নিজস্ব প্রতিবেদক
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬ প্রিন্ট ২৪ বার পঠিত
বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডে দীর্ঘদিন ধরে চলা আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এস এম শামসুল আরেফীনের নাম। দুদকের একের পর এক মামলা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত, বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অনিয়মের প্রমাণ এবং শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার ও জামিন- সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
দুদক সূত্রে জানা যায়, উত্তরা ফাইনান্স এন্ড ইনভেষ্টমেন্ট লি: এর আর্থিক দুর্নীতিতে এ পর্যন্ত ৮টি মামলা হয়েছে। দু’হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক অনিয়ম পাওয়া গেছে। এখনও অনুসন্ধান চলমান রয়েছে এবং সামনে আরও মামলা হবে বলে জানা যায়।
দুদক থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ দু’টি মামলার নথিতে দেখা যায় বোর্ড সভায় উপস্থাপন ও অনুমোদন না নিয়ে বেঙ্গল গ্যাস লিমিটেডের নামে মোট ২ কোটি সত্তর লাখ এবং কাজী এনার্জি রিসোর্স লিমিটেডের নামে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা উত্তরা ফাইনান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড হতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এ মামলায় উত্তরা ফাইনান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম শামসুল আরেফীন ছাড়াও ৭ জন অভিজুক্তের নাম রয়েছে। তারা হচ্ছেন- মো: আব্দুল ওয়াদুদ (সাবেক সংসদ সদস্য ও চেয়ারম্যান, বেঙ্গল গ্যাস লিমিটেড ও এমডি, কাজী এনার্জি রিসোর্স লি.), গাউস মোহাম্মদ হাসান জাহিদ (এমডি, বেঙ্গল গ্যাস লিমিটেড), মনোয়ারা বেগম (পরিচালক, বেঙ্গল গ্যাস লিমিটেড ও চেয়ারম্যান, কাজী এনার্জি রিসোর্স লি.), মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন (সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ডে অব ট্রেজারি, উত্তরা ফাইনান্স এন্ড ইনভেষ্টমেন্ট লি:), কাজী আরিফুজ্জামান (সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, উত্তরা ফাইনান্স এন্ড ইনভেষ্টমেন্ট লি:), এস. এম. কামরুজ্জামান (সাবেক এভিপি, উত্তরা ফাইনান্স এন্ড ইনভেষ্টমেন্ট লি:) এবং মিঠু কুমার সাহা (সাবেক কর্মকর্তা, উত্তরা ফাইনান্স এন্ড ইনভেষ্টমেন্ট লি.)। সিএফও উত্তম কুমার সাহা মারা যাওয়ায় মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন।
কয়েক মাস আগে এক কোটি ৩৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এস এম শামসুল আরেফীনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলায় উত্তরা ফাইন্যান্সের পরিচালক তাহমিনা রহমান টিনা, সাবেক এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর এ জে মাসুদুল হক আহমেদ, সাবেক কর্মকর্তা মিঠু কুমার সাহা এবং ইউনুস বিন রশিদকে আসামি করা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংরক্ষণ না করে প্রতিষ্ঠানটির অর্থ আল-মদিনা হার্ডওয়্যার স্টোরের হিসাবে স্থানান্তর করেন। তদন্তে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট অর্থ স্থানান্তরের পক্ষে কোনো বৈধ নথি বা বোর্ড অনুমোদনের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অর্থ আত্মসাৎ ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
এর আগে প্রায় ৪১ কোটি ৪৭ লাখ টাকার আরেকটি আত্মসাতের মামলায় এস এম শামসুল আরেফীনকে গ্রেপ্তার করে দুদক। ওই মামলায় অভিযোগ করা হয়, বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই নবগঙ্গা ট্রেডিং এন্টারপ্রাইজের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে স্থানান্তর করা হয় এবং পরে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে লেয়ারিংয়ের মাধ্যমে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে পরবর্তীতে জামিনে ছাগা পান এস এম শামসুল আরেফীন। ওই ঘটনায় নবগঙ্গা ট্রেডিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শংকর কুমার সাহাকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, দুটি মামলায় আত্মসাতের অভিযোগের পরিমাণ মিলিয়ে প্রায় ৪৩ কোটি টাকার বেশি। তবে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রকৃত আর্থিক অনিয়মের পরিমাণ আরও বড় হতে পারে এবং বিভিন্ন লেনদেন এখনও যাচাই করা হচ্ছে। আর্থিক অনিয়মের পরিমান ২ হাজার কোটি টাকার বেশি বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।
আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকও কঠোর অবস্থান নেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে বিশেষ নিরীক্ষা পরিচালনা করে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান রহমান রহমান হক (কেপিএমজি)। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ব্যাপক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাতে সহায়তা এবং আর্থিক প্রতিবেদনে তথ্য গোপনের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার পর গতবছরের ২৩ জুন এস এম শামসুল আরেফীনকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদ থেকে অপসারণ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এসব অনিয়মের কারণে শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, আমানতকারীদের স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলাকালে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় পাসপোর্ট জব্দের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরা ফাইন্যান্সের ঘটনাটি দেশের আর্থিক খাতে করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি, দুর্বল অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বোর্ড তদারকির সীমাবদ্ধতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তারা মনে করেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দুদক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টাও চলবে।
এ বিষয়ে উত্তরা ফাইনান্স এন্ড ইনভেষ্টমেন্ট লি:-এর বক্তব্য নেওয়ার জন্য ফোন করলে মাহমুদুল হাসনাইর নামে এক কর্মকর্তা বলেন, আমি এ বিষয়ে কথা বলতে পারবো না। যিনি কথা বললেন তার ফোন নাম্বার দিচ্ছি। কিন্তু কয়েকদিন পার হলেও কারও ফোন নাম্বার তিনি দেননি এবং অফিসে গেলেও কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
Posted ১০:১৮ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com