মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ৬ বার পঠিত
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে বীমা খাতের ভূমিকা প্রণিধানযোগ্য। অথচ স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দেশের অর্থনীতি যেভাবে এগিয়েছে বীমা শিল্পের অগ্রগতি সেভাবে লক্ষণীয় নয়। নীতিহীন ব্যবস্থাপনা, তদারকির ঘাটতি, তথ্য গোপনের সংস্কৃতি এবং গ্রাহক হয়রানির কারণে এই খাতটি এক গভীর আস্থার সংকটে নিমজ্জিত। পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও প্রাপ্য দাবি আদায়ের জন্য গ্রাহকদের বছরের পর বছর বীমা অফিসের দ্বারে দ্বারে ঘুরে জুতো ক্ষয় করা ছিল যেন এক অবধারিত নিয়ম। বীমা খাতের এই স্থবিরতা ও অনিয়মের অচলায়তন ভেঙে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। ঠিক এমন একটি সন্ধিক্ষণে, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিশেষজ্ঞ মীর নাদিয়া নিভিন যখন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন থেকেই গোটা সেক্টরে এক নতুন আশার আলো ও সুবাতাস বইতে শুরু করেছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মীর নাদিয়া নিভিন কেবল রুটিন কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করতে বেশ কিছু দৃশ্যমান, কঠোর এবং সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ও অনিষ্পন্ন বীমা দাবি পরিশোধের মাধ্যমে গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অনাস্থা দূর করার এক বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে আইডিআরএ। সংস্থাটির এই প্রশংসনীয় পদক্ষেপে ইতোমধ্যে তিনটি সুনির্দিষ্ট ধাপে ৭টি জীবন বীমা কোম্পানির সর্বমোট ১৬,০৫৮ জন ক্ষতিগ্রস্ত পলিসিধারীর অনুকূলে ৬৩ কোটি ৯১ লাখ ৩৯ হাজার ৬৪৭ টাকার বকেয়া বীমা দাবি সফলভাবে পরিশোধ করা হয়েছে। আর্থিক অনিয়মের এই দুর্দিনেও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের হাতে তাদের প্রাপ্য অর্থ পৌঁছে দেওয়ার এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য।
কেবল বকেয়া পরিশোধই নয়, বীমা খাতের মৌলিক সংস্কার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি রোধে আইডিআরএ যেসব নীতিগত ও কাঠামোগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা এই শিল্পকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে। অতীতে বহু জীবন বীমা কোম্পানি মেয়াদোত্তীর্ণ দাবি, মৃত্যুদাবি কিংবা প্রত্যর্পণ সুবিধার অর্থ পরিশোধের সময় বীমাগ্রহীতাদের সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে একই কোম্পানির নতুন পলিসি কিনতে বাধ্য করত। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রাপ্য পাওনা থেকে নতুন পলিসির প্রিমিয়াম জোরপূর্বক কেটে বা সমন্বয় করে বাকি টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হতো, যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও হয়রানিমূলক। আইডিআরএ কঠোর সার্কুলারের মাধ্যমে এই অপসংস্কৃতি চিরতরে নিষিদ্ধ করেছে। নতুন নির্দেশনায় স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে যে, বীমা দাবির সম্পূর্ণ অর্থ কোনো ধরনের শর্ত বা প্রিমিয়াম সমন্বয় ব্যতিরেকে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে এককালীনভাবে বীমাগ্রহীতা বা নমিনির ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করতে হবে। শুধু তাই নয়, দাবি পরিশোধে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে সময়সীমা লঙ্ঘনের মাত্রা অনুযায়ী পরবর্তী ৩০ দিন থেকে ১৮০ দিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের নামে নতুন পলিসি ইস্যু করার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার বিধান রেখে আইডিআরএ কোম্পানিগুলোকে চূড়ান্ত বার্তা দিয়েছে।
বীমা খাতের অন্যতম বড় একটি ব্যধি হলো তথ্যের অস্বচ্ছতা এবং সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানের চরম সংকট। বর্তমান চেয়ারম্যান স্পষ্টভাবে অভিযোগ করেছেন যে, অনেক কোম্পানি নিজেদের আর্থিক ক্ষতি ও প্রকৃত চিত্র আড়াল করতে একাধিক বা গোপন ‘ডাবল সার্ভার’ ব্যবহার করে আসছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে এ ধরনের গোপন সার্ভার পরিচালনার সংস্কৃতি বীমা খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্তরায়। এর প্রতিকারে আইডিআরএ থেকে সব গোপন বা অতিরিক্ত সার্ভার সরিয়ে আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যে সমস্ত তথ্য একীভূত করার কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দেশনা মানা না হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সংস্থাটির প্রধান।
ডিজিটাল রূপান্তর এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার এই ধারাবাহিকতায় আইডিআরএ আগামী ৩ থেকে ৪ মাসের মধ্যে ব্যাংক হিসাব নম্বরের মতো পুরো খাতের জন্য একটি অভিন্ন ‘ইউনিক পলিসি আইডি’ চালুর কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে কোনো বীমা কোম্পানি আর গ্রাহকের তথ্য বা ব্যবসার প্রকৃত পরিমাণ গোপন করতে পারবে না। পাশাপাশি, নন-লাইফ বীমা খাতের ব্যবসায় শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খোলার আগে আইডিআরএ প্রদত্ত ইউনিক কভার নোট ডিজিটালভাবে যাচাই করার নতুন ব্যবস্থা চালুরও যুগান্তকারী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ভুয়া প্রিমিয়াম দেখানো কিংবা কভার নোট জালিয়াতির পথ চিরতরে বন্ধ হবে বলে আশা করা যায়।
তদারকি ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রথম হিসেবে আইডিআরএ চালু করতে যাচ্ছে পুরোপুরি ‘ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা’। এর মাধ্যমে কোনো কোম্পানির তথ্যের ঘাটতি বা সম্ভাব্য আর্থিক ঝুঁকি অনেক দ্রুত ও নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এছাড়া, তথ্য গোপনের এই পথ বন্ধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে যৌথ ও সমন্বিতভাবে কাজ করার যে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা পুরো আর্থিক খাতের নিয়ামক হিসেবে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে।
স্বল্প জনবল (মাত্র ১৫০ জন কর্মী দিয়ে ৮২টি কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ) এবং ২০১০ সালের পুরনো আইনের মতো নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আইডিআরএ চেয়ারম্যানের দৃঢ় নেতৃত্ব ও আপসহীন মনোভাব প্রমাণ করে যে, সদিচ্ছা থাকলে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতেও সুশাসন ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ঘুষ বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
পরিশেষে বলা যায়, মীর নাদিয়া নিভিনের নেতৃত্বে আইডিআরএ যেভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং গ্রাহক অধিকার সুরক্ষায় একরৈখিক ও কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তা দেশের অর্থনীতিতে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। তবে এই উদ্যোগগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন কেবল আইডিআরএর একার নয়, বরং বীমা কোম্পানিগুলোর মালিক, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের আন্তরিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর করছে। আইডিআরএ’র এই সংস্কারের ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা স্তম্ভ বীমা খাত জনআস্থার প্রতীকে পরিণত হওয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র।
লেখক : সম্পাদক, দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি
Posted ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com
✎ মন্তব্য করুন