|

Advertisement
×

ব্যাংকিং খাতে মুনাফার নতুন প্রতিযোগিতা, শীর্ষে ব্র্যাক ব্যাংক

রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৬   প্রিন্ট   ১৯ বার পঠিত

ব্যাংকিং খাতে মুনাফার নতুন প্রতিযোগিতা, শীর্ষে ব্র্যাক ব্যাংক

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মুনাফার চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। জানুয়ারি-জুন সময়ে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক উল্লেখযোগ্য হারে মুনাফা বাড়িয়েছে। এর মধ্যে সমন্বিত নিট মুনাফায় সবার ওপরে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকটি প্রথমার্ধে ১ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৭ শতাংশ বেশি।

ব্র্যাক ব্যাংকের এই ফলাফল শুধু পরিমাণের দিক থেকেই নয়, প্রবৃদ্ধির দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির সমন্বিত নিট মুনাফা ছিল ৯০৬ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ১ হাজার ৪২৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে অর্থাৎ এপ্রিল-জুন সময়ে ব্যাংকটির মুনাফা ৭৩ শতাংশ বেড়ে ৭২৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। প্রথম ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি আয়ও ১ টাকা ৩৪ পয়সা থেকে বেড়ে ৫ টাকা ৭ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।

ব্যাংকটির মুনাফা বৃদ্ধির পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে নিট সুদ আয় ও বিনিয়োগ আয় বৃদ্ধি। একই সঙ্গে আমানত ও সম্পদের প্রবৃদ্ধি এবং পরিচালন দক্ষতার উন্নতিও আয় বাড়াতে সহায়তা করেছে। জুন ২০২৬ শেষে ব্যাংকটির আমানত ৯৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এবং মোট সম্পদ ৭৬ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে আমানত বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ এবং সম্পদ বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ।

দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পুবালী ব্যাংক। প্রথমার্ধে ব্যাংকটির সমন্বিত নিট মুনাফা প্রায় ৬৮৫ কোটি টাকা এবং প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৯ শতাংশ। ব্যাংকটির ২০২৫ সালের আর্থিক ফলাফলেও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা দেখা গিয়েছিল। ওই বছর পুবালী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ব্যাংকটির আমানত বেড়ে ৮৯ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা এবং ঋণ ও অগ্রিম বেড়ে ৭১ হাজার ১৪০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

পুবালীর বর্তমান ফলাফল দেখাচ্ছে, শুধু বড় অঙ্কের মুনাফা নয়, ধারাবাহিক আয় ধরে রাখাও ব্যাংকগুলোর প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিনিয়োগ আয়, ঋণ কার্যক্রম, ফি-ভিত্তিক আয় এবং আমানত সংগ্রহ—এসব ক্ষেত্রে ভারসাম্য ব্যাংকটির মুনাফা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

তৃতীয় অবস্থানে থাকা সিটি ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জানুয়ারি-জুন সময়ে ব্যাংকটির সমন্বিত নিট মুনাফা ৫২৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৭৫ শতাংশ বেশি। শেয়ারপ্রতি আয় ১ টাকা ৭২ পয়সা থেকে বেড়ে ৩ টাকা ১ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকটির আয় বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ থেকে বেশি মুনাফা এবং কমিশন ও ফি-ভিত্তিক আয় বৃদ্ধির ভূমিকা ছিল।

সিটি ব্যাংকের পরিচালন নগদ প্রবাহেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। প্রথম ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ১৩ টাকা ৯৪ পয়সা থেকে বেড়ে ৪৪ টাকা ২০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ৩৫ টাকা ৩৭ পয়সা থেকে বেড়ে ৩৭ টাকা ৬০ পয়সায় উঠেছে। ২০২৫ সালেও ব্যাংকটি রেকর্ড বার্ষিক মুনাফা করেছিল।

এবারের ফলাফলে সবচেয়ে বড় চমক এসেছে ৪র্থ স্থানে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক থেকে। প্রথমার্ধে ব্যাংকটির মুনাফা প্রায় ৩১৯ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৪৪২ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধির হার বিবেচনায় এটি শীর্ষ সারির ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ১০৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছিল; ফলে তুলনামূলক নিম্ন ভিত্তির ওপর ২০২৬ সালে মুনাফার বড় উত্থান ঘটেছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেই ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মুনাফা ১৯৫ শতাংশ বেড়ে ২৬১ কোটি টাকায় উঠেছিল। ওই সময়ে বিনিয়োগ আয় ৪১ শতাংশ বাড়ায় মুনাফায় বড় ভূমিকা রাখে।

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ফলাফল তাই ব্যাংকিং খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতাও সামনে আনছে—সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে আয় এখন ব্যাংকগুলোর মুনাফার অন্যতম বড় উৎস। উচ্চ ট্রেজারি ফলনের সময়ে সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে ব্যাংকগুলো সুদ আয়ের বাইরে বাড়তি মুনাফা করছে। এর আগে ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বিনিয়োগ আয় ১২৭ শতাংশ বেড়েছিল এবং নিট সুদ আয় কমে গেলেও সরকারি সিকিউরিটিজনির্ভর বিনিয়োগ আয় মুনাফা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

শীর্ষ পাঁচে থাকা ইস্টার্ন ব্যাংকও প্রথমার্ধে শক্তিশালী ফলাফল করেছে। জানুয়ারি-জুন সময়ে ব্যাংকটির সমন্বিত নিট মুনাফা হয়েছে ৪৩৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি। ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি আয় ২ টাকা ১৪ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৬৭ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। ইস্টার্ন ব্যাংকের মুনাফা বৃদ্ধিতেও সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ, সুদবহির্ভূত আয় এবং পরিচালন দক্ষতার উন্নতি ভূমিকা রেখেছে।

এই পাঁচ ব্যাংকের প্রথমার্ধের সম্মিলিত মুনাফা প্রায় ৩ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ তালিকাভুক্ত ও বড় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে মুনাফার সক্ষমতায় একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর এগিয়ে থাকার প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে মুনাফা বৃদ্ধির উৎস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঋণ ব্যবসার পাশাপাশি সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ, সুদ আয়, ফি-ভিত্তিক আয় এবং পরিচালন দক্ষতা এখন ব্যাংকের আর্থিক ফলাফলের বড় চালিকাশক্তি।

তবে মুনাফার এই উল্লম্ফনকে পুরো ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ ব্যাংকের প্রকৃত সক্ষমতা বিচার করতে মুনাফার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ, মূলধন পর্যাপ্ততা, ঋণের প্রবৃদ্ধি, প্রভিশন সংরক্ষণ এবং নগদ প্রবাহের মতো সূচকও বিবেচনায় নিতে হয়। বিশেষ করে উচ্চ সুদহার ও সরকারি সিকিউরিটিজের আকর্ষণীয় ফলনের সময়ে বিনিয়োগ আয় বাড়লেও ঋণ চাহিদা দুর্বল থাকলে ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের ফলাফলও এই দ্বৈত চিত্র দেখিয়েছিল। ওই সময়ে প্রকাশিত ২৩টি তালিকাভুক্ত ব্যাংকের মধ্যে ১২টি ব্যাংক আগের বছরের তুলনায় মুনাফা বাড়াতে পেরেছিল, আবার কয়েকটি ব্যাংকের মুনাফা কমেছে বা লোকসান বেড়েছে। প্রথম প্রান্তিকে ব্র্যাক ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছিল।

ফলে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের মুনাফার তালিকা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের দ্বিমুখী বাস্তবতা তুলে ধরছে। একদিকে ব্র্যাক ব্যাংক, পুবালী, ডাচ্-বাংলা, সিটি ও ইস্টার্ন ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী আয় ও মুনাফা দেখাচ্ছে; অন্যদিকে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত এখনো খেলাপি ঋণ, ঋণের চাহিদা, মূলধন ও তারল্য ব্যবস্থাপনার মতো চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে।

এ অবস্থায় দ্বিতীয়ার্ধে ব্যাংকগুলোর সামনে মূল পরীক্ষা হবে সরকারি সিকিউরিটিজনির্ভর বিনিয়োগ আয় ছাড়িয়ে মূল ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকে কতটা টেকসই আয় করা যায়। কারণ মুনাফার তালিকায় শীর্ষে থাকা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই মুনাফা কতটা স্থায়ী এবং সম্পদের মান ও ঋণ ব্যবসার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—আগামী সময়ে বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রকদের কাছে সেটিই হয়ে উঠবে বড় প্রশ্ন।

 

Facebook Comments Box

Posted ০৬:২৫ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com