রপ্তানিকারকদের মধ্যে রয়েছে। দেশটির উৎপাদন খরচ অত্যন্ত কম। গড় রপ্তানি মূল্য ৭৫ থেকে ৮৫ ডলার প্রতি ব্যারেল। ওপেকের সক্রিয় সদস্য হিসেবে তারা বাজার স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখে।
৮. নরওয়ে: নরওয়ে ইউরোপের অন্যতম বড় তেল রপ্তানিকারক। উত্তর সাগরের অফশোর তেল উৎপাদনের মাধ্যমে দেশটি উচ্চমানের তেল সরবরাহ করে। গড় রপ্তানি মূল্য ৮০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে থাকে, কারণ তাদের তেল তুলনামূলকভাবে উন্নত মানের এবং ইউরোপীয় বাজারে পরিবহন সুবিধা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকেও এগিয়ে যাচ্ছে।
৯. নাইজেরিয়া: নাইজেরিয়া আফ্রিকার অন্যতম বড় তেল রপ্তানিকারক। দেশটির অর্থনীতি তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। গড় রপ্তানি মূল্য ৭০ থেকে ৮০ ডলারের মধ্যে থাকে। তবে নিরাপত্তা সমস্যা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা উৎপাদনে মাঝে মাঝে বাধা সৃষ্টি করে।
১০. কাজাখস্তান: কাজাখস্তান মধ্য এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানিকারক দেশ। পাইপলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে তেল সরবরাহ করে। গড় রপ্তানি মূল্য ৬৫ থেকে ৮০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে। দেশটি ধীরে ধীরে জ্বালানি খাতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।
বৈশ্বিক প্রভাব ও বাজার বাস্তবতা: এই শীর্ষ ১০ দেশ বৈশ্বিক তেল বাজারের প্রায় বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের মধ্যে অনেকেই ওপেক বা সংশ্লিষ্ট জোটের মাধ্যমে উৎপাদন ও মূল্য নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল না থেকে প্রায়ই ওঠানামা করে।
বর্তমানে তেলের গড় আন্তর্জাতিক মূল্য প্রতি ব্যারেল প্রায় ৭০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে থাকলেও রাজনৈতিক উত্তেজনা, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা অর্থনৈতিক মন্দার কারণে এই দাম দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং বড় অর্থনীতিগুলোর চাহিদা তেলের বাজারকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে।
তেল রপ্তানিতে শীর্ষ এই ১০ দেশ শুধু জ্বালানি সরবরাহকারী নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির শক্তিশালী চালিকাশক্তি। তাদের উৎপাদন নীতি, রপ্তানি কৌশল এবং রাজনৈতিক অবস্থান বিশ্ব বাজারের দিক নির্ধারণ করে। ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লেও, তেল এখনো বহু বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবেই থাকবে।
Posted ০৬:৫৯ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: ই-মেইল: bankbima1@gmail.com