নিজস্ব প্রতিবেদক
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ৭২ বার পঠিত
বীমা কোম্পানিতে যোগ্য ও পেশাদার প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) নিয়োগ নিয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) জারি করা নির্দেশনা অপরিবর্তিত রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হলে বীমা খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অংশীজনরা।
মঙ্গলবার আইডিআরএর নির্দেশনা বাস্তবায়নের বাস্তবতা নিয়ে বিআইএর লাইফ ও নন-লাইফ টেকনিক্যাল সাব-কমিটির সভায় এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা।
সভায় অংশ নেয়া কমিটির একাধিক সদস্য ব্যাংক বীমা অর্থনীতির সঙ্গে আলাপে জানান, সভায় কমিটির সদস্যরা বলেছেন, আইডিআরএর সার্কুলারে বিদেশি ডিগ্রিধারীদের নিয়োগের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হলেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি অর্জন করে দীর্ঘদিন ধরে বীমা খাতে সিএফও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে অভিজ্ঞ বিদ্যমান সিএফওদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
অংশীজনদের মতে, আইডিআরএর নির্দেশনা অনুযায়ী সিএফও নিয়োগ দিতে গেলে কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়বে। বিশেষ করে আইসিএবি বা আইসিএমএবি ফেলো বা অ্যাসোসিয়েটদের নিয়োগের ক্ষেত্রে উচ্চ বেতন দিতে হলে অধিকাংশ বীমা কোম্পানিকে আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠানের বেতনকাঠামোয় অসামঞ্জস্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
সভায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা বলেন, অনেক কোম্পানিতে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) বেতনের তুলনায় নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সিএফওর বেতন বেশি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও বেতনকাঠামোয় ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে।
তাঁদের মতে, বীমা খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা সাধারণ হিসাবরক্ষণ কার্যক্রমের চেয়ে জটিল। এ খাতে কাজ করতে হলে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি থাকলেই হবে না, প্রয়োজন দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কারিগরি জ্ঞান। বিশেষ করে ১৫ থেকে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা ছাড়া বীমা কোম্পানির আর্থিক ব্যবস্থাপনার জটিল বিষয়গুলো যথাযথভাবে বোঝা কঠিন। কিন্তু আইডিআরএর নির্দেশনায় এ ধরনের অভিজ্ঞতার শর্ত স্পষ্ট করা হয়নি বলে সভায় উদ্বেগ জানানো হয়।
অংশীজনেরা আরও বলেন, নির্ধারিত স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সিএফও পাওয়া কঠিন হতে পারে। নতুন ডিগ্রিধারীদের বীমা খাতের কারিগরি বিষয়গুলো বুঝে দায়িত্ব পালনে সময় লাগবে। এতে কোম্পানিগুলোর দৈনন্দিন কার্যক্রম ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিঘ্ন ঘটতে পারে।
সভায় আইডিআরএর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। অংশীজনেরা বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারির আগে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়নি।
সভায় কমিটির পক্ষ থেকে আইডিআরএর নির্ধারিত সময়সীমা পুনর্বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে একবারে নির্দেশনা বাস্তবায়নের পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে তা কার্যকর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে বিদ্যমান অভিজ্ঞ জনবলকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করেন অংশীজনেরা।
গত ২৮ অক্টোবর বীমা কোম্পানিতে প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) নিয়োগে পেশাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করে নতুন নির্দেশনা জারি করে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। সার্কুলারে বীমা কোম্পানিগুলোর সিএফও নিয়োগে নির্দিষ্ট শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করে আইডিআরএ। নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্ধারিত যোগ্যতা নেই এমন বিদ্যমান সিএফওদের পরিবর্তে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে। নতুন সিএফও নিয়োগের আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনও নিতে হবে।
এ নির্দেশনার বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে মঙ্গলবার বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) লাইফ ও নন-লাইফ টেকনিক্যাল সাব-কমিটির সভায় আলোচনা হয়। সভায় অংশীজনেরা বলেন, আর্থিক সুশাসন নিশ্চিত করতে পেশাদার সিএফও নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে দেশের বীমা কোম্পানিগুলোর বাস্তবতা, বিদ্যমান জনবল এবং আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা না করে অভিন্ন যোগ্যতার শর্ত আরোপ করা হলে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।
সভায় কমিটির সদস্যরা বলেন, দেশের অনেক বীমা কোম্পানিতে দীর্ঘ ১০ থেকে ২০ বছর ধরে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা সিএফও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের অনেকের প্রয়োজনীয় পেশাগত সনদ না থাকলেও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা রয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁদের বাদ দিতে হলে বীমা খাতের অভিজ্ঞ জনবল হারানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা অন্যান্য দায়ের মুখেও পড়তে হতে পারে।
অংশীজনদের মতে, বীমা খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা সাধারণ হিসাবরক্ষণ বা আর্থিক বিবরণী তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা, সলভেন্সি, প্রিমিয়াম ও দাবি ব্যবস্থাপনা, বাজেট, কর, নিরীক্ষা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রক পরিপালনের মতো বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। ফলে শুধু পেশাগত সনদকে যোগ্যতার প্রধান মানদণ্ড না করে সংশ্লিষ্ট খাতে অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতাকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
যোগ্য জনবল পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন:
আইডিআরএর সার্কুলারে একাধিক দেশি-বিদেশি পেশাগত সনদের উল্লেখ থাকলেও এসব যোগ্যতাধারী ব্যক্তির মধ্যে কতজন বাংলাদেশের বীমা খাতে কাজ করতে আগ্রহী, কতজনের বীমা খাতে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং কতজন সিএফও হিসেবে দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত-সে বিষয়ে কোনো জনবল-প্রাপ্যতা সমীক্ষার তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
অংশীজনদের প্রশ্ন, নির্ধারিত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পর্যাপ্ত জনবল দেশে পাওয়া যাবে কি না। কারণ, বীমা ব্যবসার জটিল আর্থিক কার্যক্রম বুঝতে শুধু সনদ যথেষ্ট নয়; দীর্ঘদিনের পেশাগত অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন। তাঁদের মতে, নতুন পেশাগত সনদধারীদের মধ্যে বীমা খাতের বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকলে দায়িত্ব পালনে সমস্যা হতে পারে।
নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়নে বীমা কোম্পানিগুলোর সম্ভাব্য নিয়োগ ব্যয়ও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রার্থী সীমিত হলে তাঁদের নিয়োগে কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। এতে বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার প্রত্যাশাও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আকারের বীমা কোম্পানিগুলোর পক্ষে উচ্চ বেতনে সিএফও নিয়োগ আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে যোগ্য প্রার্থীর বেতন ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) পারিশ্রমিকের কাছাকাছি, এমনকি তার চেয়েও বেশি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তাঁদের প্রশ্ন, আর্থিক সুশাসন নিশ্চিত করতে গিয়ে সিএফও নিয়োগ ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে কি না, যা কোম্পানির সামগ্রিক ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও মুনাফার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। এ সম্ভাব্য ব্যয় মূল্যায়ন না করে সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একই যোগ্যতার শর্ত আরোপ কতটা যৌক্তিক, তা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সব কোম্পানির জন্য একই মানদণ্ড কতটা যৌক্তিক:
দেশের সব বীমা কোম্পানির ব্যবসার পরিধি, প্রিমিয়াম আয়, সম্পদ, কর্মীসংখ্যা, বিনিয়োগ এবং আর্থিক ঝুঁকি এক রকম নয়। বড় ও জটিল ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সিএফওর যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার চাহিদার সঙ্গে ছোট প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনের পার্থক্য থাকতে পারে।
বিআইএর টেকনিক্যাল কমিটির সদস্যরা মনে করেন, আইডিআরএর নির্দেশনায় দেশে ডিগ্রি অর্জন করে দীর্ঘদিন ধরে বীমা খাতে দায়িত্ব পালন করা পেশাজীবীদের বিষয়ে যথেষ্ট বিবেচনা করা হয়নি। পাশাপাশি নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশি পেশাগত যোগ্যতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও বিদ্যমান অভিজ্ঞ জনবলকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন।
তাঁদের আরও বক্তব্য, আইডিআরএর নির্ধারিত সময়সীমা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব কোম্পানিতে যোগ্য সিএফও নিয়োগ সম্পন্ন করা কঠিন হতে পারে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা এবং বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন ছিল।
কমিটির মতে, নির্দেশনার বাস্তবায়ন সময়সীমা পুনর্বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে তা কার্যকর করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যমান সিএফওদের অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের সুযোগ রাখা এবং বিকল্প যোগ্যতার স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, নতুন সিএফও নিয়োগের আগে প্রার্থীর বিস্তারিত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার তথ্য দিয়ে আইডিআরএর পূর্বানুমোদন নিতে হবে। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার পরই নিয়োগ কার্যকর হবে।
বিদ্যমান সিএফওদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতা থাকলে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে তাঁদের বিস্তারিত যোগ্যতার তথ্যসহ অনুমোদনের জন্য আইডিআরএর কাছে আবেদন করতে হবে। আর যেসব কোম্পানির বর্তমান সিএফও নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেন না, সেসব কোম্পানিকে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ সম্পন্ন করতে হবে।
আইডিআরএ সার্কুলারে বীমা খাতের আর্থিক সুশাসন নিশ্চিত করতে পেশাদার সিএফও নিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে। তবে এ নির্দেশনার বাস্তবায়ন নিয়ে খাতসংশ্লিষ্টদের আপত্তি ও উদ্বেগ এখন নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আর্থিক সুশাসনের লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি অভিজ্ঞ জনবল ধরে রাখা, কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা এবং বাস্তবসম্মত সময়সীমার মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন বড় প্রশ্ন।
Posted ০৯:২৪ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com
✎ মন্তব্য করুন