Ad
x

যোগাত্মক ও বিয়োগাত্মকের বাজেট

বৃহস্পতিবার, ১৯ জুন ২০২৫   প্রিন্ট   ১০৬৭ বার পঠিত

যোগাত্মক ও বিয়োগাত্মকের বাজেট

এই প্রথম রেকর্ড ব্রিফকেসবিহীন বাজেট। একেবারে ভিন্নমাত্রায় ও ভিন্নআঙ্গিকে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গত ২ জুন আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট এবং অন্তবর্তী সরকারের প্রথম বাজেট পেশ করেছেন। সব মিলিয়ে কেমন হল বাজেট? তা নিয়ে চর্চা চলছে। এই বাজেটের ভালো কোনটা? কমতিই বা কোনটা? দর্শন এবং অর্থনৈতিক সমীক্ষায় উঠে আসা বিভিন্ন মতামতের সমাহার এই বাজেট। তবে অর্থনীতির উপর এর প্রভাব কেমন পড়বে তা সামনের দিনগুলোই বলতে পারবে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে সরকারের আয় অর্থাৎ রাজস্ব প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা যা জিডিপি’র ৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। এই বরাদ্দ চলতি অর্থ বছরের ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার চেয়ে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ কম।

এই প্রথম নতুন বাজেটের আকার ছোট হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে প্রতি বছরই বেড়েছে নতুন বাজেটের আকার। আবার প্রতি বছর বাজেটের আকার বাড়লেও বছর শেষে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। যদিও এর মধ্য দিয়ে ১৯৭২-৭৩ অর্থবছর থেকে চলা বাজেটের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির ধারা প্রথমবারের মতো ভেঙে গেল। তাহলে কি বাস্তবায়নযোগ্য করতেই কমানো হয়েছে আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার?

এই বাজেটে ঘাটতি মেটাতে বিদেশি ঋণ, ব্যাংক ঋণ ও সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভর করেছে। এর মধ্যে বৈদেশিক নিট ঋণ প্রাপ্তির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৯৬ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণভাবে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে। আর ব্যাংক বহির্ভূত খাত থেকে ঋণ নেওয়া হবে ২১ হাজার কোটি টাকা ও জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

রাজস্ব ঘাটতি কমাতে, সরকারের ঋণ কৌশলে বিদেশি এবং দেশিয় ঋণের মিশ্রণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যার প্রতিটিরই নির্দিষ্ট সুবিধা এবং অসুবিধা রয়েছে। বিদেশি ঋণ তাৎক্ষণিকভাবে যথেষ্ট তহবিল সরবরাহ করলেও এটি ভবিষ্যতে পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বৃদ্ধি করে এবং অর্থনীতিকে মুদ্রা ঝুঁকির সম্মুখীন করে। বর্ধিত বৈদেশিক ঋণ ভবিষ্যতে পরিশোধের বোঝা বাড়ায়, যার ফলে সুদ পরিশোধের পরিমাণ বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতি বিনিময় হারের ওঠানামার ঝুঁকি বাড়ায়, যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে এবং সম্ভাব্যভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস এবং জাতীয় মুদ্রার আরও অবমূল্যায়ন ঘটায়।

অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ ঋণ অভ্যন্তরীণ সম্পদকে একত্রিত করবে, যা জাতীয় বিনিয়োগকে উদ্দীপিত করবে, তবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকগুলো থেকে প্রচুর ঋণ নেয়ার ফলে বেসরকারি খাতের উপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ঋণ পাওয়া আরও কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। তহবিলের জন্য এই প্রতিযোগিতা উচ্চ সুদের হার, বিনিয়োগ হ্রাস এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমিয়ে আনতে পারে।

অন্তবর্তীকালীন সরকারের এই বাজেটের লক্ষ্য স্বপ্ন দেখা নয়, অর্থনীতির ঘাত নিরাময়। ভগ্নপ্রায় অর্থনীতিকে জরুরিভাবে মেরামতের মাধ্যমে স্থিতিশীল করার চেষ্টা এবং ব্যবস্থাপনাগত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার একটি প্রয়াস। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থ বছরের প্রথম ছয় মাসে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। পরের চার মাস অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ঘরে ছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে খাদ্যমূল্যস্ফীতি গড়ে ১০ শতাংশের বেশি ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করায় সাধারণ মানুষ বা সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাপন আরো কঠিন হয়েছে। বিশ্বব্যাংক আশঙ্কা করছে যে, দেশে নতুন করে ৩০ লাখ মানুষ অতি দরিদ্র হতে পারে। কৃষি প্রবৃদ্ধি ও কমে গেছে। শিল্প ও বিনিয়োগের অবস্থা ও খুব একটা ভালো নয়। তাহলে কর্মসংস্থান কীভাবে বাড়বে? আর মূল্যস্ফীতিই বা কীভাবে কমবে? তাহলে কি রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে এর সমাধান করতে হবে?

বাজেটে এনবিআর এর জন্য বড় আকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে যা ৪ লক্ষ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অতীতে এনবিআর কখনোই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। কারণ কর ফাঁকি রোধে এখনো সঠিক ব্যবস্থা নেই। আমাদের ডিজিটাল ট্যাক্স সিস্টেম এখনো দুর্বল। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় আয় গোপন করে। ফলে, রাজস্ব আয়ের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভর করছে। গত পাঁচ অর্থবছরের গড় হিসাব থেকে দেখা যায় যে, রাজস্ব বোর্ড আহরিত মোট করের প্রায় দুই তৃতীয়াংশই আসছে পরোক্ষ কর থেকে। পরোক্ষ কর আদায়ের জন্য বেশি বেশি নির্ভর করার অর্থ হচ্ছে সরকার যাদের আয় বেশি তাদের কাছে থেকে বেশি কর আদায়ের পরিবর্তে ঢালাওভাবে সবার কাছ থেকে কর আদায় করছে। আর স্বভাবতই এতে বেশি চাপে পড়েছে কম আয়ের মানুষেরা। তাই এই বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্য অতি ধনীদের কাছ থেকে সম্পদ কর আদায় করে বাজেটকে আরো কার্যকর করা যেতে পারে।

মোট বাজেটের ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ শুধু ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই যাবে যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের সম্মিলিত বরাদ্দ থেকেও বেশি। ফলে উৎপাদনমূখী খাতে বিনিয়োগ কমবে এবং উন্নয়ন ব্যয় হ্রাস পাবে। প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে, ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরের মূল এডিপি থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা কম। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলতে পারে। বেসরকারি খাতে ঋণ কমে যাওয়া হচ্ছে আরেকটি দুশ্চিন্তার সূচক। এ খাতে বৃদ্ধির হার হচ্ছে ৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এর অর্থ হচ্ছে ব্যক্তিখাত ব্যাংক ঋণ নিচ্ছে কম, বিনিয়োগও করছে কম। অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগও কমে যাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে।
অর্থনীতিবিদরা ঐতিহ্যগতভাবে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড এবং জাতীয় সমৃদ্ধি পরিমাপের জন্য মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ব্যবহার করেন। যদি জিডিপি বৃদ্ধি পায়, তাহলে অর্থনীতি দৃঢ় অবস্থায় রয়েছে এবং জাতি এগিয়ে চলেছে বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে, যদি জিডিপি হ্রাস পায়, তাহলে অর্থনীতি সমস্যায় পড়তে পারে এবং দেশটি গতি হারাতে পারে। টানা দুই চতুর্থাংশ নেতিবাচক জিডিপি সাধারণত অর্থনৈতিক মন্দার ইঙ্গিত দেয়। আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। যেখানে বর্তমানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার ৪ শতাংশের নিচে। বিশ্বব্যাংক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আভাস, আগামী অর্থবছর ও দেশের জিডিপি ৪ শতাংশের ঘরেই থাকবে। ফলে এই বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য করা অবশ্যই কঠিন হবে।

দেশের সেভিংস কমে যাচ্ছে। কারণ তিন বছর ধরে আমাদের মূল্যস্ফীতি প্রকৃত মজুরি থেকে বেশি। অর্থাৎ আমাদের দেশের মানুষের খরচ বেশি হয়, আয় কম। একটা রাষ্ট্রে যদি খরচ বেশি হয় আয় কম হয়, তাহলে কোনো সঞ্চয় হওয়ার সুযোগ থাকে না। সঞ্চয় কমে গেলে বিনিয়োগ কমে যাবে। এতে কর্মসংস্থান আরও সংকোচিত হবে।
অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে, বাজেটে। অর্থাৎ বাজেটে কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হবে না বিধান চালু করা হয়েছে। যার মাধ্যমে ব্যক্তিরা ১৫ শতাংশ কর প্রদান করে অর্থনীতিতে অপ্রকাশিত অর্থ অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট কেনা এবং ভবন নির্মাণে বৈধ করার সুযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে। তবে, এখনকার পরিস্থিতিতে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ, বিশেষ করে যেহেতু বৈধ আয়ের সর্বোচ্চ করের হার ৩০ শতাংশ। এটি ব্যক্তিদের তাদের উপার্জন গোপন রাখার, ৩০ শতাংশ কর এড়াতে এবং পরবর্তীতে ১৫ শতাংশ হ্রাসকৃত হারে অর্থ প্রচলনে ফিরিয়ে আনার জন্য উৎসাহ তৈরি করে?

এই বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বিদ্যমান অর্থনীতির গতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে কর জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং একটি উন্নত সমাজ বিনির্মাণ। সামগ্রিকভাবে বাজেটের যোগাত্মক ও বিয়োগাত্মক দিক রয়েছে- তবে অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা যা দক্ষতা, ন্যায্যতা ও স্থায়ীত্বের আদর্শিক স্তম্ভগুলোর মধ্যে দৃঢ়তা বজায় রেখেছে।
এটি সবদিক থেকে একটি স্বাগত পদক্ষেপ যে, শূন্য দারিদ্র, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য কার্বনভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ। কর্মমূখী ও প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা বাড়লে এবং অনুৎপাদনশীল খাতকে উৎপাদনশীল খাতে আনা গেলেই দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। ফলে, এই বাজেট দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।

 

Facebook Comments Box
বিষয় :

Posted ০৪:৫১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৯ জুন ২০২৫

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com