মঙ্গলবার ২১ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Ad
x

বহুমাত্রিক চাপে অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬   প্রিন্ট   ১০ বার পঠিত

বহুমাত্রিক চাপে অর্থনীতি

বিনিয়োগে ধীরগতি, নীতিগত অনিশ্চয়তা, সংকটাপন্ন ব্যাংক খাত এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে দেশের অর্থনীতি। আগে থেকেই সংকটে থাকা অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ।

রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক ধারায় থাকলেও অর্থনীতির মৌলিক সূচক- জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, কর্মসংস্থান পরিস্থিতি, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং রাজস্ব কাঠামো খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই।

সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০২৩ অর্থবছরে যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৫.৮২ শতাংশ, ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৪.২২ শতাংশে এবং ২০২৫ সালে তা আরও কমে প্রায় ৩.৯৭ শতাংশে নেমে আসে। এই প্রবণতা অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়। তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পূর্বাভাসে একটি আশাবাদী দিকও রয়েছেÑ কাঠামোগত সংস্কার ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি পুনরায় ৪.৭ শতাংশে উন্নীত হতে পারে এবং মধ্যমেয়াদে তা ৬ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকট মুদ্রাস্ফীতি। ২০২৬ সালের শুরুতে মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে উঠে যায়, ফেব্রুয়ারিতে এটি ৯.১৩ শতাংশে পৌঁছে এবং মার্চে কিছুটা কমে ৮.৭১ শতাংশে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, বছরজুড়ে গড় মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৮.৭ থেকে ৯.২ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে। এই উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। খাদ্যপণ্যের দাম, জ্বালানির মূল্য এবং পরিবহন ব্যয়ের বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।
শিল্প খাতের মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। দেশের মোট রপ্তানির প্রায় প্রায় ৮৫ শতাংশ এই খাত থেকে আসে এবং এটি জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রয়েছে। তবে এই একক নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। বৈশ্বিক বাজারের চাহিদার ওঠানামা, শ্রমবাজারে অস্থিরতা এবং উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধি এই খাতকে চাপে ফেলছে।

বৈদেশিক খাত বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রেখেছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের আমদানি ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল এবং ইরানের মধ্যে সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতে, এই ধরনের সংঘাত জ্বালানি মূল্যে বড় ধাক্কা দিতে পারে এবং এশিয়ার মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিনিয়োগের এতটা দুরবস্থা করোনা মহামারির সময়েও ছিল না। জ্বালানিসহ অবকাঠোমার সমস্যা আগে থেকেই ছিল, তবে তার চেয়েও বেশি ছিল আস্থাহীনতা। সরকার বেসরকারি খাতের আস্থা অর্জনের কোনো চেষ্টাও করেনি; বরং কারখানা বন্ধ হওয়ায় নতুন করে চাকরি হারিয়েছেন অন্তত ৫০ হাজার শ্রমিক। এ অবস্থায় নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জই হচ্ছে বিনিয়োগ বাড়ানো।

মানুষের আয় কমে যাওয়ায় বেড়ে গেছে দারিদ্র্যের হার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ করেছিল ২০২২ সালে, তখন দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এর পরে আর কোনো খানা ব্যয় ও আয় (এইচআইইএস) জরিপ হয়নি। তবে গত নভেম্বরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার এখন ২১ দশমিক ২ শতাংশ, এই হিসাবে এখন দেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। ২০২৫ সালে নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে।

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেলের দাম ব্যারল প্রতি ১০০ ডলারের ওপরে বা আশেপাশে অবস্থান করছে, যা ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ যেহেতু জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাই এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং শিল্প উৎপাদনে। এর ফলস্বরূপ মুদ্রাস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের আয়ের অনিশ্চয়তা রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের রাজস্ব কাঠামোও বেশ দুর্বল। কর-জিডিপি অনুপাত এখনও প্রায় ৭ শতাংশের আশেপাশে, যা আন্তর্জাতিক মানদন্ডের তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে সরকারকে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এর ফলে বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে ঋণের চাপ অর্থনীতির ওপর ঝুঁকি তৈরি করছে।

ব্যাংকিং খাত সংকটে। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং আর্থিক খাতে আস্থার সংকট বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগত সুদের হার ১০ শতাংশে ধরে রেখে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, তবে এর ফলে বিনিয়োগ ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

সব মিলিয়ে, অর্থনীতি আগে থেকেই সমস্যায় ছিল, ছিল নানা ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা। আর এখন সেই অর্থনীতি আরও চাপে পড়ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ অবস্থায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে, আস্থা পুনরুদ্ধার করতে, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে এবং অর্থনীতিকে আরও টেকসই রাখতে একটি সুসংগঠিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কৌশল দরকার, আর এর সঙ্গে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার।

Facebook Comments Box
×

Posted ০২:১০ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: ই-মেইল: bankbima1@gmail.com