|

Advertisement
×

শাখা সম্প্রসারণে এগিয়ে শীর্ষ ১০ বেসরকারি ব্যাংক

মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬   প্রিন্ট   ৭ বার পঠিত

শাখা সম্প্রসারণে এগিয়ে শীর্ষ ১০ বেসরকারি ব্যাংক

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ডিজিটাল সেবার দ্রুত বিস্তার ঘটলেও গ্রাহকের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে শাখা সম্প্রসারণের প্রতিযোগিতা থেমে নেই। বেসরকারি ব্যাংকগুলো নতুন শাখা, উপশাখা এবং বিকল্প সেবা কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও নিজেদের উপস্থিতি শক্তিশালী করছে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১,৪১৩টি শাখা নিয়ে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় শাখা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি। দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী অবস্থানে থাকা অন্যান্য বেসরকারি ব্যাংককে ছাড়িয়ে ব্যাংকটি এখন শাখা সংখ্যায় শীর্ষে অবস্থান করছে। ব্যাংকটির এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা ও গুরুত্বপূর্ণ উপজেলায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

শাখা সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পুবালী ব্যাংক পিএলসি। বর্তমানে ব্যাংকটির শাখা সংখ্যা ৮০০। দেশের অন্যতম পুরোনো বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে পুবালী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং সেবা দিয়ে আসছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ব্যাংকটির উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।

তৃতীয় স্থানে রয়েছে এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি। তুলনামূলকভাবে নতুন প্রজন্মের ব্যাংক হলেও দ্রুত সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্যাংকটি বর্তমানে ৬০৫টি শাখা পরিচালনা করছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবার পাশাপাশি গ্রাহকসেবা সহজলভ্য করতে প্রতিষ্ঠানটি সারাদেশে কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে।

চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসি, যার শাখা সংখ্যা ৫৭৬। এটিএম নেটওয়ার্ক, উপশাখা, মোবাইল ব্যাংকিং এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার জন্য পরিচিত এই ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের অগ্রদূত হলেও শাখা সম্প্রসারণেও ধারাবাহিক বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।

৪৩৬টি শাখা নিয়ে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। ইসলামী ব্যাংকিং সেবার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে ব্যাংকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর পরেই রয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) পিএলসি, যার শাখা সংখ্যা ৪১৮। করপোরেট ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি খুচরা ব্যাংকিং সেবাও সম্প্রসারণ করছে ব্যাংকটি।

তালিকার ৭ম অবস্থানে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, যার শাখা সংখ্যা ৪০০। দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যাংকটি দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের আস্থা ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে আধুনিক ব্যাংকিং সেবা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দিচ্ছে।

৩৮৪টি শাখা নিয়ে তালিকার ৮ম স্থানে রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সেবার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থায়নের মাধ্যমে ব্যাংকটি নিজেদের কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে। প্রায় ৩০০ শাখা নিয়ে তালিকার ৯ম স্থানে রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক এবং দুই শতাধিক শাখা নিয়ে তালিকার ১০ম স্থানে রয়েছে আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক।

ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, শাখা সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি ব্যাংকের ব্যবসায়িক সক্ষমতা, গ্রাহকভিত্তি, সেবা বিস্তার এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। যদিও বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং এজেন্ট ব্যাংকিং দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তবুও দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী এখনো সরাসরি শাখা থেকে ব্যাংকিং সেবা নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চল, উপজেলা সদর এবং নতুন অর্থনৈতিক এলাকায় শাখা স্থাপনের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো নতুন আমানত সংগ্রহ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদান এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে শাখা সম্প্রসারণকে এখনো ব্যবসা বৃদ্ধির একটি কার্যকর কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বিকাশ শাখার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেয়নি; বরং শাখার ভূমিকার ধরন পরিবর্তন করেছে। এখন একটি শাখা শুধু লেনদেনের কেন্দ্র নয়, বরং আর্থিক পরামর্শ, বিনিয়োগ সেবা, এসএমই অর্থায়ন, কৃষিঋণ এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সহায়তার কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যাংকগুলোকে শহরের পাশাপাশি গ্রামীণ ও অনুন্নত এলাকায় সেবা সম্প্রসারণে উৎসাহিত করছে। এর ফলে কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আসছেন। এতে দেশের সঞ্চয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, কেবল শাখার সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। প্রতিটি শাখার কার্যকারিতা, সেবার মান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং লাভজনকতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ লোকসানি বা অকার্যকর শাখা দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের ব্যয় বাড়িয়ে দেয় এবং পরিচালন দক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে, ব্যাংকগুলো এখন শাখা, উপশাখা, এজেন্ট ব্যাংকিং, এটিএম, সিডিএম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে সমন্বিত করে একটি বহুমাত্রিক সেবা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। এতে গ্রাহকরা প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু শাখার সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং কোন ব্যাংক সবচেয়ে দ্রুত, নিরাপদ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং গ্রাহকবান্ধব সেবা দিতে পারছে, সেটিই হবে সাফল্যের মূল সূচক। তবুও দেশের প্রতিটি অঞ্চলে দৃশ্যমান উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক আগামী দিনেও ব্যাংকগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে।

বর্তমান বাস্তবতায় বলা যায়, ডিজিটাল রূপান্তরের যুগেও শাখাভিত্তিক ব্যাংকিং তার গুরুত্ব হারায়নি। বরং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী শাখা নেটওয়ার্কের সমন্বয় ঘটিয়েই বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলো নতুন গ্রাহক অর্জন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

 

Facebook Comments Box

Posted ০৮:২৪ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com