অনলাইন ডেস্ক
মঙ্গলবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ প্রিন্ট ৪৭৯ বার পঠিত
জমি ক্রয়ের নামে দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১৬ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা আত্মসাতের মামলায় কোম্পানিটির সাবেক চেয়ারম্যান নাসির আলী শাহ, তার শ্যালক ও পরিচালক নাজিম তাজিক চৌধুরী এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. এ করিমের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক শেখ শরীফুল আলম গত ৯ নভেম্বর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই প্রতিবেদন দাখিল করেন।
প্রতিবেদনে আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
প্রতিবেদনের মতামত অংশে তদন্ত কর্মকর্তা লিখেছেন, “আরজিতে বর্ণিত বিবাদী ০১। নাসির আলী শাহ, ০২। নাজিম তাজিক চৌধুরী ও ০৩। এম,এ করিম কোম্পানীর ক্রয় কমিটিতে দায়িত্ব (কোম্পানীর প্রতিনিধি) পালন অবস্থায় কোম্পানীর স্বার্থ সংরক্ষণ না করে, প্লট বা জমির মালিকানা যাচাই ও জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ না করে, ত্রুটিপূর্ণ ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে বা প্রতারণামূলকভাবে ইস্টার্ন হাউজিং লি. এর সাথে একই উদ্দেশ্যে পরস্পর যোগসাজশে তৎকালীন বাজার মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্য বাবদ বিবাদীরা ইস্টার্ন হাউজিং লি. কে ১৬,৭০,৪০,০০০.০০ (ষোল কোটি সত্তর লক্ষ চল্লিশ হাজার) টাকা পরিশোধের নামে আত্মসাৎ করে বিশ্বাস ভঙ্গ করায় বিবাদীদের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ৪০৬/৪০৯/৪২০/১০৯/৩৪ ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে।”
এর আগে গত ১৫ মে এই মামলা তদন্তে সিআইডিকে নির্দেশ দেয় আদালত। দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় কোম্পানির পক্ষে শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালক প্রদীপ সেন বাদি হয়ে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে এই মামলা করেন। দন্ডবিধির ৪০৬, ৪০৯, ৪২০, ১০৯ ও ৩৪ ধারায় দায়ের করা ওই মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১১ সালে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের ৯১ তম সভার সিদ্ধান্তে তিনটি প্লটে ২০.৬২ কাঠা জমি কেনা হয়। ২০১৭ সালে যার দুটি প্লট রেজিস্ট্রি করে ৭২ লাখ ৬০ হাজার টাকা দলিল মূল্য দেখানো হয়। কিন্তু দুর্নীতিবাজ এই পরিচালকরা ২০১১ সালের ১২ জুলাই থেকে ২০১৭ সালের ২৮ মে পর্যন্ত ২১ টি চেকের মাধ্যমে জমি বিক্রেতা ইস্টার্ন হাউজিংকে ২৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা পরিশোধ দেখান। পরবর্তীতে মেসার্স হুদা ভাসি চৌধুরি অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টস ফার্মের ব্যবস্থাপনা নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজধানীর আফতাব নগর প্রকল্পের ওই জমিতে তৎকালীন বাজার মূল্যের চেয়ে ১৬ কোটি ৭০ লাখ ৪০ হাজার টাকা বেশি দাম দেখানো হয়েছে। অডিট আপত্তি ছাড়াও বিভিন্ন সূত্রে এই জমি ক্রয়ে জালজালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠে আসে। যার ফলশ্রুতিতে কোম্পানির ১৪৫, ১৪৬ ও ১৭৭ তম পর্ষদ সভায় এই আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা হয় এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অডিট প্রতিবেদনে এই জমি ক্রয়ে অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতে কোম্পানির আরো কিছু কর্মকর্তা জড়িত বলে প্রতীয়মাণ হয়। প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদের ১৪৫, ১৪৬ ও ১৭৭ তম সভায় নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান হুদা ভাসি চৌধুরীর ব্যবস্থাপনা নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোম্পানির টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
প্রতিবেদনের সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনায় প্রাপ্ত তথ্য অংশে তদন্ত কর্মকর্তা লিখেছেন, “মামলাটি সার্বিক তদন্তে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণে জানা যায় যে, কোম্পানির গঠিত সাবজেক্ট কমিটি-১ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১১/০৭/১১ ইং তারিখের সুপারিশ ক্রমে কোম্পানীর বিনিয়োগ হিসাবে ইস্টার্ন হাউজিং লি. আফতাব নগর প্রকল্প হতে তিন (০৩)টি প্লট সর্বমোট-২০.৬২ কাঠা ভূমি সর্বমোট ২৫,৬২,৯০,০০০.০০ (পঁচিশ কোটি বাষট্টি লাখ নব্বই হাজার) টাকা মূল্যে কোম্পানির নামে ক্রয়ের জন্য ১২/০৭/২০১১ ইং তারিখে ৯১তম সভায় সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। (সংযুক্ত সাবজেক্ট-১ এর সুপারিশ কপি ও ৯১তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত)।
প্লট বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ণ হাউজিং এর পক্ষে মহাব্যবস্থাপকের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায় ইস্টার্ণ হাউজিং লিমিটেড আফতাবনগর প্রকল্প হতে ০৩ টি প্লট যার আয়তন ২০.৬২ কাঠা জমির মূল্য এবং ভূমি উন্নয়ন মূল্য বাবদ প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানী হতে ২৫,৬২,৯০,০০০.০০ টাকা গ্রহণ করেছেন মর্মে স্বীকার করেছেন। (প্রতিবেদন সংযুক্ত) সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রগ্রেসিভ লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানি লিঃ নামীয় ৩টি প্লটের বিপরীতে (১) হিসাব নং- ১২৬৭৭৩১০০১৬০৪৭, প্রাইম ব্যাংক পিএলসি, ফরেন এক্সচেঞ্জ ব্রাঞ্চ, ঢাকা (২) হিসাব নং- ১২৯৫ জনতা ব্যাংক পিএলসি, কাকরাইল শাখা, ঢাকার মাধ্যমে জমি বিক্রেতাকে ইস্টার্ন হাউজিং লিঃ এর অনুকূলে মোট- ২৬,৫৬,২৯,০৭৪.০০ (ছাব্বিশ কোটি ছাপান্ন লক্ষ উনত্রিশ হাজার চুয়াত্তর টাকা প্রেরণ করেন। কিন্তু গত ১৮/০৬/২০১৭ খ্রিঃ তারিখে সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়, বাড্ডা, ঢাকায় রেজিস্ট্রিকৃত ২টি প্লটের সাব কবলা দলিল নং-৬২২১/১৭ মূল্য ২৬,৮০,০০০.০০ টাকা এবং দলিল নং ৬২২২/১৭ ৪৫,৮০,০০০.০০ টাকা সর্বমোট ৭২,৬০,০০০.০০ টাকা দেখানো হয় এবং একটি প্লটের মালিকানা কোম্পানীর নামে হস্তান্তরে সমস্যা দেখা দেয়। ২০০৯-২০১২ সালে কোম্পানীর অডিট রিপোর্টে কোম্পানি স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়ে আর্থিক অনিয়ম পরিলক্ষিত হলে পরিচালকদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি দেখা দেয়।
পরিচালকদের একাংশ আদালতের আশ্রয় নেয়। মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে হুদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউটেন্টসকে স্বাধীন নিরপেক্ষ নিরীক্ষক নিয়োগ দেন। হুদা ভাসি কর্তৃক ২৬ সেপ্টম্বর ২০১৭ সালে অত্র প্রতিষ্ঠানের অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, আফতাব নগর প্রকল্পের প্লট ক্রয়ের ক্ষেত্রে তৎকালীন বাজার মূল্য থেকে মোট ১৬,৭০,৪০,০০০.০০ (ষোল কোটি সত্তর লক্ষ চল্লিশ হাজার) টাকা অধিক মূল্যে ক্রয় করেন। যা প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হয়েছে মর্মে উল্লেখ করেন। প্লট ক্রয়ের জন্য তৎকালীন পরিচালক পর্ষদকে দায়ী করেন। ( ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সাফ-কবলা দলিল নং-৬২২১/১৭ ও ৬২২২/১৭, হুদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউটেন্টস এর অডিট প্রতিবেদন কপি সংযুক্ত)।
হুদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউটেন্টস এর সিনিয়র পার্টনার এ এফ নেসারুদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি লিখিত জবানবন্দি উল্লেখ করেন যে, প্লট ক্রয়ের পূর্বে মালিকানা যাচাই করার জন্য একজন আইনজীবীর সাহায্য নিয়ে পুরা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং জমির মূল্য নির্ধারণে মূল্যায়ণকারী নিয়োগ করে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি। (কাঃ বিঃ ১৬১ ধারা মোতাবেক গৃহিত জবানবন্দী সংযুক্ত)।
মামলাটি তদন্তকালে আরো জানা যায় বিবাদী নাজিম তাজিক চৌধুরীর বড় ভাই এবং বিবাদী নাসির আলী শাহ এর শ্যালক নাজিম নওয়াজ চৌধুরী তখন ইস্টার্ণ হাউজিং লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর (হেড অব এডমিন) পদে কর্মরত থাকার সুবাদে বিবাদিরা কৌশলে তার মাধ্যমে ইস্টার্ণ হাউজিং লিমিটেড এর আফতাব নগর প্রকল্পে তিনটি প্লট ক্রয়ে মূল্য পরিশোধের নামে টাকা আত্মসাৎ করেন। এছাড়া জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ করার পদক্ষেপগুলো তদন্তকালে পরিলক্ষিত হয়নি। যাহা ত্রুটিপূর্ণ ক্রয় পদ্ধতি প্রমাণিত হয়। সাবজেক্ট কমিটি-১ জমির মালিকানা সঠিকতা এবং সঠিক মূল্য নির্ধারণ সংক্রান্তে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তড়িঘড়ি করে মাত্র এক দিনের মধ্যে সুপারিশ করেন। সরেজমিনে তদন্তে পাশাপাশি অন্যান্য প্লটের মূল্য যাচাই ও বিশ্বস্ত সূত্রের মাধ্যমে জানা যায় ২০১১ সালে প্রতি কাঠা জমির মূল্য অনুমান ৪০,০০,০০০.০০ টাকা হতে
৪৫,০০,০০০.০০ টাকা ছিল। তৎকালীন সময়ে প্রতি কাঠা জমির মূল্য ১,৩০,০০০০০.০০ টাকা নির্ধারন করা হয়েছিল। জমির তৎকালীন প্রতি কাঠায় বাজার মূল্যের চেয়ে ক্রয় মূল্য ৮৫,০০,০০০.০০ টাকা থেকে ৯০,০০,০০০.০০ টাকা বিবাদী অতিরিক্ত প্রদানের নামে আত্মসাৎ করেছেন মর্মে প্রমাণিত হয়।
কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের ১৪৫, ১৪৬, ১৭৭তম বোর্ড সভা ও বীমা কর্তৃপক্ষের কোম্পানির আর্থিক দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আর্থিক অনিয়মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদ সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। (১৪৫, ১৪৬ ও ১৭৭ তম পরিচালনা পর্ষদের সভার কার্যবিবরণী সংযুক্ত)। এছাড়াও অত্র কোম্পানির আর্থিক দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে বীমা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে সত্যতা পায় এবং আর্থিক অনিয়মের সাথে জড়িত বিবাদীদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করার সুপারিশ করেন(বীমা কর্তৃপক্ষের চিঠি সংযুক্ত)।
আরজিতে বর্ণিত বিবাদীরা কোম্পানীর স্থাবর সম্পতি ক্রয় কমিটিতে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কোম্পানীর স্বার্থ সংরক্ষণ না করে, প্লট বা জমির মালিকানা যাচাই ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ না করে, ত্রুটিপূর্ণ ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে বা প্রতারণামূলকভাবে ইষ্টার্ন হাউজিং লিঃ এর পরস্পর যোগসাজশে তৎকালীন বাজার মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্য বাবদ বিবাদীরা ইষ্টার্ন হাউজিং লিঃ কে ১৬,৭০,৪০,০০০.০০ (ষোল কোটি সত্তর লক্ষ চল্লিশ হাজার) টাকা পরিশোধের নামে আত্মসাৎ করতঃ বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন এবং কোম্পানীর ক্ষতিসাধন করেছেন।”
Posted ০৯:১৮ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com