|

Advertisement
×

বীমা শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব এম শামসুল আলম

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬   প্রিন্ট   ১২ বার পঠিত

বীমা শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব এম শামসুল আলম

কামারুন-নাহার-মুকুল

বাংলাদেশের বীমা খাত গঠনে অন্যতম পথিকৃৎ প্রবীন বীমা বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম।
যিনি দেশের বীমা খাতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১ম বীমা দিবস মার্চ-২০২০
প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বীমা পদকে ভূষিত হয়েছিলেন। তিনি অসুস্থ থাকার কারণে তার পক্ষে
বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে
সম্মাননা পদকটি গ্রহণ করেন তার কনিষ্ঠ কন্যা শাকেরা আলম।

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে বীমা খাত গঠনে এম শামসুল আলম ছিলেন অন্যতম বীমা
ব্যক্তিত্ব। তিনি ১৯৩৬ সালের ২১ অক্টোবর পাবনার মাদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। এম শামসুল
আলম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.কম (অনার্স) এবং এম.কম ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে উত্তীর্ণ
হন। এরপর তিনি লন্ডন থেকে অ্যাসোসিয়েট অব দ্যা চার্টার্ড ইন্সু্যরেন্স ইনস্টিটিউট
(এসিআইআই) থেকে ডিগ্রি অর্জন করেন।

এম শামসুল আলম ১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান ইন্সু্যরেন্স করপোরেশনে শিক্ষানবিশ
অফিসার হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। চাকরিকালীন সময়ে করাচির প্রধান কার্যালয়ে
১৯৬০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নাসির এ চেধৗুরীর সাথে তার পরিচয় ঘটে। দু’জনেই
শিক্ষানবিশ অফিসার। স্বাভাবিকভাবে কাজের ফাঁকে তাদের মধ্যে নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
প্রফেশনালিজম বিল্ডআপের ক্ষেত্রে তাদের পাস্পরিক আলাপ-আলোচনা এবং ‘এ সেন্স অব
কমপিটিশন’ দু’জনেই নীতিগতভাবে গ্রহণ করায় অনেক ক্ষেত্রেই পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসারদের
দ্বারা দু’জনই বরাবর আদৃত হতেন। এরই মধ্যে তাদের সম্পর্ক নিবিড় হতে থাকে। প্রথম
দিন থেকেই আপনি থেকে তুমি, দু’দিনের মধ্যেই তুমি থেকে তুই সম্বোধনে নেমে
আসে এ সম্পর্ক। নিবিড় ঘনিষ্ঠ ‘সখ্য ‘ গড়ে ওঠে- যাকে বলে হরিহর আত্মার সম্পর্ক।
চাকরির বছর দুয়েক পরেই ১৯৬২ সালে নাসির এ চেধৗুরী কলম্বো পস্নানের ট্রেনিংয়ে
লন্ডন এবং মিউনিখে উচ্চতর প্রশিক্ষণে অংশ নেন। সে সময় গুলোতেও তাদের দু’জনের সম্পর্কের
সেতু থেকেই যায়। চিঠি, যোগাযোগ, টেলিফোনে কথা বলা; থেমে ছিলেন না দু’
জনের একজনও। উচ্চতর প্রশিক্ষণ শেষে নাসির এ চেধৗুরীর দেশে ফেরার পরের বছর এম
শামসুল আলম একই প্রোগ্রামে বিলেতে এবং সুইজারল্যান্ড গমন করেন। প্রশিক্ষণ শেষে এম
শামসুল আলম ১৯৬৫ সালে বিলেত থেকে ফিরে আসেন। তখন নাসির এ চেধৗুরী আর একা
নেই; দু’জন হয়ে গেছেন। বিয়ে করে সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে এক সুন্দর বাগান
সাজিয়ে ফেলেন। তার স্ত্রী’র সাথে এম শামসুল আলমের ছোট বোনের মতো সম্পর্ক গড়ে
ওঠে।

স্বাধীনতার পর সাধারণ বীমা কর্পোরেশনে দু’জনেই পদোন্নতি পান। এক পর্যায়ে এম
শামসুল আলম ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং নাসির এ চেধৗুরী জেনারেল ম্যানেজার পদে কাজ
করেন। পেশাগত জীবনে দু’জনের মধ্যে অনেকে ক্ষেত্রেই দ্বিমত হয়েছে কিন্তু কখনো বন্ধুত্বের
সম্পর্কের অবনতি ঘটেনি। বন্ধু হিসেবে তাদের দু’জনের জুড়ি মেলা ভার। অফিসের কাজে
এই সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়; দু’জন একে অপরের শক্তি হিসেবে কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
পেশার ক্ষেত্রে দু’জনেই বরাবর সিরিয়াস। সব সময়ই চিন্তা -চেতনায় বীমা বিষয়টি ঘুরপাক
খায়। দু’জনেই বীমা পুনর্গঠনে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করে গেছেন। বীমা শিল্পে দু’জনেরই
অবদান অবশ্যই স্মরণযোগ্য। এম শামসুল আলম ১৯৬৯ সালে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং
তেহ্‌রান চলে যান। ১৯৮৩ সালে নাসির এ চেধৗুরী সাধারণ বীমা কর্পোরেশন থেকে
স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সিইও হিসেবে যোগদান
করেন। প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনেও তাদের সম্পর্কে বিন্দু মাত্র ভাঁটা পড়েনি।

এম শামসুল আলম ১৯৭৩ সালে থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত সাধারণ বীমা করপোরেশন এবং
১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত জীবন বীমা করপোরেশনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন।
২০১৪ সালে জীবন বীমা কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন; ২৫ নভেম্বর তিনি
যোগদান করেন।

বাংলাদেশ ইন্সু্যরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যানও ছিলেন। ১৯৮৮ সালে রিলায়েন্স
ইন্সু্যরেন্স কোম্পানি গঠন করেন। এ কোম্পানিতে তিনি ২০০৫ সাল থেকে ১৭ বছর
প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন; ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও থাকলেন। এরপর তার
অবসর জীবন। তিনি বারিধার কসমোপলিটন ক্লাব লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।

ওয়ান ইলেভেনের পরের ঘটনা। এম শামসুল আলম তখন লন্ডনে। টেলিফোনে সাধারণ বীমার
চেয়ারম্যান করার অফার দেয়া হলো। তিনি বাংলাদেশে চলে আসেন। ২০০৭ সাল থেকে
২০১৩ সাল পর্যন্ত সাধারণ বীমার বোর্ড চেয়ারম্যান এবং ২০১৪ ও ২০১৫ সাল এই ২ বছর
জীবন বীমার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি আর
পেশায় নেই, অবসরে।

এম শামসুল আলম তার কর্মজীবনে অনেক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। যুক্তরাজ্যের চাটার্র্ড
ইন্সুরেন্স ইনষ্টিটিউটের অ্যাসোসিয়েটশিপের সাথে একজন চার্টার্ড বীমাকারী। এ ছাড়াও তিনি
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে এশিয়ান রিইন্সু্যরেন্স কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন
করেন।

সংসার জীবনে স্ত্রী ছবি আলম, কন্যা সামিরা আলম, সাদিয়া আলম ও শাকেরা আলম ।
তিনি বঙ্গবন্ধু’র কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানার আপন খালুশ্বশুর। সাবেক প্রেসিডেন্ট মরহুম
জিলস্নুর রহমান তার ভায়রা; আইভি রহমানের ছোট বোন তার স্ত্রী। জিলস্নুর রহমান এবং
আইভি রহমান দম্পতির মেয়ে তানিয়াকে বিয়ে করেন জীবন বীমার জনক খোদা বক্‌স এর
কনিষ্ঠ পুত্র জাবেদ বখত। এদিক থেকে এই চারটি পরিবার যেন একটি বলয়ের মতো
আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। এম শামসুল আলম যেন বঙ্গবন্ধুকে দেখতে দেখতেই বড় হয়েছেন।
যখন তিনি স্কুলের ছাত্র – বঙ্গবন্ধু তখনই একজন পলিটিক্যাল লিডার; গ্রেটম্যান।

এম শামসুল আলম ছিলেন শিশুদের জন্য একজন বিনোদনকারী, তরুণ বয়সীদের জন্য
আত্মবিশ্বাসী, প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য রোল মডেল এবং প্রবীণ বয়স্কদের জন্য সুন্দর সঙ্গ।
সর্বোপরি তিনি ছিলেন সবার বন্ধু। একজন বিস্ময়কর মানুষ হিসেবে ছিলেন সবার কাছে।
বিদেশের মতো নিজের দেশ ছাপ্‌পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশটিকেও ঘুরে দেখেছেন
তিনি। ১৯৮৪ সালে একবার পিরোজপুরে গিয়েছিলেন। কালো পিচঢালা রাস্তা; ছিমছাম
পরিষ্কার ছোট্ট জেলা শহরকে ভালো লেগেছিল তার।

বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে ২০১৯ সালের ২০ মে সকাল ৬টায় রাজধানীর ইউনাইটেড
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ৮৩ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তিনি কখনো ক্লান্তিকে বিশ্বাস করেন নি। অক্লান্তভাবে কাজ করে গেছেন। মেধা ও
মননশীলতায় ছিলেন প্রবাদতুল্য। তাই কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতে হয়,

‘ এনেছিলে সাথে করে মৃতু্যহীণ প্রান

মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।’

Facebook Comments Box
✎ মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Posted ০১:০৫ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com