|

Advertisement
×

ঢাকার বাইরে দ্রুত ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু, চাপে হাসপাতাল

মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬   প্রিন্ট   ৭ বার পঠিত

ঢাকার বাইরে দ্রুত ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু, চাপে হাসপাতাল

রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু। ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও বরিশালে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার বাইরে এডিস মশার বিস্তার ঠেকাতে জোরালো মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

ঢাকায় এখনো ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৯ হাজার ৭৪২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

দেশব্যাপী এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৮৮ হাজার ৩৬০ জন এবং মারা গেছেন ২৭১ জন।

ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে খুলনায়। পাঁচ জেলায় মোট ১২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে খুলনায় ৪৪ জন, ময়মনসিংহে ২২, চট্টগ্রামে ২০, বরিশালে ১৯ এবং রাজশাহীতে ১৫ জন মারা গেছেন।

গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজন ঢাকার এবং ছয়জন বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের বাসিন্দা।

ঢাকার বাইরে ছড়াচ্ছে এডিস মশা

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর বাইরে এডিস মশার বিস্তার ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। অন্যদিকে গুরুতর রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও অভিজ্ঞ জনবল এখনো মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মেডিকেল কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, এডিস মশা এখন বিভিন্ন জেলা, উপজেলা এমনকি গ্রাম পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়ছে।

তিনি বলেন, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদ এবং পৌরসভাগুলোর মশক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ও বাজেট রয়েছে। তাই এসব প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত বৈজ্ঞানিক ও তথ্যভিত্তিক মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বেনজীর আহমেদ বলেন, ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর বিস্তার এখন বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজধানীর বাইরে চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে গুরুতর রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ছুটতে না হয়।

চট্টগ্রামে হাসপাতালগুলোতে তীব্র চাপ

চট্টগ্রামেও ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো।

বাঁশখালীর বাসিন্দা ৪০ বছর বয়সী আবু তাহের ছয় দিন জ্বরে ভোগার পর শনিবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর ভর্তি হন। দুই দিন হাসপাতালে থাকার পরও ডেঙ্গু ওয়ার্ডে শয্যা না পাওয়ায় তিনি করিডোরে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

হাসপাতালটির ডেঙ্গু ইউনিটে শয্যা রয়েছে ৪০টি। কিন্তু রোববার সকাল ১০টা পর্যন্ত সেখানে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৪ জনে।

হাসপাতালের ডেঙ্গু ফোকাল পারসন ডা. নূর মোহাম্মদ বলেন, অনেক রোগী শক সিনড্রোম ও রক্তক্ষরণ নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। কারও কারও রক্তচাপও বিপজ্জনকভাবে কমে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তাসলিম উদ্দিন বলেন, রোগীর চাপ আরও বাড়লে তাদের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস এবং চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হবে।

বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও একই চিত্র। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালের এজিএম আমান উল্লাহ আমান জানান, কোনো শয্যা বা কেবিন খালি নেই। ফলে জরুরি বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর রোগীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল চট্টগ্রামেও জরুরি বিভাগ ছাড়া কোনো শয্যা খালি নেই। অন্যদিকে সেন্টার ফর স্পেশালাইজড কেয়ার হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ইউনিট চালু করেছে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান জানান, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১৬ নম্বর ওয়ার্ড পুরোপুরি ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। রোগীর চাপ সামলাতে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল এবং চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ময়মনসিংহ, খুলনা ও বরিশালেও বাড়ছে চাপ

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৫০ শয্যার ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গতকাল রোগীর সংখ্যা ১১৯ জনে পৌঁছায়। অতিরিক্ত রোগীর কারণে অনেককে মেঝে ও বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন একটি ওয়ার্ড খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

বরিশালে বিভাগীয় পর্যায়ে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

খুলনাতেও ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। খুলনার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শওকত আলী বলেন, পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে অন্তত পাঁচটি করে আইসোলেশন শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে খুলনা সিটি করপোরেশন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে একটি অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

মশক নিয়ন্ত্রণে জোর দেওয়ার তাগিদ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক বিভাগের পরিচালক ডা. নুরুল ইসলাম বলেন, যেসব হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে, সেখানে অতিরিক্ত ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

তবে শুধু চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না—ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশক নিধন কার্যক্রমে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ কমাতে আক্রান্তদের চিকিৎসার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি এবং সমন্বিত মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

Facebook Comments Box

Posted ১২:৫২ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com