সজল সরকার
রবিবার, ০২ নভেম্বর ২০২৫ প্রিন্ট ২৭৬ বার পঠিত
ঢাকার মিরপুরের ব্যস্ত সড়কে গ্রীষ্মের কড়া রোদে সবার হাঁসফাঁস অবস্থা। কালসি ফ্লাইওভারের কাছে কতগুলো অভুক্ত কুকুর বসে ছিল। হাড্ডিসার অবস্থা দেখেই বুঝা যাচ্ছিল তারা কয়েক দিন ধরেই অভুক্ত অবস্থায় রয়েছে। তানিশা সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন, কুকুরগুলো তার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। তানিশার খুব মায়া হলো, মনে হচ্ছিল কুকুরগুলো তার জন্যই অপেক্ষা করছিল। পাশের দোকান থেকে কেক, বিস্কিট কিনে ওদের খেতে দিল। সেই থেকেই অনাথ কুকুরগুলোর মায়ায় পড়ে গেল তানিশা। প্রতিদিন বাসা থেকে খাবার নিয়ে তাদেরকে খাওয়ানো শুরু করলেন। সবার কাছে চেনা একটি দৃশ্য হতে লাগলো এটি। কালসির রাস্তায় দাঁড়িয়ে তানিশা নরম কণ্ঠে ডাকে- “বাবারা, আয় খেয়ে যা।” মুহূর্তেই চারপাশ থেকে ছুটে আসে আশেপাশের কুকুর। কেউ আনন্দে লেজ নাড়ে, কেউ উচ্ছ্বাসে ঘেউ ঘেউ করে ওঠে। আর তারা যখন খেতে শুরু করে, তখন তানিশার মুখে ফুটে ওঠে এক পরম তৃপ্তির হাসি।
এই দৃশ্য এখন মিরপুরবাসীর কাছে পরিচিত। কিন্তু এর শুরুটা এতটা সহজ ছিল না। প্রায় চার বছর আগে একদিনের ঘটনাই পাল্টে দেয় তানিশার জীব-প্রেম।
দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি’র সঙ্গে কথা হচ্ছিল তানিশার। তার বাসা মিরপুরের কালসিতে। তিনি বলেন, কালসি ফ্লাইওভারের পাশে কয়েকটা কুকুরকে কাঁপতে কাঁপতে বসে থাকতে দেখে হঠাৎ থমকে যান। তাদের চোখে ছিল অদ্ভুত এক নিরুপায় ক্ষুধার্ত দৃষ্টি। তানিশা একটু দূরেই থামলেন, দোকান থেকে কিছু কেক, বিস্কুট আর পানি কিনে এনে কুকুরগুলোর সামনে রাখলেন। এক মুহূর্তের মধ্যে ওরা লাফিয়ে লাফিয়ে খাবারটা খেয়ে নিল। ওদের মুখে সেই সময়কার তৃপ্তি তানিশার হৃদয়ে যেন অন্যরকম আলো ছড়িয়ে দিল।
সেদিন বাসায় ফিরেও মনটা পড়ে ছিল কালসির ওই কুকুরগুলোর কাছে। ভাবলেন, “ওদের আবার খেতে দিই না কেন?” পরদিন সকালে আবার গেলেন, সঙ্গে নিয়ে কিছু রুটি আর মুরগির হাড়। কুকুরগুলো তাকে চিনে ফেলেছিল। তানিশা ডাকতেই ওরা দৌড়ে এসে লেজ নাড়িয়ে ভালোবাসার ভাষায় স্বাগত জানাল। সেই শুরু। তারপর থেকে প্রতিদিনই তিনি যান। কখনো সকালে, কখনো বিকেলে সময় যতই কম হোক, ওদের জন্য একটু খাবার তিনি রাখেনই।
ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়ল:
প্রথমে ১৫-২০টি কুকুরকে খাওয়াতেন তানিশা। নিজের আয় সীমিত হলেও খরচের হিসাব কষে ওদের জন্য আলাদা রাখতেন কিছু টাকা। ধীরে ধীরে যখন মিরপুর ১১, কালসি, মিল্লাত ক্যাম্প, এমনকি লালমাটিয়া পর্যন্ত তার পরিচিতি ছড়িয়ে যায়, তখন তার ‘পরিবারের’ সদস্যসংখ্যাও বাড়তে থাকে। এখন দিনে ১০০টিরও বেশি রাস্তার কুকুর নিয়মিত খায় তার হাতে বানানো খাবার।
তিনি নিজেই বাজার করেন ভাত, মুরগি, ডিম, মাঝে মাঝে হাড় বা খিচুড়ি মিশিয়ে রান্না করেন। তারপর নিজেই ঘুরে ঘুরে বিতরণ করেন খাবার। বৃষ্টি হোক বা রোদ, ঈদ হোক বা কর্ম ব্যস্ততা- কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। তানিশা হাসতে হাসতে বলেন, ‘ওরা তো এখন আমার সন্তান। কেউ অসুস্থ হলে মন খারাপ হয়ে যায়, কেউ নতুন বাচ্চা দিলে মনে হয় বাড়িতে নতুন অতিথি এসেছে।’ মিরপুর ১১ তে একটি প্যারালাইস্ড কুকুর তানিশাকে দেখেই লাফালাফি শুরু করল, তানিশা নিজ হাতে কুকুরের মুখ টেনে খাইয়ে দিলেন।
সমাজের চোখে:
তবে সবাই যে তানিশার এই কাজকে ভালো চোখে দেখে তা নয়। অনেকেই বলেন, “রাস্তার কুকুরকে এত ভালোবাসা কেন? মানুষকে সাহায্য করলেই তো পারো!” কিন্তু তানিশার উত্তর সবসময় শান্ত ও দৃঢ়। ‘মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়ায়, কিন্তু এই প্রাণীগুলোর পাশে কে দাঁড়ায়? ওরা তো বলতে পারে না ওরা ক্ষুধার্ত। শুধু চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ওরা আমার কাছে মানুষ থেকেও বেশি সৎ।’
তার এই কাজের জন্য অনেক বাড়িওয়ালা তাকে ধমক দিয়েছেন। কেউ কেউ কুকুর মারার হুমকি দিয়েছে, কেউ আবার কুকুরের বাচ্চা মেরে ফেলেছে। এমনও হয়েছে তিনি গিয়ে দেখেছেন, যে বাচ্চাগুলোকে গতকাল আদর করেছেন, তারা আজ আর বেঁচে নেই। সেই দৃশ্য তাকে কাঁদিয়েছে, কিন্তু ভেঙে ফেলেনি। বরং আরও দৃঢ় করেছে তার অঙ্গীকার। অনেক বাড়িওয়ালা অভিযোগ দিয়েছে এবং কুকুর বিরক্ত করে হুমকিও দিয়েছে কিন্তু তানিশা থেমে যাননি। এসব ঝামেলা এড়াতে এমনকি পুলিশ ও র্যাবও ডাকতে হয়েছে তানিশার। যেহেতু প্রাণী হত্যা ও নির্যাতন বিরোধী আইন আছে, তাই এসব ক্ষেত্রে তানিশারই পক্ষ নিয়েছে প্রশাসন।
ত্যাগ ও তৃপ্তি:
তানিশার ও তার বন্ধুরা অনেকেই চাকরির বেতন দিয়ে শপিং করে, রেস্টুরেন্টে খায়, ঘুরতে যায়। তানিশার শপিং করার খুব শখ, প্রায় নিয়মিতই শপিংয়ে অনেক টাকা খরচ করতেন। কিন্তু এখন নিজের সব বিলাসিতা কাটছাঁট করেছেন তিনি। শপিংয়ের শখ বাদ দিয়েছেন, পারফিউম বা ব্যাগ কেনার বদলে সেই টাকা রাখেন “অনাথ কুকুরগুলোর খাবার ফান্ডে।” তার ব্যাগে সবসময় থাকে কিছু বিস্কুট, কখনো কুকুরের শুকনো খাবার। রাস্তায় যেখানেই ক্ষুধার্ত কুকুর দেখেন, থেমে যান। তানিশা বলেন, ‘অনেকে মনে করে আমি ওদের খাওয়াই, কিন্তু সত্যি বলতে ওরাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। আমি যখন হতাশ থাকি, ওদের চোখের দিকে তাকালেই মনে হয় সব ঠিক হয়ে যাবে। ওরা যে ভালোবাসা দেয়, কোনো মানুষও তা দিতে পারে না।’ তানিশার ৪ সন্তান ও বিদেশি স্বামীও তাকে এ কাজে সমর্থন জানান।
ছোট ছোট সুন্দর মুহূর্ত:
প্রতিদিনের এই কাজের ভেতর তানিশা দেখেন অনেক ছোট ছোট অলৌকিক ঘটনা। যেমন একবার এক অসুস্থ কুকুরকে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখে তিনি নিজেই চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। স্থানীয় এক পশুচিকিৎসকের সহায়তায় কুকুরটি ধীরে ধীরে সেরে ওঠে। এখন সেই কুকুরটি তাকে দেখলেই লেজ নাড়িয়ে তার গায়ে মুখ ঘষে, যেন কৃতজ্ঞতা জানায়। আরেকবার তিনি বৃষ্টির দিনে ফ্লাইওভারের নিচে খাবার দিতে গিয়ে দেখেন, কুকুরগুলো একে একে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কারও খাবার কেড়ে নিচ্ছে না। তানিশা বলেন, ‘মানুষও যদি ওদের মতো একটু শৃঙ্খলাবোধ শেখত, পৃথিবীটা অনেক সুন্দর হতো।’
ভবিষ্যতের স্বপ্ন:
আজ তানিশা শুধু একজন প্রাণপ্রেমী নন, তিনি এক প্রতীক সহানুভূতির, মানবিকতার, আর নীরব সংগ্রামের। তিনি এখন পরিকল্পনা করছেন একটি আশ্রয়কেন্দ্র গড়ার, যেখানে অসহায় ও অনাথ কুকুরদের জন্য থাকবে চিকিৎসা, খাবার ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা। তিনি বলেন, ‘আমি জানি, একা পেরে উঠব না। কিন্তু কেউ তো শুরু করতে হবে। একদিন হয়তো অন্যরাও পাশে দাঁড়াবে।’ তানিশার এই স্বপ্নে ইতিমধ্যে কিছু স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত হয়েছেন। কেউ মাঝে মাঝে খাবার দেয়, কেউ চিকিৎসা খরচে সাহায্য করে। ছোট এই উদ্যোগ এখন এক নিঃশব্দ আন্দোলনে পরিণত হচ্ছে।
তানিশা জানেন, অনেকেই তাকে “পাগল মেয়ে” বলে ডাকে। কিন্তু তার কাছে এটাই জীবন। তার মতে, “ভালোবাসা মানে শুধু কাউকে ফুল দেওয়া নয় বরং যাদের ভালোবাসা কেউ বোঝে না, তাদের পাশে দাঁড়ানোই আসল ভালোবাসা।” একদিন হয়তো তানিশার মতো আরও অনেক তরুণ-তরুণী এগিয়ে আসবে, আর তখন হয়তো ঢাকা শহরের প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি ফ্লাইওভারের নিচে ক্ষুধার্ত কোনো প্রাণ আর নিঃশব্দে মারা যাবে না।
ভোরের সেই সময়, যখন শহর জেগে ওঠে, তানিশা আবারও খাবার নিয়ে ছোটেন। কুকুরগুলো তাকে ঘিরে ধরে, লেজ নাড়ে, কেউ কেউ লাফিয়ে তার হাতে মুখ দেয়। তিনি বলেন, “খাও, বাবারা। আজ তোমাদের জন্য মুরগি রান্না করেছি।” সেই মুহূর্তে তার চোখে ঝলমল করে ওঠে এক অদ্ভুত আলো যা হয়তো ভালোবাসারই অন্যরূপ। ভালোবাসা কখনও প্রজাতি দেখে না। ভালোবাসা শুধু অনুভব করা যায়। আর সেই ভালোবাসাই হয়তো পৃথিবীটাকে একটু বেশি বাসযোগ্য করে তোলে।
Posted ০৫:৩৭ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০২ নভেম্বর ২০২৫
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com