মো. বাহা উদ্দিন খান (বাহার)
মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬ প্রিন্ট ৩৫ বার পঠিত
অগ্নিকান্ড থেকে শুরু করে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন, গাড়ি দুর্ঘটনা থেকে বন্যা-জলোচ্ছ্বাস্ত আধুনিক অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে ঝুঁকি লুকিয়ে থাকে। এই ঝুঁকি মোকাবিলার সবচেয়ে সংগঠিত ও সাশ্রয়ী কাঠামো হলো সাধারণ বীমা বা নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স। বিশ্বের উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে সাধারণ বীমা কেবল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা নয়, বরং পুঁজিবাজার, বৈদেশিক বাণিজ্য ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কিন্তু বাংলাদেশে ছবিটা ভিন্ন। প্রায় ৮২টি বীমা প্রতিষ্ঠান নিয়ে গড়ে ওঠা এই খাতটি এখনও দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় নিতান্তই ছোট, এবং সাধারণ বীমার ব্যবহার এত কম যে একে বিশেষজ্ঞরা “হারানো সুযোগ” বলে অভিহিত করছেন।
সাধারণ বীমা কেন গুরুত্বপূর্ণ
সাধারণ বীমা মূলত অগ্নি, মেরিন (নৌ ও আমদানি-রপ্তানি পণ্য), মোটর, প্রকৌশল, স্বাস্থ্য ও বিবিধ দুর্ঘটনাজনিত ঝুঁকি কভার করে। এর গুরুত্ব বহুমাত্রিক:
● ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতা রক্ষা: কারখানায় আগুন লাগলে বা গুদাম ক্ষতিগ্রস্ত হলে বীমা ক্ষতিপূরণ ব্যবসাকে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে, নয়তো একটি দুর্ঘটনাই কোনো উদ্যোক্তাকে সর্বস্বান্ত করে দিতে পারে।
● ব্যাংক ঋণ ও বিনিয়োগের পূর্বশর্ত: বড় প্রকল্পে ব্যাংকঋণ পেতে হলে সম্পদ বীমা করা বাধ্যতামূলক—ফলে সাধারণ বীমা পরোক্ষভাবে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে।
● আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহায়ক: রপ্তানি-আমদানি পণ্যের মেরিন কার্গো বীমা ছাড়া আন্তর্জাতিক ঋণপত্র (এলসি) খোলা কার্যত অসম্ভব; তাই তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের সঙ্গে এই খাত ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
● দুর্যোগ ও জলবায়ু ঝুঁকি হ্রাস: ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙনপ্রবণ বাংলাদেশে প্যারামেট্রিক ও ফসল বীমা কৃষক ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আর্থিক সুরক্ষার একটি সম্ভাব্য বড় হাতিয়ার।
● রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের চাপ কমানো: বেসরকারি বীমা যত বেশি ঝুঁকি শোষণ করে, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনে সরকারের ওপর তত কম আর্থিক চাপ পড়ে।
সংক্ষেপে, সাধারণ বীমা অর্থনীতির একটি “শক অ্যাবজর্বার”—যা আকস্মিক ক্ষতিকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটে পরিণত হতে বাধা দেয় এবং পুঁজি ও বিনিয়োগের ঝুঁকি ভাগাভাগি করে প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে।
বাংলাদেশের চিত্র: পরিসংখ্যানে বাস্তবতা
বাংলাদেশ বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর তথ্য এবং সাম্প্রতিক শিল্প বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জীবন ও সাধারণ বীমা মিলিয়ে মোট প্রিমিয়াম আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮,৭০০-১৮,৮০০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় মাত্র প্রায় ৭ শতাংশ বেড়েছে—গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে ধীর প্রবৃদ্ধি। এই মোট প্রিমিয়ামের প্রায় ৬৫ শতাংশ আসে জীবন বীমা থেকে, বাকি অংশ সাধারণ বীমা থেকে—যা মূলত মোটর, অগ্নি ও মেরিন বীমাকেন্দ্রিক, খুচরা স্বাস্থ্য বা সম্পত্তি বীমায় সম্প্রসারণ এখনও সীমিত।
চিত্র ১: বাংলাদেশের মোট বীমা প্রিমিয়ামে জীবন ও সাধারণ বীমার আনুমানিক অংশ, ২০২৪-২৫
সবচেয়ে উদ্বেগজনক সূচক হলো বীমা পেনিট্রেশন রেট—অর্থাৎ মোট প্রিমিয়াম আয় জিডিপির কত শতাংশ। ২০০৯ সালে এই হার ছিল প্রায় ০.৯০ শতাংশ; বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিক্স (বিবিএস)-এর সাম্প্রতিক জিডিপি হিসাব অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে প্রায় ০.৩৩ শতাংশে। অর্থাৎ অর্থনীতি বহুগুণ বড় হলেও বীমার সম্প্রসারণ তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি—উল্টো আপেক্ষিকভাবে সংকুচিত হয়েছে। এককভাবে সাধারণ বীমার পেনিট্রেশন রেট আরও করুণ, দীর্ঘদিন ধরে তা জিডিপির মাত্র ০.১০-০.১৯ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।
চিত্র ২: বাংলাদেশে সামগ্রিক বীমা পেনিট্রেশন রেটের পতনমুখী প্রবণতা, ২০০৯-২০২৫ (জিডিপির %, বিভিন্ন উৎস থেকে সংকলিত আনুমানিক তথ্য)
বাজার কাঠামোর দিক থেকে দেখলে, বর্তমানে দেশে ৩৩টি জীবন বীমা ও ৪৬টি সাধারণ (নন-লাইফ) বীমা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে—তুলনামূলকভাবে ছোট প্রিমিয়াম বাজারের জন্য এটি একটি ঘনবসতিপূর্ণ কাঠামো, যা কোম্পানিগুলোর মধ্যে অসম প্রিমিয়াম প্রতিযোগিতা ও আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার শঙ্কা তৈরি করে। আশার কথা হলো, দাবি নিষ্পত্তির হার ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে ২০২২ সালের ৬১ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশে, যদিও এটি এখনও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে পিছিয়ে।
চিত্র ৩: বীমা বাজারের কাঠামো ও দাবি নিষ্পত্তির হারের প্রবণতা
দুর্যোগ-ঝুঁকির নিরিখে চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয় সুইস রি ইনস্টিটিউটের একটি বিশ্লেষণে, যেখানে বলা হয়েছে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে জিডিপির প্রায় ০.৮ শতাংশ হারানোর ঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও “সবচেয়ে কম বীমাকৃত” দেশগুলোর একটি। দেশের “ইনস্যুরেন্স গ্যাপ”—অর্থাৎ যেসব সম্পদ ঝুঁকিতে আছে কিন্তু বীমার আওতায় নেই তার পরিমাণ প্রায় ৫৫০ কোটি ডলার বা জিডিপির ২.১ শতাংশ। এর অর্থ, একটি বড় দুর্যোগ ঘটলে সেই ক্ষতির প্রায় পুরোটাই রাষ্ট্র, পরিবার ও ব্যবসাকে নিজ নিজ পকেট থেকে বহন করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় খাত ও সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের ভূমিকা
বাংলাদেশের সাধারণ বীমা খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা কর্পোরেশন (এসবিসি)। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কর্পোরেশন এখনও দেশের বীমা বাজারের প্রায় ২০ শতাংশ প্রিমিয়াম শেয়ার ধরে রেখেছে এবং একই সঙ্গে দেশীয় পুনর্বীমা (রি-ইন্স্যুরেন্স) সক্ষমতার প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। বেসরকারি সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোকে বড় ঝুঁকি বিদেশে পুনর্বীমা করার আগে একটি নির্দিষ্ট অংশ বাধ্যতামূলকভাবে এসবিসির কাছে হস্তান্তর করতে হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে সহায়ক হলেও একে ঘিরে দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশ্নও ওঠে নিয়মিত। রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি খাতের এই সহাবস্থান বাংলাদেশের বীমা বাজারের একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কাঠামো, যা ভবিষ্যতে সংস্কারের মাধ্যমে আরও কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে।
বিশ্ব ও উপমহাদেশের সঙ্গে তুলনা
বৈশ্বিক গড় বীমা পেনিট্রেশন রেট প্রায় ৭ শতাংশ (উন্নত দেশগুলোর ওইসিডি গড় ৬.২ শতাংশ), যেখানে বাংলাদেশ আছে মাত্র ০.৩৩-০.৫ শতাংশে—অর্থাৎ বৈশ্বিক গড়ের প্রায় ১/২০ ভাগ। উপমহাদেশ ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলেও চিত্রটি বাংলাদেশের অনুকূলে নয়। ভারতে বীমা পেনিট্রেশন প্রায় ৪ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৫ শতাংশ, ভিয়েতনামে ২.৩ শতাংশ, ফিলিপাইনে ১.৯ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় প্রায় ১.২৫ শতাংশ। ভারতের সঙ্গে ব্যবধান বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ—কারণ একই অঞ্চলে, প্রায় একই ধরনের ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে থেকেও ভারতের বীমা বাজার বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ১২ গুণ বেশি গভীর।
চিত্র ৪: বাংলাদেশ, দক্ষিণ-এশীয় প্রতিবেশী ও বৈশ্বিক গড় বীমা পেনিট্রেশনের তুলনা
বীমা ঘনত্ব , অর্থাৎ মাথাপিছু বীমা প্রিমিয়ামের হিসেবেও বাংলাদেশ পিছিয়ে মাথাপিছু বার্ষিক প্রিমিয়াম মাত্র ১২ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি, যেখানে ভারতে তা প্রায় ৭৮ ডলার। দেশের ১৭ কোটির বেশি মানুষের মধ্যে মাত্র প্রায় ২ কোটি মানুষের কোনো না কোনো বীমা সুরক্ষা আছে অর্থাৎ জনসংখ্যার প্রায় ৮৮ শতাংশ এখনও সম্পূর্ণ বীমাবিহীন। এই ব্যবধান শুধু সংখ্যাগত নয়, এটি প্রতিফলিত করে সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি, যা দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।
চ্যালেঞ্জ: কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ
● আস্থার সংকট ও দাবি নিষ্পত্তিতে বিলম্ব: পলিসিহোল্ডারদের একটি বড় অংশের অভিজ্ঞতা হলো দাবি দাখিলের পর দীর্ঘসূত্রতা ও জটিল প্রক্রিয়া, যা বীমার প্রতি সাধারণ মানুষের অনাগ্রহ তৈরি করে।
● সচেতনতার অভাব: গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে বীমা পণ্য সম্পর্কে ধারণা সীমিত; অনেকে একে অপ্রয়োজনীয় বা কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখেন।
● অতিরিক্ত সংখ্যক প্রতিষ্ঠান ও মূল্য প্রতিযোগিতা: ৪৬টি নন-লাইফ কোম্পানি তুলনামূলক ছোট বাজারে প্রতিযোগিতা করায় প্রিমিয়াম রেট অস্বাভাবিকভাবে কমিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানিগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল করে।
● পণ্যের সীমিত বৈচিত্র্য: খুচরা স্বাস্থ্য বীমা, ব্যক্তিগত সম্পত্তি বীমা বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য উপযোগী প্যাকেজ পণ্যের সরবরাহ এখনও সীমিত।
● নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও তদারকিতে দুর্বলতা: স্বচ্ছতার ঘাটতি ও তদারকি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকের আস্থা অর্জনে বাধা তৈরি করে।
● ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা: অনলাইন পলিসি ক্রয়, প্রিমিয়াম পরিশোধ ও দাবি নিষ্পত্তির ডিজিটাল ব্যবস্থা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে, ফলে দূরবর্তী অঞ্চলের গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানো কঠিন।
● পুনর্বীমা সক্ষমতার সীমা: বড় ঝুঁকি (যেমন শিল্প কারখানা বা অবকাঠামো প্রকল্প) দেশীয়ভাবে ধারণের সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় বিদেশি পুনর্বীমার ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে।
সম্ভাবনা: যেখানে ভবিষ্যৎ লুকিয়ে
চ্যালেঞ্জ যেমন বাস্তব, তেমনি সম্ভাবনাও বিশাল—এবং সেই সম্ভাবনা মূলত অব্যবহৃত বাজারের গভীরতা থেকেই আসছে।
● ক্ষুদ্র বীমা (মাইক্রো-ইনস্যুরেন্স): কম প্রিমিয়ামে সহজ শর্তে গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য ফসল, গবাদিপশু ও স্বাস্থ্য বীমা পণ্য দ্রুত সম্প্রসারণযোগ্য একটি ক্ষেত্র, যা মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) বিশাল ব্যবহারকারী ভিত্তিকে কাজে লাগাতে পারে।
● ইনস্যুরটেক ও ডিজিটাল বিতরণ: মোবাইল অ্যাপ, এমএফএস প্ল্যাটফর্ম ও এপিআই-ভিত্তিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পলিসি বিক্রয় থেকে দাবি নিষ্পত্তি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজ করলে বিতরণ খরচ কমবে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলেও প্রবেশযোগ্যতা বাড়বে।
● প্যারামেট্রিক ও জলবায়ু বীমা: পূর্বনির্ধারিত সূচক (যেমন বৃষ্টিপাত বা বাতাসের গতি) ভিত্তিক প্যারামেট্রিক বীমা দ্রুত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে পারে, যা ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাপ্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু-অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
● স্বাস্থ্য বীমার সম্প্রসারণ: ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি ও পারিবারিক স্বাস্থ্য বীমা একটি সম্ভাবনাময় বাজার, যা এখনও প্রায় অস্পৃশ্য।
● বাধ্যতামূলক বীমার সম্প্রসারণ: নির্মাণ, আমদানি-রপ্তানি ও শিল্প স্থাপনায় নির্দিষ্ট ধরনের বীমা বাধ্যতামূলক করার নীতি বাজারকে আরও বড় করতে পারে, যেমনটি অনেক উন্নত অর্থনীতিতে দেখা যায়।
● একত্রীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি: অতিরিক্ত সংখ্যক ছোট কোম্পানিকে সংযুক্তকরণ বা একীভূতকরণের মাধ্যমে আর্থিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব, যা প্রিমিয়াম প্রতিযোগিতা কমিয়ে সেবার মান বাড়াবে।
আইডিআরএ ইতিমধ্যে বীমা আইন সংশোধন, গ্রাহক সুরক্ষা গাইডলাইন প্রণয়ন এবং দাবি নিষ্পত্তি তদারকি জোরদারের মতো উদ্যোগ নিয়েছে, যা সঠিক দিকে একটি পদক্ষেপ। তবে টেকসই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন নীতিগত ধারাবাহিকতা, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ এবং জনসচেতনতা তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি।
করণীয়: নীতিনির্ধারকদের জন্য সুপারিশ
● দ্রুত ও স্বচ্ছ দাবি নিষ্পত্তি ব্যবস্থা: নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দাবি নিষ্পত্তি বাধ্যতামূলক করে জরিমানার বিধান রাখা হলে গ্রাহক আস্থা দ্রুত বাড়বে।
● বাধ্যতামূলক বীমার আওতা সম্প্রসারণ: নির্মাণ শিল্প, বহুতল ভবন, শিল্প-কারখানা ও গণপরিবহনে ধাপে ধাপে বাধ্যতামূলক বীমা কার্যকর করা।
● আর্থিক শিক্ষা ও সচেতনতা কর্মসূচি: বিদ্যালয় পাঠ্যক্রম, গণমাধ্যম প্রচারণা ও ব্যাংক-এমএফএস চ্যানেলের মাধ্যমে বীমার গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি।
● ছোট কোম্পানিগুলোর একত্রীকরণ ও ন্যূনতম মূলধন পুনর্মূল্যায়ন: আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূত করে খাতকে সুসংহত ও প্রতিযোগিতা-সহনশীল করা।
● ডিজিটাল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ: কেন্দ্রীয়ভাবে সংযুক্ত পলিসি ডেটাবেজ, ই-কেওয়াইসি ও মোবাইল-ভিত্তিক দাবি প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা চালু করা।
● জলবায়ু ও দুর্যোগ বীমার জন্য পৃথক তহবিল ও পুনর্বীমা কাঠামো গড়ে তোলা, যাতে আন্তর্জাতিক জলবায়ু-অর্থায়নের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা যায়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বার্ষিক গড়ে প্রায় ছয়-সাত শতাংশ হারে বাড়লেও সাধারণ বীমা খাত সেই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়েছে বরং আপেক্ষিক গুরুত্ব হারিয়েছে। অথচ একটি গতিশীল অর্থনীতি, ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন, দুর্যোগপ্রবণ ভূপ্রকৃতি এবং বিস্তৃত রপ্তানি খাত ই সবকিছুই সাধারণ বীমার জন্য সুবিশাল সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। প্রয়োজন শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর বিতরণ ব্যবস্থা, দ্রুত ও স্বচ্ছ দাবি নিষ্পত্তি এবং জনসচেতনতা তৈরির সমন্বিত উদ্যোগ। এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া গেলে সাধারণ বীমা কেবল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার হাতিয়ারই থাকবে না, হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক।
তথ্যসূত্র: বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), নিউ এজ, সুইস রি ইনস্টিটিউট সিগমা রিপোর্ট, লাইটক্যাসল পার্টনার্স ও বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিক্স (বিবিএস)-এর প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত থেকে সংগৃহীত।
মো. বাহা উদ্দিন খান (বাহার)
ইমেইল- baharkhan87@gmail.com
ম্যানেজার, ইন্টারনাল অডিট এন্ড কমপ্লায়েন্স ডিপার্টমেন্ট
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
Posted ০১:৫৫ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com