নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | 87 বার পঠিত
দেশের স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা, অপ্রতুল বাজেট বরাদ্দ ও নীতিমালার দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে কাঙ্ক্ষিত মান ও জনগণের আস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, স্বাস্থ্য খাতে টেকসই উন্নয়ন আনতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় জোরদারের পাশাপাশি জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে আস্থা বৃদ্ধি: মান নিয়ন্ত্রণে কৌশলগত কাঠামো নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব বিষয় উঠে আসে। গতকাল রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান।
অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এখনো মানসম্মত ও রোগীবান্ধব সেবা নিশ্চিতে কাঠামোগত ঘাটতি রয়ে গেছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের সেবার মানে বৈষম্য, প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের সংকট, অনুমোদনহীন ক্লিনিক ও ফার্মেসির বিস্তার, ভুল ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট, ভেজাল ওষুধ এবং দুর্বল তদারকি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, কার্যকর স্বাস্থ্য বিমা ব্যবস্থার অভাবে দেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই জনগণকে নিজস্ব অর্থায়নে বহন করতে হচ্ছে, যা নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য বড় আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে একটি টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণ, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবহার, নার্সিং ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবল তৈরি এবং বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ অপরিহার্য বলে তিনি মত দেন। পাশাপাশি একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন ডিসিসিআই সভাপতি।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় জোর দেওয়ার আহ্বান:
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতে কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও সামগ্রিকভাবে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা যায়নি। উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এমনকি প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়েও বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হলেও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দিলে জনগণের বড় অংশ উপকৃত হবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় বিকেন্দ্রীকরণ, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ পর্যায়ে সেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পাশাপাশি চিকিৎসা শিক্ষার আধুনিকায়ন ও গবেষণাবান্ধব পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনাইটেড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ডিসিসিআইয়ের সাবেক ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি মালিক তালহা ইসমাইল বারী। তিনি জানান, বাংলাদেশে জনপ্রতি বার্ষিক সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় তুলনামূলকভাবে খুবই কম এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রায় অর্ধেক জনগণ মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।
নীতি সংস্কার ও স্বচ্ছতার প্রয়োজন:
অনুষ্ঠানে আলোচকরা বলেন, দেশের অধিকাংশ মানুষ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন, তাই সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে সেবার মান নিশ্চিত করা জরুরি। স্বাস্থ্য খাতের সব স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা না হলে আস্থা ফিরবে না বলেও তারা মত দেন। বক্তারা আরও বলেন, দেশীয় ওষুধ শিল্পে আস্থা তৈরি হলেও সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি নীতির অভাব রয়েছে। তাই একটি টেকসই অর্থায়ন কাঠামো ও কার্যকর নীতিমালার মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।
সেমিনারের মুক্ত আলোচনায় স্বাস্থ্য অর্থনীতি, চিকিৎসা শিক্ষা, ওষুধ শিল্প ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি, সহ-সভাপতিসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
Posted ৫:৪৭ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫
bankbimaarthonity.com | rina sristy