নিজস্ব প্রতিবেদক
রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬ প্রিন্ট ৭ বার পঠিত
দেশের ব্যাংকিং খাতের সুষম সম্প্রসারণ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার এবং পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যাংক বিজনেস সেন্টার (বিবিসি) স্থাপন, স্থানান্তর ও পরিচালনার জন্য নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশিকায় গ্রামীণ এলাকায় ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শাখা ও উপ-শাখা স্থাপনের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার ক্ষমতাবলে এ নির্দেশিকা জারি করেছে। এর মাধ্যমে ২০২৩ সালে জারি করা বিআরপিডি সার্কুলার নং ০২ বাতিল করা হয়েছে। দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের জন্য নতুন নির্দেশিকা বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণ করতে হবে।
তিন ধরনের ব্যাংক বিজনেস সেন্টার:
নতুন নীতিমালায় ব্যাংক বিজনেস সেন্টারকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে টাইপ-এ কেন্দ্রগুলো প্রশাসনিক ও সহায়ক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। টাইপ-বি কেন্দ্রগুলো লেনদেনভিত্তিক শাখা হিসেবে কাজ করবে। আর টাইপ-সি কেন্দ্রগুলো বিশেষায়িত বা সীমিত সেবাভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
যেসব কেন্দ্র এ তিন শ্রেণির কোনো একটির আওতায় স্পষ্টভাবে পড়ে না, সেগুলোর শ্রেণিবিন্যাস নির্ধারণের ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে থাকবে।
শাখা স্থাপনে লাগবে পূর্বানুমোদন:
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, ইলেকট্রনিক বুথ, যেমন এটিএম, নগদ জমা মেশিন বা নগদ পুনর্ব্যবহার মেশিন, বিমানবন্দর লাউঞ্জ এবং এক মাসের কম সময়ের অস্থায়ী বুথ ছাড়া অন্য সব ধরনের ব্যবসায়িক কেন্দ্র স্থাপন বা স্থানান্তরের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে।
অনুমোদন প্রক্রিয়া দুই ধাপে সম্পন্ন হবে। প্রথম ধাপে ব্যাংকগুলোকে প্রতি বছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পরবর্তী বছরের জন্য বার্ষিক ব্যবসা সম্প্রসারণ পরিকল্পনা জমা দিয়ে নীতিগত অনুমোদন নিতে হবে। এরপর প্রতিটি শাখা বা কেন্দ্র চালুর আগে আলাদাভাবে চূড়ান্ত অনুমোদন নিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, কোনো ব্যাংক তাদের গ্রামীণ শাখা সম্প্রসারণের বাধ্যবাধকতা পূরণ না করলে নতুন শহুরে শাখা খোলার অনুমতি পাবে না।
নতুন শাখার অর্ধেকই হতে হবে গ্রামে:
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন নির্দেশিকায় গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আরোপ করা হয়েছে। কোনো পঞ্জিকা বছরে একটি ব্যাংক যত নতুন শাখা খুলবে, তার অন্তত ৫০ শতাংশ গ্রামীণ এলাকায় স্থাপন করতে হবে।
নীতিমালায় সিটি করপোরেশন ও ‘এ’ শ্রেণির পৌরসভাকে শহুরে এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্য সব এলাকা গ্রামীণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা গ্রামীণ জনগোষ্ঠী আরও সহজে আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার আওতায় আসবে।
নতুন নির্দেশিকায় একই এলাকায় অতিরিক্ত শাখা স্থাপন নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কোনো ব্যাংক তার বিদ্যমান শাখা বা আউটলেটের এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে নতুন শাখা বা উপ-শাখা স্থাপন করতে পারবে না।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমতি ছাড়া একই ব্যাংকের অন্য কোনো উপ-শাখার তিন কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে নতুন উপ-শাখা খোলা যাবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এর ফলে একই এলাকায় অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা ও অবকাঠামোগত ব্যয় কমবে এবং অপেক্ষাকৃত অনাবৃত এলাকায় ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ সহজ হবে।
উপ-শাখার জন্য বিশেষ শর্ত:
উপ-শাখা স্থাপনের ক্ষেত্রেও নতুন নির্দেশিকায় নির্দিষ্ট অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ উপ-শাখা সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ ‘এ’ শ্রেণির পৌরসভায় স্থাপন করা যাবে। অন্তত ৬০ শতাংশ উপ-শাখা ‘বি’ শ্রেণির পৌরসভা ও গ্রামীণ এলাকায় থাকতে হবে।
প্রতিটি উপ-শাখায় ন্যূনতম তিনজন কর্মচারী থাকতে হবে। এসব উপ-শাখা নিয়মিত শাখার তুলনায় অতিরিক্ত কোনো ফি বা সেবা মূল্য আদায় করতে পারবে না। একই সঙ্গে তাদের বৈদেশিক বাণিজ্যসংক্রান্ত লেনদেন পরিচালনার অনুমতি থাকবে না।
স্থানীয় আমানত স্থানীয় ঋণে ব্যবহারের নির্দেশ:
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কৃষিভিত্তিক শাখাগুলোর জন্য নতুন নির্দেশিকায় বিশেষ শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এসব শাখাকে স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত আমানতের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ একই এলাকায় ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এ পদক্ষেপ স্থানীয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করবে এবং আঞ্চলিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে।
নতুন নির্দেশিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যয় নিয়ন্ত্রণ। ব্যাংকগুলোকে শুধুমাত্র প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী অফিস স্পেস ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও দেশীয়ভাবে উৎপাদিত আসবাবপত্র ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত সাজসজ্জা, বিলাসী অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা অপ্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ ব্যয় পরিহার করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইজারা চুক্তির ক্ষেত্রেও নতুন শর্ত আরোপ করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়া কোনো স্থাপনা ভাড়া নেওয়া যাবে না। চুক্তি নবায়নের সময় অস্বাভাবিক ভাড়া বৃদ্ধি পরিহার করতে হবে এবং অগ্রিম ভাড়া পরিশোধ সীমিত রাখতে হবে। ব্যাংকগুলোকে প্রতি বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ভাড়া ও ইজারাসংক্রান্ত তথ্য জমা দিতে হবে।
নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং নির্দিষ্ট সহায়ক ও বিক্রয় কার্যালয়গুলোতে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করা যাবে না।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কোনো ব্যবসায়িক কেন্দ্র স্থাপন, স্থানান্তর বা অননুমোদিত ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করলে তা নিয়ন্ত্রক বিধি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের ক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইন এবং প্রযোজ্য নির্দেশিকা অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের সুশৃঙ্খল সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবসায়িক কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করা হবে। একই সঙ্গে পরিস্থিতির আলোকে ভবিষ্যতে নির্দেশিকায় সংশোধন আনার ক্ষমতাও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংরক্ষণ করে।
Posted ০৮:১৩ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com