কামারুন-নাহার
বুধবার, ১০ জুন ২০২৬ প্রিন্ট ১৩ বার পঠিত
আজ ১০ জুন, দেশের বীমা শিল্পের পথিকৃৎ মুস্তাফিজুর রহমান খানের জন্মবার্ষিকী। ১৯১০ সালের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শ্রম, নিষ্ঠা এবং সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা বীমা শিল্পের বিকাশে যারা অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে মুস্তাফিজুর রহমান খান ছিলেন অন্যতম। দীর্ঘ সময় যুক্ত ছিলেন জীবন বীমা শিল্পের সাথে। তিনি বীমা পেশাকে সম্মানজনক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন।
মুস্তাফিজুর রহমান খানের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় মাদ্রাসায়। মাদ্রাসা শিক্ষা শেষে তিনি ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হন। ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন উনিশ বছর বয়সে। মেধা তালিকায় তিনি অষ্টম স্থান পেয়েছিলেন। ছাত্রাবস্থায় কৈশোর ও প্রথম যৌবনে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত হন এবং অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা পালন করেন। কয়েক বার পুলিশের হাতেও ধরা পড়ে লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। মাস্টারদা সূর্য সেনের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন দলে তিনিও ছিলেন একজন সক্রিয় কর্মী। পুলিশের গুলিতে হয়েছেন আহত, করেছেন কারবরণ। এক সময় ব্রতচারী আন্দোলনেও অংশ নেন। পরবর্তী সময়ে রাজনীতি থেকে সরে এলেও উপমহাদেশের বহু প্রখ্যাত রাজনীতিবিদের সাথে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি যখন গ্রাজুয়েশন করেন, তখন তিনি চাকুরিরত, সংসারী এবং তিন সন্তানের জনক।
মুস্তফিজুর রহমান খান দীর্ঘ ষাট বছরেরও বেশি সময়ব্যাপী বীমা পেশার সাথে যুক্ত থেকে কত শত মানুষের যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সেবা করে গেছেন তার হিসাব করা কষ্টসাধ্য। এশিয়াটিক সোসাইটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, বাংলা একাডেমীর আজীবন সদস্য, ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্ট ও সিনেট সদস্য হিসেবে আজীবন ঐ সব প্রতিষ্ঠানের সেবা করে গেছেন।
তার কর্মজীবনের দিকে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যায় তিনি ছিলেন একজন ‘সেলফ মেড’ মহান ব্যক্তিত্ব। যার বক্তব্য ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু সুস্পষ্ট।
জীবনের শুরুতে কলকাতার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন। ১৯৩২ সালে পরিবারের আর্থিক প্রয়োজনে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে একটি সাধারণ পদে যোগ দান করেন। এটাই তার প্রথম চাকরি। এরপরেই শুরু হলো জীবনের নতুন একটি অধ্যায়। ১৯৩৭ সালে সালেহা খানমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সংসারের সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের প্রয়োজনে তাকে যুগপৎ দু’তিনটি চাকরিতে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হতো। বিবাহিত ও চাকরি জীবনের ভার বহন করতে গিয়ে তিনি রাজনীতির পথ থেকে বিচ্যুত হননি। বরং ইন্স্যুরেন্সের চাকরি তাকে রাজনীতির সাথে যোগাযোগ রাখার পথ সহজ করে দেয়। কিন্তু তার অবচেতন মনে ছিল অধিকতর বিদ্যার্জনের সুপ্ত আকাক্সক্ষা। তার মনোবল এতোটাই প্রবল ছিল যে সংসার আর চাকরির বোঝা সহজভাবে ঘাড়ে নিয়ে আরো শিক্ষালাভের পথে এগিয়ে গেছেন। তার শিক্ষাজীবনের সূচনা ও সমাপ্তি সরলরৈখিক ছিলনা। চরম প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে ১৯৪৩ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি কম ডিগ্রী লাভ করেন। আর এ সাফল্য একমাত্র সংকল্পের দৃঢ়তার কারণে।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সাথে সাথে ইস্টার্ন ফেডারেল ইউনিয়ন ইন্সুরেন্স কোম্পানির রেজিস্টার্ড অফিস কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত হয়; তিনিও চট্টগ্রামে বদলী হন। ১৯৬১ সালে তিনি পাকিস্তান ইন্স্যুরেন্স করপোরেশনে যোগদান করেন এবং ঢাকায় পদস্থ হন। পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানে কো-অপারেটিভ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর পদে নিযুক্ত হন। ১৯৪৭ হতে ১৯৭০ সালের শেষ দশকে প্রথম বীমা প্রজন্মের হাত ধরে যারা দ্বিতীয় প্রজন্মের বীমাবিদ হিসেবে জীবনবীমায় তৈরি হয়েছেন; তাদের উত্তরসূরি ও অত্যন্ত কাছের জন হয়ে সময় ও সুযোগকে আপন মেধায় কাজে লাগিয়েছেন – তাদেরই একজন মুস্তাফিজুর রহমান খান। ১৯৭২ সালের প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার নং ৯৫ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত কর্ণফুলী বীমা কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হয়ে বীমার জগতে অনেক উন্নতি সাধন করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে বীমার জগতে তার অবদান অনবদ্য। দেশের উন্নতির জন্য বীমাকে বিভিন্ন রূপদানের চিন্তাভাবনা করেছিলেন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থা কর্ণফুলী সাধারণ বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে অবসর নেয়ার পরেও তিনি বসে থাকেননি। বিভিন্ন বীমা কোম্পানিতে কাজ করেছেন এবং মূল্যবান অভিজ্ঞতায় বীমাশিল্পকে সমৃদ্ধশালী করেছেন। এরপরেও ব্যাংক ও বীমা প্রভৃতি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিরোধে একক সালিশ রূপে কাজ করেন ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত। ১৯৮৭ সালে তিনি বাংলাদেশ সাধারণ বীমা কোম্পানিতে প্রধান উপদেষ্টা পদে অধিষ্ঠিত হন।
১৯৮৫ সালে ব্যক্তিমালিকানায় বীমা ব্যবসা পরিচালনার ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর দেশের সর্বপ্রথম সাধারণ বীমা কোম্পানি ‘বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের’ প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে যোগদান করেন। মূলত তার পরিকল্পনা এবং পরামর্শেই বিজিআইসি আজকের অবস্থানে উন্নীত হয়েছে। আমৃত্যু তিনি সেখানেই কর্মরত ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি চিরদিন ছিলেন প্রচার বিমুখ। কর্মেই ছিল তার আনন্দ; প্রচারে নয়। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে তিনিই অন্যতম প্রবীণ বীমাবিদ। শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ বীমা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব; আগাগোড়া সৎ। তাঁর চরিত্রের সবচাইতে উজ্জ্বল দিক হলো আর্থিক সততা। বাংলাদেশে জীবনবীমা পেশার দক্ষ সংগঠক এবং উদ্ভাবনময় পরিকল্পনাকারী হিসেবে তিনি ছিলেন প্রবাদ প্রতিম এবং অনুসরণযোগ্য পথিকৃৎ। প্রকৃতপক্ষে বীমা পেশায় কাজ করার জন্য তার পিতাই তাকে উৎসাহিত করেছিলেন।
১৯৮৭ সালের এপ্রিলে তাঁর স্ত্রী-বিয়োগ ঘটে। বিপত্নীক মুস্তাফিজুর রহমান খান ১৯৯৬ সালের ৭ জানুয়ারী ইহলোক ত্যাগ করেন। এক বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান হয়।
Posted ১০:২২ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com