শনিবার ২০ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Ad
x

প্রস্তাবিত বাজেটে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি খাতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা, কর পুনর্বিবেচনার দাবি বারভিডার

শনিবার, ২০ জুন ২০২৬   প্রিন্ট   ৩৫ বার পঠিত

প্রস্তাবিত বাজেটে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি খাতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা, কর পুনর্বিবেচনার দাবি বারভিডার

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ওপর করভার বৃদ্ধির ফলে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির গাড়ি কেনার সক্ষমতা আরও কমে যাবে এবং পুরো মোটরযান খাত নতুন সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ রিকন্ডিশন ভেহিকেলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা)। সংগঠনটির দাবি, নতুন সিসি স্ল্যাব কাঠামো এবং করহার বৃদ্ধির কারণে জনপ্রিয় রিকন্ডিশন্ড গাড়ির দাম কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাবে। এর ফলে বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও হ্রাস পেতে পারে।

শনিবার (২০ জুন) রাজধানীর ঢাকা ক্লাবের স্যামসন এইচ চৌধুরী হলে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর প্রতিক্রিয়া জানাতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বারভিডার সভাপতি আব্দুল হক। অনুষ্ঠানে সংগঠনের মহাসচিব রিয়াজ রহমান, সাবেক সভাপতি হাবিবুল্লাহ ডন, মান্নান চৌধুরী খসরু, উপদেষ্টা শহিদুল ইসলাম, সাইফুল্লাহ সম্রাটসহ সংগঠনের বর্তমান ও সাবেক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সিসি স্ল্যাব পুনর্গঠনে বাড়বে করভার:
বারভিডার নেতারা জানান, প্রস্তাবিত বাজেটে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির জন্য বিদ্যমান সিসি শ্রেণিবিন্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে ১ থেকে ১৫০০ সিসি পর্যন্ত গাড়ি একটি শ্রেণির আওতায় থাকলেও এখন তা ভেঙে ১-১২০০ সিসি এবং ১২০১-১৬০০ সিসি—এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে।

তাদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বেশি বিক্রিত রিকন্ডিশন্ড গাড়িগুলো সরাসরি উচ্চ করের আওতায় চলে যাবে। বিশেষ করে টয়োটা প্রিমিও, টয়োটা এক্সিও, অ্যালিয়ন, ফিল্ডারসহ মধ্যবিত্তের মধ্যে ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন গাড়িগুলোর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।

সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, নতুন কর কাঠামো কার্যকর হলে ১২০১-১৬০০ সিসি শ্রেণির গাড়ির মোট করভার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫৯ দশমিক ৮০ শতাংশে উন্নীত হবে। অর্থাৎ মাত্র একটি বাজেট পরিবর্তনের কারণে করভার প্রায় ২৮ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পাবে।

জনপ্রিয় গাড়ির দাম বাড়তে পারে কয়েক লাখ টাকা:
সংবাদ সম্মেলনে বারভিডা জানায়, কর বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজারদরে। একটি রিকন্ডিশন্ড টয়োটা প্রিমিওর দাম প্রায় ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত এবং একটি টয়োটা এক্সিওর দাম প্রায় আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

তাদের মতে, দেশের মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে রিকন্ডিশন্ড জাপানি গাড়িকে ব্যক্তিগত পরিবহনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। কিন্তু নতুন কর কাঠামো কার্যকর হলে এসব গাড়ি অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাবে।

বারভিডা সভাপতি আব্দুল হক বলেন, “বাজেটে নতুন গাড়ির জন্য যেসব সুবিধা রাখা হয়েছে, তা রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে, যেখানে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির দাম নতুন গাড়ির কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি হয়ে যেতে পারে।”

কমছে গাড়ির নিবন্ধন:
বারভিডা দাবি করে, গত কয়েক বছরে দেশের মোটরযান বাজারে উল্লেখযোগ্য মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। একসময় বছরে প্রায় ২১ হাজার গাড়ি নিবন্ধিত হলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ৯ হাজার ৪০০-তে নেমে এসেছে।

সংগঠনটির মতে, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং করভার বৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাবে বাজার সংকুচিত হয়েছে। নতুন বাজেট কার্যকর হলে নিবন্ধন সংখ্যা আরও কমে যেতে পারে।

বারভিডার তথ্য অনুযায়ী, দেশের রিকন্ডিশন্ড মোটরযান শিল্পে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার স্থানীয় বিনিয়োগ রয়েছে। আমদানিকারক, শোরুম মালিক, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী, সার্ভিসিং প্রতিষ্ঠান, পরিবহন সংশ্লিষ্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানসহ একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এই শিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছে।

সংগঠনটির দাবি, এই খাত থেকে প্রতিবছর প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে সরকার। এছাড়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে। ফলে বিক্রি কমে গেলে শুধু ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, সরকারের রাজস্ব আয় এবং কর্মসংস্থানও নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়বে।

ইভির জন্য সুবিধা, কিন্তু অবকাঠামো কোথায়?
প্রস্তাবিত বাজেটে বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে উল্লেখযোগ্য শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সরকার পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নিয়েছে।

তবে বারভিডার নেতারা বলছেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এখনও ইভি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পর্যাপ্ত নয়। দেশের অধিকাংশ এলাকায় চার্জিং স্টেশন নেই। এছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম এখনও সাধারণ ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি।

তাদের মতে, শুধু শুল্ক ছাড় দিয়ে ইভির বাজার সম্প্রসারণ সম্ভব নয়। চার্জিং নেটওয়ার্ক, প্রযুক্তিগত সহায়তা, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

হাইব্রিড গাড়ির জন্য সমান সুবিধা দাবি:
বারভিডা মনে করে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে হাইব্রিড ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড প্রযুক্তি। কারণ এসব গাড়ি তুলনামূলক কম জ্বালানি ব্যবহার করে, কার্বন নিঃসরণ কমায় এবং একই সঙ্গে বিদ্যমান জ্বালানি অবকাঠামোর সঙ্গে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।

সংগঠনটির অভিযোগ, সরকার ব্র্যান্ড নিউ প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির জন্য কিছু কর সুবিধা দিলেও রিকন্ডিশন্ড প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির ওপর ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক বহাল রেখেছে। এতে একই প্রযুক্তির দুই ধরনের গাড়ির মধ্যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে।

বারভিডা দাবি করেছে, ব্র্যান্ড নিউ ও রিকন্ডিশন্ড উভয় ধরনের প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির জন্য অভিন্ন শুল্কনীতি প্রণয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে ২০০১-২০২৫ সিসি ক্ষমতার প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ নির্ধারণ এবং প্রচলিত হাইব্রিড গাড়িকেও সমান সুবিধা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

রিকশা খাতকেও করের আওতায় আনার প্রস্তাব:
সংবাদ সম্মেলনে বারভিডা সভাপতি বলেন, দেশে দ্রুত বাড়তে থাকা ব্যাটারিচালিত রিকশা খাতকে নিবন্ধন ও কর কাঠামোর আওতায় আনা হলে সরকার নতুন রাজস্ব উৎস পেতে পারে। একই সঙ্গে এই খাতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

শুল্ক বৈষম্য দূর করার আহ্বান:
বারভিডার নেতারা জানান, বর্তমানে বিভিন্ন শ্রেণির রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ওপর ন্যূনতম ১৫৯ দশমিক ৮০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কর ও শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। এত উচ্চ করহার ব্যবসার জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাদের মতে, বাজেটের লক্ষ্য হওয়া উচিত রাজস্ব বৃদ্ধি এবং শিল্পের বিকাশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। অতিরিক্ত কর আরোপ করে বাজার সংকুচিত করলে শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আয়ও কমে যেতে পারে।

সংবাদ সম্মেলন থেকে বারভিডা সরকারের কাছে মধ্যম সারির রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ওপর বাড়তি কর প্রত্যাহার, নতুন ও রিকন্ডিশন্ড প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির জন্য সমান শুল্ক সুবিধা, হাইব্রিড গাড়ির জন্য নীতিগত সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল কর কাঠামো প্রণয়নের আহ্বান জানায়।

সংগঠনটির ভাষ্য, রিকন্ডিশন্ড মোটরযান খাত শুধু একটি ব্যবসায়িক খাত নয়; এটি রাজস্ব আয়, কর্মসংস্থান, আর্থিক সেবা এবং ভোক্তা পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। তাই বাজেট চূড়ান্ত করার আগে এ খাতের উদ্বেগ ও প্রস্তাবগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

Facebook Comments Box
বিষয় :

Posted ০৮:৪২ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ ক্য

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com