নিজস্ব প্রতিবেদক
বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ প্রিন্ট ১৬৩ বার পঠিত
ভারতের জিএসপি (জেনারালাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্সেস) সুবিধা স্থগিত করায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) রপ্তানিতে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
ইইউ’র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন বছরের জন্য ভারতের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এর ফলে ইইউতে ভারতের প্রায় ৮৭ শতাংশ রপ্তানি পণ্যে এখন পূর্ণ এমএফএন (মোস্ট ফেভার্ড নেশন) শুল্ক প্রযোজ্য হবে। অবশ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের জন্য ঘোষিত নতুন জিএসপি নিয়মের বাস্তব প্রভাব মোট ভারতীয় রপ্তানির মাত্র ২.৬৬ শতাংশে পড়বে।
তবে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ’ এ বিষয়ে অন্য একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। তারা বলছে, ভারতের জন্য আগে যে পণ্যগুলোতে জিএসপি সুবিধা ছিল, তার একটি বড় অংশই নতুন নিয়মে বাধ্যতামূলক ‘মোস্ট ফেভার্ড নেশন’ শুল্কের আওতায় চলে গেছে। এই কারণে তারা মনে করছে, প্রায় ৮৭ শতাংশ শুল্ক সুবিধা কার্যত হারাচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগে কোনও পোশাক পণ্যে ১২ শতাংশ এমএফএন শুল্ক থাকলেও জিএসপি সুবিধায় ভারতীয় রপ্তানিকারককে দিতে হতো মাত্র ৯.৬ শতাংশ। এখন সেই সুবিধা উঠে যাওয়ায় পুরো ১২ শতাংশ শুল্ক গুনতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুল্ক সুবিধা হারানোর ফলে ইউরোপীয় ক্রেতাদের জন্য ভারতীয় পণ্যের আকর্ষণ কিছুটা কমতে পারে।
এর বিপরীতে বাংলাদেশ এখনও ইইউ বাজারে শুল্কমুক্ত বা স্বল্প শুল্ক সুবিধা ভোগ করছে। ফলে দাম ও সরবরাহের প্রতিযোগিতায় ইউরোপীয় ক্রেতাদের দৃষ্টি ঘুরে আসতে পারে ঢাকাকেন্দ্রিক রপ্তানি শিল্পের দিকে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি টেক্সটাইল, চামড়া ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যে বাংলাদেশ এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে নতুন গতি আসতে পারে।
বাংলাদেশ বর্তমানে ইইউতে ডিউটি-ফ্রি ও কোটামুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। ফলে যেখানে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের ৯-১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের পণ্য ইউরোপে প্রবেশ করছে শূন্য শুল্কে। এই ব্যবধানই ইউরোপীয় ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।
বিশেষ করে পোশাক খাতে, যেখানে মুনাফার মার্জিন অত্যন্ত কম, সেখানে এই শুল্ক পার্থক্যই অর্ডার স্থানান্তরের জন্য যথেষ্ট।
ইইউ বাজারে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ভারতের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহারের ফলে বেসিক নিটওয়্যার, ডেনিম ও ক্যাজুয়াল ওভেন পোশাক এই পণ্যগুলোর অর্ডার বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ভারতের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার বাংলাদেশের জন্য কোনও স্বয়ংক্রিয় সাফল্য নয়। এটি মূলত একটি সময়-সীমাবদ্ধ সুযোগ। দক্ষতা বৃদ্ধি, উৎপাদন সক্ষমতা উন্নয়ন, শ্রম ও পরিবেশগত মান বজায় রাখা এবং নীতিগত প্রস্তুতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে সম্ভাবনাটি হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল গণমাধ্যমকে বলেছেন, ভারতের তৈরি পোশাক পণ্যে ইউরোপীয় বাজারে আগেই গড়ে প্রায় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ শুল্ক আরোপিত ছিল। অপরদিকে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ইবিএ (এভরিথিং বাট আর্ম) সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত থাকায় ভারত তুলনামূলকভাবে শুল্ক সুবিধা পেতো আরএসপি ব্যবস্থার মাধ্যমে। সেই সুবিধার আওতায় ভারত একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শুল্ক ছাড় পেতো। বর্তমানে সেই সুবিধা উঠে যাওয়ায় ভারতের পোশাক রপ্তানিতে গড়ে প্রায় আড়াই শতাংশের মতো অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হতে পারে। তিনি বলেন, “গড়ে আড়াই শতাংশ শুল্ক বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি ছোট মনে হলেও বাস্তবে এক শতাংশ শুল্ক বাড়াও এখন বড় বিষয়। কারণ ইউরোপের বাজারে ভারত আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী হয়ে উঠেছিল।” তার মতে, ভারতের ওপর এই অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ ইউরোপীয় বাজারে তাদের প্রতিযোগিতাকে কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত করবে। এতে করে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের মতো অত্যন্ত মূল্যসংবেদনশীল বাজারে ১-২ শতাংশ শুল্ক পরিবর্তনও অর্ডার স্থানান্তরের জন্য যথেষ্ট। আগে যেখানে ভারতীয় গার্মেন্টস পণ্যে গড়ে ৯.৬ শতাংশ শুল্ক দিতে হতো, এখন সেখানে দিতে হবে পূর্ণ ১২ শতাংশ। এই বাড়তি খরচ সরাসরি পণ্যের দামে প্রতিফলিত হবে।
অপরদিকে, বাংলাদেশ ইউরোপে এখনও ডিউটি-ফ্রি ও কোটামুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। ফলে একই মানের পণ্যে বাংলাদেশের রফতানিকারকরা স্বাভাবিকভাবেই মূল্য সুবিধায় এগিয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের জন্য সুযোগ কেবল গার্মেন্টসেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের শুল্ক সুবিধা হারানোর প্রভাবে ইউরোপে যে পণ্যগুলো প্রতিযোগিতায় পড়বে, তার মধ্যে রয়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ও হালকা প্রকৌশল পণ্য। এই খাতগুলোতে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, যা এখন অর্ডার টানার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
Posted ০৫:৩৮ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com