|

Advertisement
×

স্মৃতিতে অম্লান আধুনিক বীমার রূপকার ও বিজিআইসি’র স্বপ্নদ্রষ্টা এম. এ. সামাদ

বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬   প্রিন্ট   ২০ বার পঠিত

স্মৃতিতে অম্লান আধুনিক বীমার রূপকার ও বিজিআইসি’র স্বপ্নদ্রষ্টা এম. এ. সামাদ

কলকাতার নামকরা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে স্নাতক সম্পন্ন করার পর, জনাব এম. এ. সামাদ অল ইন্ডিয়া রেডিও, দিল্লিতে বাংলা সংবাদের সম্পাদক ও কথক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। সে সময় বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক নীরদ সি. চৌধুরী ছিলেন তাঁর শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক। ভারত বিভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং পুরান ঢাকার নাজিরা রোডে অবস্থিত ‘রেডিও পাকিস্তান’-এ বাংলা সংবাদ সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। তবে বাংলা ভাষাকে জোরপূর্বক ‘উর্দুভাবাপন্ন’ করার জন্য শীর্ষস্থানীয় কর্তৃপক্ষের অব্যাহত চাপের মুখে, একপর্যায়ে জনাব সামাদ সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেন যে, সন্ধ্যায় যে খবরটি জনাব ফতেহ লোহানী পড়তে যাচ্ছেন, তা ইচ্ছাকৃতভাবেই উর্দুায়িত বাংলা শব্দ দিয়ে সম্পাদনা করা হয়েছে। বলাই বাহুল্য, সংবাদের পর হলের শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং বাংলা ভাষাকে উর্দুায়িত করার সেই আদেশ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। ভাষা আন্দোলনের একুশে ফেব্রুয়ারির প্রেক্ষাপট তৈরিতে এই আন্দোলন ছিল এক অবিস্মরণীয় পূর্বসূরি। তবে এর জেরে জনাব সামাদকে রেডিও পাকিস্তান থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।

এরই ধারাবাহিকতায়, ১৯৪৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে জনাব সামাদ ও তাঁর সহধর্মিণী ফওজিয়া বেগম শিশুদের জন্য সেকালের প্রথম বাংলা পত্রিকা ‘মিনার’ প্রকাশ করেন। অসংখ্য প্রথিতযশা এবং ভবিষ্যতে দেশজোড়া খ্যাতি অর্জনকারী গুণী ব্যক্তিদের লেখা ও গল্পে সমৃদ্ধ হয়ে পত্রিকাটি অভাবনীয় সাফল্য লাভ করে। পত্রিকার লেখকদের তালিকায় ছিলেন— ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. কুদরাত-এ-খুদা, শ্রী অন্নদা শঙ্কর রায়, ড. সৈয়দ মুজতবা আলী, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ, কবি জসীমউদ্দীন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, কবি কাদের নেওয়াজ, সৈয়দ আলী আহসান, শওকত ওসমান, সৈয়দ আবদুস সুলতান, এম. এ. আজম, বেগম সুফিয়া কামাল, কবি আহসান হাবীব, মুহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, মুহাম্মদ মুদাব্বির, কামরুল হাসান, ড. আবদুল্লাহ আল-মুতি শরফুদ্দিন, হাবিবুর রহমান, ফতেহ লোহানী, আবদুল আহাদ, নাজির আহমেদ, রোকনুজ্জামান খান (দাদা ভাই), আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, এস. এম. আলী, এ. এস. মাহমুদ, মাহবুব আনাম, জিয়াউল হক (্টুলু), ড. মোস্তফা নুরুল ইসলাম, ড. আশরাফ সিদ্দিকী, এনায়েত উল্লাহ খান, নুরুল হুসাইন খান, এনাম আহমেদ চৌধুরী, ফারুক চৌধুরী, রাবেয়া খাতুন, দিলারা হাশেম, সালমা চৌধুরী, মুহাম্মদ আবদুল হক, লে. কর্নেল ড. এ. রহমান এবং মোফাজ্জল হোসেনের মতো জ্ঞানতাপস ও দিকপাল ব্যক্তিবর্গ। শিশুদের কল্যাণে এসব ক্ষণজন্মা মনীষী যে লেখনী রেখে গেছেন, তা প্রতিটি প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য রত্ন—যে রত্ন আমাদের ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে এবং আজও ‘মিনার’-এর পাতায় চিরঞ্জীব হয়ে আছে।

তবে নিয়তির অন্য কোনো পরিকল্পনা ছিল। তাঁর কর্মজীবন যেন অন্য এক দিগন্তের অপেক্ষায় ছিল। ১৯৫১ সাল থেকে বীমা জগতে এম. এ সামাদ এর দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শুরু হয়। প্রুডেন্সিয়াল অ্যাসুরেন্স কোম্পানি থেকে শুরু করে সেন্ট্রাল, গ্রেট ইস্টার্ন এবং ফেডারেল লাইফ কোম্পানিতে সাফল্যের সাথে কাজ করে তিনি বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রাক্কাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলোতে ধানমন্ডির ৪ নম্বর সড়কে অবস্থিত জনাব সামাদের বাসভবনটি ছিল ১৯৭১ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে আসা প্রথম অস্ত্র চালানের নিরাপদ ভাণ্ডার; আর বহু বীর মুক্তিযোদ্ধার গোপন বৈঠক ও অভয়ারণ্য।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর, জনাব সামাদ সদ্য স্বাধীন দেশের জাতীয়করণকৃত জীবন বীমা শিল্প পুনর্গঠনে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি সুরমা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং পরবর্তীতে জীবন বীমা কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৮৪ সালে সেখান থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

অবসরের পর তিনি নীরবে নিভৃতে বসে থাকেননি; বরং দেশে বেসরকারি খাতে বীমা চালুর পক্ষে তীব্র দাবি ও জোরালো জনমত গড়ে তোলেন। তাঁর সেই প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ ১৯৮৪ সালে বেসরকারি খাতে বীমা চালুর অনুমোদন মেলে এবং ১৯৮৫ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিজিআইসি প্রতিষ্ঠিত হয়। বাকি ইতিহাস সবারই জানা—এভাবেই জন্ম নেয় দেশের বেসরকারি বীমা শিল্প। জন্ম নেয় বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি পারিবারিক বলয় ‘বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন’, যার চেয়ারম্যান হিসেবে ১৯৯৯ সালে দায়িত্ব পালন করেন এম. এ. সামাদ।

একজন সফল বীমাকর্মী ও সংগঠক হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন এক প্রথিতযশা বীমা গবেষক। বীমার ওপর তিনি চারটি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা বীমা জগতে অত্যন্ত মূল্যবান পাঠ্যপুস্তক হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর লেখা ছোটগল্পের বই ‘শনিবারের ছুটি’ ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের লাইফ ইন্স্যুরেন্স মার্কেটিং অ্যান্ড রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন তাঁর একটি বই সম্পর্কে লিখেছিল: “লিম্রা পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা সত্যিই অভিভূত যে, একজন মাত্র ব্যক্তি জীবন বীমা বিক্রয়ের সমগ্র ক্ষেত্রটিকে ঘিরে এমন একটি সুবিন্যস্ত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ গ্রন্থ রচনা করার মতো এক বিশাল ও কঠিন দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছেন। এই বইটিতে আপনি যে নিষ্ঠা ও গভীর জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন, তা সম্পাদনা করার দুঃসাহস দেখালে আমরা নিজেদের দক্ষতার গণ্ডি অতিক্রম করে ফেলব বলে মনে হয়।”

জনাব এম. এ. সামাদ আজ আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তিনি অমর হয়ে আছেন দেশের সকল বীমা পেশাজীবীর হৃদয়ে। বীমা শিল্পে তাঁর অসামান্য ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’ তাঁকে মরণোত্তর জীবনসাফল্য পুরস্কারে ভূষিত করে। বীমা শিল্প নিয়ে তাঁর দূরদর্শী ভাবনা ও মিশনকে তাঁরই ভাষায় সংক্ষেপে এভাবে ফুটিয়ে তোলা বলা যায়:

“ভবিষ্যতের নানা ঝুঁকি থেকে জীবন ও সম্পত্তির বহুকাক্সিক্ষত আর্থিক নিরাপত্তা বিধানের ঐতিহ্যগত ভূমিকার বাইরেও বীমা—বিশেষ করে জীবন বীমা—হলো বিক্ষিপ্ত ও ক্ষুদ্র সঞ্চয়গুলোকে সুসংহত করে আমাদের জাতীয় উন্নয়নমূলক প্রচেষ্টায় তা সফলভাবে যুক্ত করার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।”

Facebook Comments Box
✎ মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Posted ০৫:২৭ অপরাহ্ণ | বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com