|

Advertisement
×

আজ চিঠি দিবস

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬   প্রিন্ট   ৭ বার পঠিত

আজ চিঠি দিবস

আজ ১ সেপ্টেম্বর। আন্তর্জাতিক চিঠি দিবস। বর্তমানে চিঠির প্রচলন কমে গেলেও আগে এই চিঠি ছিল যোগাযোগের প্রধানতম মাধ্যম। দুটি অক্ষরের একটি শব্দ চিঠি। চিঠিকে ব্যক্তির আত্মপ্রকাশের দর্পণ বলা যায়। আগে কোনো খবর দূরে কাউকে জানানোর জন্য বেশ কয়েকদিন সময় লাগত। গুনতে হতো কয়েক দিন, আবার কখনোবা মাস। চিঠি পাওয়ার মতো আনন্দের সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা হয় না। নিজ হাতে লেখা চিঠির মধ্যেই হৃদয়ের সব কথা, আবেগ, আকুলতা- ব্যাকুলতা সব কিছু প্রকাশ পেত।

কাগজ আবিষ্কারের আগে মানুষ গাছের পাতায়, গাছের ছালে, চামড়ায়, ধাতব পাতে চিঠি লিখত। আর পাতায় বেশি লেখা হতো বলেই এর নাম হয় ‘পত্র’। যোগাযোগের সবচেয়ে সহজ ও একমাত্র মাধ্যম ছিল এই পত্র বা চিঠি।

চিঠির প্রচলন কবে থেকে শুরু, তার কোনো নির্দিষ্ট দিন তারিখ ইতিহাসে লিপিবদ্ধ নেই। তবে চিঠি বিষয়টা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। চিঠির আশ্চর্যজনক ক্ষমতা হলো মনের জমানো অব্যক্ত কথা নানা শঙ্কার কারণে অনেক সময় মুখে প্রকাশ না করা গেলেও চিঠিতে লিখে সহজেই প্রকাশ করা যায়।

নব্বইর দশকেও খাকি পোশাকের পিয়নের সাইকেলের টুংটাং শব্দ আর দরজায় কড়া নেড়ে উচ্চস্বরে হাক দিত চিঠি চিঠি….। তখন কে কার আগে চিঠি নেবে এজন্য ঘরের শিশুদের মাঝে দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেতো।

হাতে লেখা চিঠি পড়ে কখনো আনন্দে মুখে হাসি ফুটত, আবার কখনও চোখের পানি গড়িয়ে পড়ত। প্রযুক্তির যুগ আসার আগে এই চিঠি কখনও বিনোদনের খোরাক যোগাত, কখনও ব্যথাতুর হৃদয়ে কান্না ঝরাতো, কখনও উৎফুল্ল করত, কখনও করত আবেগাপ্লুত। কী যে এক অপূর্ব টান ছিল সেই কালি ও কাগজে লেখা চিঠিতে। কোন কোন চিঠি বার বার খুলে পড়া হতো; যেন কোনদিনই পুরাতন হবেনা হৃদয়ের সেই ভাষা। চিঠির যুগে মানুষের ভাষাজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা থাকলেও আন্তরিকতার বিন্দুমাত্র কমতি ছিল না চিঠির পাতায়। বানান ও ভাষাগত ভুলভ্রান্তি চাপা পড়ে যেত আন্তরিক ভালোবাসার আড়ালে। প্রযুক্তির উৎকর্ষে ঢেকে গেছে চিঠির সে আনন্দ; হয়ে গেছে আজ ম্লান।

আগেকার দিনে রাজা-বাদশারা এক রাষ্ট্রের সাথে অন্য যে কোনো রাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থাপন করতো চিঠির মাধ্যমে। দেশের কূটনীতিকদের মধ্যেও খবর আদান-প্রদান করা হতো চিঠির মাধ্যমে। স্ব-দেশের খবর দূর-দূরান্তে পৌঁছে যেত ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে। কবুতর কিংবা পাখির পায়ে চিঠি লিখে উড়িয়ে দেয়া হতো। প্রত্ত্তুরে অন্যান্য দেশের রাজারাও কবুতরের পায়ে চিঠি লিখে খবর পাঠিয়ে দিতেন।
সম্রাট শের শাহের আমলে ঘোড়ায় চড়ে ডাক বিলির প্রথা চালু হয়। কালক্রমে জমিদাররাও এই প্রথা চালু রেখেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় চিঠি আদান-প্রদানের প্রচলন ঘটে। চিঠিপত্র আদান-প্রদানের ব্যবস্থায় ছিলো পোস্ট অফিস। রানাররা পিঠে চিঠির বস্তাসহ এক হাতে হারিকেন অন্য হাতে বর্শা নিয়ে রাতের অন্ধকারে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছুটে যেতেন।

সে সময়ে শিক্ষা বিস্তারে চিঠি বিশাল অবদান রেখেছে। নিরক্ষর কিংবা অশিক্ষিত লোকজনও শুধুমাত্র চিঠি পড়া ও লেখার জন্যেই স্বাক্ষরতা অর্জনের চেষ্টা করতেন। প্রিয়জন ও পরিজনের কাছে লেখা প্রতিটি চিঠিই ছিল চিন্তাশীলতা ও ধীরগতি মিশ্রণ। চিঠি লেখার প্রক্রিয়াটি ছিল মন্থর ও চিন্তাশীল। চিঠি লিখতে গেলে মানুষকে তার চিন্তাগুলোকে সুন্দরভাবে সাজাতে হতো।

প্রতি বছর পহেলা সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক চিঠি দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। ২০১৪ সালে সর্বপ্রথম অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক রিচার্ড সিম্পকিনের হাত ধরেই এই দিবসের প্রচলন শুরু হয়। নব্বই দশকে তিনি যাদেরকে অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি মনে করতেন, তাদের কাছে তিনি চিঠি লিখতেন। অনেক সময় সে’ চিঠির উত্তর পেতেন না; আবার কখনো উত্তর পেতেন। উত্তর পেলে তিনি বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়তেন। আনন্দে কাজকর্মে অনুপ্রেরণা পেতেন।

চিঠির ইতিহাস বেশ প্রসিদ্ধ। বিশ্বে প্রথম সমুদ্রডাক চালু হয় ১৬৩৩ সালে এবং চিঠির সিন্ধু নামে পরিচিত “ডাকবাক্স” পদ্ধতি চালু হয় ১৮৫০ সাল থেকে।
১৮৪০ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার রাজত্বকালে প্রথম স্ট্যাম্প করা চিঠি শুরু হয়। পোস্ট অফিসের চিঠিকে ঘিরেই এসেছে সভ্যতা। মানুষের মনের ভাব আদান-প্রদানে চিঠি দীর্ঘকাল ধরেই রাজত্ব করেছে। এই মাধ্যম যত দিক দিয়ে সফল হয়েছিল, যা অন্য কোনো মাধ্যমের দ্বারা ভবিষ্যতে সফলতা পাবে কিনা সন্দেহ।

চিঠি পেলে আমাদের আনন্দের সীমা থাকে না। বহু কবি, সাহিত্যিক চিঠিকে শিল্পের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কেহ লিখেছেন কবিতা, কেহ গল্প, কেহ উপন্যাস, কেহ নাটক। আবার অনেক গীতিকার চিঠি নিয়ে গান লিখেছেন। যেমন ‘ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’- এ’গান শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে গেছে। এখনো যেন মানুষের কানে ভেসে আসে বাংলা ছায়াছবির জনপ্রিয় গান- নাই টেলিফোন নাইরে পিয়ন নাইরে টেলিগ্রাম/বন্ধুর কাছে মনের খবর কেমনে পৌঁছাইতাম। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পত্রনির্ভর আত্মজৈবনিক উপন্যাস বাঁধনহারা। সেখানে তিনি প্রথম স্ত্রী নার্গিসকে যে চিঠি লিখেছিলেন তা আজও অনন্য। চিঠির এক জায়গায় কবি লিখেছিলেন- ‘তুমি ভুলে যেওনা আমি কবি….। আমি আঘাত করলেও ফুল দিয়ে আঘাত করি…।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের যখন সবেমাত্র বাংলা স্বরবর্ণের সঙ্গে পরিচয়, তখন তিনি বাড়ি থেকে বহুদূরে পড়তে যান। হঠাৎ তার টাকার প্রয়োজন হয়। তখন তিনি শুধু মাত্র স্বরবর্ণ দিয়েই বাবার কাছে চিঠি লেখেন। শৈশবের লেখা চিঠি। ‘বব টক পঠও ত পঠও ন পঠও ত ভত অভব মর’। বর্ণের সাথে ‘কার’ যোগ করলে তা ঠিক এমনটি হয় ‘বাবা টাকা পাঠাও তো পাঠাও, না পাঠাও তো- ভাত অভাবে মরি’।
সে সময়ে পত্র মিতালীর প্রচলনও ছিল খুব বেশি। প্রতি বছর প্রচুর ছেলেমেয়ের নাম-ঠিকানা সম্বলিত পত্র মিতালি গাইডও পাওয়া যেত বিভিন্ন বুক স্টলে বা পত্রিকার স্টলে।

চিঠি বন্ধুত্বকে শক্তিশালী করতো এবং আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতো। কেবল তাই নয়, পেশাদারি সম্পর্ককে উন্নয়ন করতো এবং আত্মপ্রকাশের সুযোগকে প্রাণবন্ত করে তুলতো। আবার পারিবারিক চিঠিগুলো অনেক সময় খবরের কাগজের বিকল্প হিসাবেও যেন ব্যবহৃত হতো। চিঠিতে গ্রামের যে কোন ঘটনা ও আশা-ভরসার খবর, আবাদের খবর বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবরসহ বিভিন্ন খবর লেখা থাকত। সেই হাতে লেখা চিঠি পরিবারের মধেও যেন এ ভাবে নিবিড় সম্পর্ক ও ভালবাসার গভীরতার সেতুবন্ধন সৃষ্টি করতো।

রঙ-বেরঙের হরেক রকমের প্যাডে সুস্পষ্ট হরফে বিভিন্ন কালি বা কলমে লেখা প্রেম ভালোবাসার চিঠিগুলো ছিল এক একটি কালজয়ী বৃহৎ প্রেমের ইতিহাস। প্রেমিক-প্রেমিকারা হৃদয়ের আকুলতা-ব্যাকুলতা দিয়ে সহজ সরল ভাষায় মনের মাধুরী মিশিয়ে লিখতেন একে -অপরকে। যেন আনন্দ, বেদনা আর ভালবাসার এক নীরব দলিল।

সময়ের বিবর্তনে আধুনিক যুগের উন্নত প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আজ সে’ চিঠি বিলুপ্ত প্রায়। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে বর্তমানে মনে চাইলেই টুক করে একটা মেসেজ পাঠিয়ে দেয়া যায়। বিজ্ঞান আমাদের নিত্য নতুন অনেক প্রযুক্তি দিয়েছে। সকলের হাতে স্মার্ট মোবাইল ফোন। নিমিষেই প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে যায় হৃদয়ের কথা। শ্রম বেঁচেছে, খরচ বেঁচেছে এবং বেঁচেছে সময়। চিঠিও ডাকবাক্সে ফেলতে হয়না। ভুল করলে বারবার কাঁটতে হয়না। অনেক নতুনত্ব সংযুক্ত হয়েছে আমাদের জীবনে। ফেসবুক, টুইটার কিংবা মেইল। তবে কাগজে লেখা চিঠির সেই আবেগময়তা আজও ভোলার নয়; নতুন প্রযুক্তিতেও খুঁজে পাওয়া যায় না সেই অনুভূতির ছোঁয়া। ডিজিটাল মেসেজে কেবল তথ্য পৌঁছে দেয়া যায় কিন্তু চিঠি পৌঁছে দিত একটি আস্ত হৃদপিন্ড। ফন্টের ভিরে হারিয়ে না যাওয়া কাগজে কালির লেখা অক্ষরগুলো কোনো প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। সে অক্ষরগুলো কেবল এখন আর শব্দ নয়, এক একটি জীবন্ত স্মৃতি।

 

 

Facebook Comments Box

Posted ০৯:৩৭ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com