সজল সরকার
শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬ প্রিন্ট ২৬ বার পঠিত
বিশ্বের সবচেয়ে কমবয়সী বিলিয়নিয়ারদের তালিকা বদলে যাচ্ছে দ্রুত। একদিকে রয়েছে শত বছরের পুরোনো শিল্প ও পারিবারিক ব্যবসার উত্তরাধিকার, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নতুন প্রযুক্তি ব্যবসা তৈরি করছে একেবারে নতুন প্রজন্মের তরুণ ধনকুবের। ২০২৬ সালের শুরুতে বিশ্বের সবচেয়ে কমবয়সী বিলিয়নিয়ারদের তালিকায় ২০ থেকে ২৩ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের আধিপত্য সেই পরিবর্তনেরই বড় উদাহরণ।
এই তালিকার সবচেয়ে বড় চমক হলো মাত্র ২২ বছর বয়সে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে স্বনির্মিত বিলিয়নিয়ার হওয়া তিন তরুণ। আবার শীর্ষস্থানীয়দের একটি বড় অংশই বিশ্বের বৃহৎ শিল্প, ওষুধ, চশমা, গেমিং ও খুচরা ব্যবসার উত্তরাধিকারী। অর্থাৎ নতুন প্রযুক্তি যেমন নতুন সম্পদ তৈরি করছে, তেমনি পুরোনো পারিবারিক ব্যবসাও তরুণ প্রজন্মকে বিলিয়ন ডলারের মালিক বানিয়ে চলেছে।
১. অ্যামেলি ফয়েট ট্রেইজেস (বয়স ২০) ব্রাজিল:
মাত্র ২০ বছর বয়সেই অ্যামেলি ফয়েট ট্রেইজেস বিশ্বের সবচেয়ে কমবয়সী বিলিয়নিয়ার। তাঁর আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। ব্রাজিলের বৈদ্যুতিক মোটর ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডব্লিউইজি-তে পরিবারের বড় অংশীদারিত্ব থেকেই তাঁর সম্পদের উৎস।
অ্যামেলি প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতার নাতনি। তবে বিপুল সম্পদের মালিক হলেও তিনি এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন পরিচালনায় যুক্ত নন। তাঁর গল্প দেখায়, বড় পারিবারিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উত্তরাধিকার কীভাবে খুব অল্প বয়সেই কাউকে বিলিয়নিয়ার করে তুলতে পারে।
২. জোহানেস ফন বাউমবাখ (বয়স ২০) জার্মানি:
মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে অ্যামেলির চেয়ে বড় জোহানেস ফন বাউমবাখ। বয়স ২০ হলেও তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বোয়েরিঙ্গার ইঙ্গেলহাইমের পারিবারিক সম্পদ থেকেই এসেছে তাঁর বিপুল সম্পদ।
তালিকার অন্য অনেক তরুণের তুলনায় তাঁর সম্পদ অনেক বেশি। তবে এর প্রধান কারণ নিজের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা পারিবারিক শিল্প সাম্রাজ্যে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অংশীদারিত্ব।
৩. লিভিয়া ফয়েট দে আসিস (বয়স ২১) ব্রাজিল:
২১ বছর বয়সী লিভিয়া ফয়েট দে আসিস বিশ্বের তরুণতম বিলিয়নিয়ারদের তালিকায় তৃতীয়। তিনি অ্যামেলি ফয়েট ট্রেইজেসের বড় বোন। দুই বোনের সম্পদের উৎসও একই—ব্রাজিলের শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডব্লিউইজি-তে পরিবারের মালিকানা।
লিভিয়ার আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। অ্যামেলির মতো তিনিও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং তুলনামূলকভাবে ব্যক্তিগত জীবনযাপন করেন। বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও ব্যবসার দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় তাঁর সরাসরি ভূমিকা নেই।
৪. ক্লেমেন্তে দেল ভেকিও (বয়স ২১) ইতালি:
ইতালীয় ব্যবসায়ী পরিবারের উত্তরাধিকারী ক্লেমেন্তে দেল ভেকিওর বয়স ২১ বছর। তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। তিনি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চশমা ও চক্ষু-অপটিক্যাল পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এসিলরলুক্সোটিকার উত্তরাধিকারীদের একজন।
এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে রে-ব্যান ও ওকলির মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড যুক্ত। ক্লেমেন্তের বাবা লিওনার্দো দেল ভেকিও ২০২২ সালে মারা যাওয়ার পর পারিবারিক হোল্ডিং কোম্পানিতে তাঁর অংশীদারিত্ব উত্তরাধিকারসূত্রে আসে। এর ফলেই এত অল্প বয়সে তাঁর সম্পদ বিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছে যায়।
৫. কিম জং-ইয়ুন (বয়স ২২) দক্ষিণ কোরিয়া:
দক্ষিণ কোরিয়ার কিম জং-ইয়ুন ২২ বছর বয়সে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক। তাঁর সম্পদের বড় উৎস এনএক্সসি, যা জনপ্রিয় ভিডিও গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নেক্সনের মূল কোম্পানি।
ম্যাপলস্টোরির মতো জনপ্রিয় গেমের জন্য নেক্সন বিশ্বজুড়ে পরিচিত। বাবার মৃত্যুর পর কিম জং-ইয়ুন পরিবারের মালিকানাধীন অংশের উত্তরাধিকারী হন। প্রযুক্তি ও বিনোদনভিত্তিক গেমিং ব্যবসার সাফল্য তাঁর সম্পদকে দ্রুত বিলিয়ন ডলারের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
৬. সূর্য মিধা (বয়স ২২) যুক্তরাষ্ট্র:
তালিকার সবচেয়ে বড় চমক সূর্য মিধা। মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে কমবয়সী স্বনির্মিত বিলিয়নিয়ার হিসেবে উঠে এসেছেন। তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।
সূর্য মিধা মার্কোরের সহপ্রতিষ্ঠাতা। প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সফটওয়্যার প্রকৌশলী ও চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করে। মার্কোরের মূল্যায়ন দ্রুত বেড়ে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পর প্রতিষ্ঠানে সূর্যের মালিকানার মূল্যও আকাশচুম্বী হয়েছে।
৭. ব্রেন্ডান ফুডি (বয়স ২২) যুক্তরাষ্ট্র:
সূর্য মিধার সঙ্গে মার্কোর প্রতিষ্ঠা করেছেন ব্রেন্ডান ফুডিও। তাঁর বয়সও ২২ বছর এবং সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।
তাঁদের প্রতিষ্ঠানের দ্রুত মূল্যবৃদ্ধি দেখিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ নয়, নতুন সম্পদ তৈরিরও শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে। খুব অল্প সময়ে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাওয়ার ঘটনা তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।
৮. আদর্শ হিরেমাথ (বয়স ২২) যুক্তরাষ্ট্র:
মার্কোরের তৃতীয় সহপ্রতিষ্ঠাতা আদর্শ হিরেমাথও ২২ বছর বয়সেই বিলিয়নিয়ার হয়েছেন। তাঁর সম্পদের পরিমাণও প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।
তিন তরুণ বন্ধু—সূর্য মিধা, ব্রেন্ডান ফুডি ও আদর্শ হিরেমাথ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নিয়োগব্যবসাকে কেন্দ্র করে যে সাফল্য অর্জন করেছেন, তা নতুন প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির শক্তি স্পষ্ট করে। তাঁরা মার্ক জাকারবার্গের চেয়েও কম বয়সে বিলিয়নিয়ার হওয়ার নজির তৈরি করেছেন।
৯. কেভিন ডেভিড লেমান (বয়স ২৩) জার্মানি:
জার্মানির কেভিন ডেভিড লেমানের বয়স ২৩ বছর। তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। জার্মানির বৃহৎ ওষুধ ও প্রসাধনসামগ্রীর খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ডিএম-এর ৫০ শতাংশ মালিকানা তাঁর সম্পদের মূল ভিত্তি।
কেভিনের বাবা তাঁকে মাত্র ১৪ বছর বয়সে প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্ব দেন। তবে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত সেই অংশীদারিত্ব ট্রাস্টের অধীনে ছিল। ১৮ বছর বয়সে তিনি এর নিয়ন্ত্রণ পান। বর্তমানে সেই অংশীদারিত্বের মূল্য প্রায় ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।
১০. পেদ্রো ফয়েট ট্রেইজেস (বয়স ২৩) ব্রাজিল:
তালিকার দশম স্থানে রয়েছেন ২৩ বছর বয়সী পেদ্রো ফয়েট ট্রেইজেস। তাঁর আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ ১ বিলিয়ন ডলার। তিনি অ্যামেলি ও লিভিয়ার বড় ভাই।
পেদ্রোর সম্পদের উৎসও ব্রাজিলের শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডব্লিউইজি। একই পরিবারের তিন ভাই-বোনের নাম বিশ্বের সবচেয়ে কমবয়সী বিলিয়নিয়ারদের তালিকায় থাকা বিরল ঘটনা। এর মাধ্যমে ফয়েট পরিবার তরুণ বিলিয়নিয়ারদের তালিকায় একটি বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছে।
এই তালিকার দিকে তাকালে বিশ্ব অর্থনীতির দুটি ভিন্ন চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে ডব্লিউইজি, বোয়েরিঙ্গার ইঙ্গেলহাইম, এসিলরলুক্সোটিকা, নেক্সন ও ডিএম-এর মতো প্রতিষ্ঠিত ব্যবসার উত্তরাধিকারীরা অল্প বয়সেই বিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক হচ্ছেন। অন্যদিকে সূর্য মিধা, ব্রেন্ডান ফুডি ও আদর্শ হিরেমাথ দেখাচ্ছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন যুগে সম্পদ তৈরির জন্য পারিবারিক সাম্রাজ্যের প্রয়োজন নেই।
বিশেষ করে মার্কোরের তিন সহপ্রতিষ্ঠাতার সাফল্য নতুন অর্থনীতির গতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। কয়েক বছর আগেও ২২ বছর বয়সে বিলিয়নিয়ার হওয়া প্রায় অকল্পনীয় ছিল। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক বিনিয়োগের সমন্বয়ে তরুণ উদ্যোক্তারা খুব অল্প সময়েই বিপুল সম্পদের মালিক হতে পারছেন।
অন্যদিকে এই তালিকার উত্তরাধিকারীদের গল্পও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা যখন এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে যাচ্ছে, তখন তরুণ উত্তরাধিকারীরাও রাতারাতি বিলিয়নিয়ার হয়ে উঠছেন। ফলে বিশ্বের সম্পদের মানচিত্রে একদিকে যেমন নতুন প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের উত্থান ঘটছে, অন্যদিকে পুরোনো পারিবারিক ব্যবসার প্রভাবও অটুট রয়েছে।
Posted ০৭:২৬ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com