Ad
x

রেমিট্যান্স ও আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি

বুধবার, ২১ মে ২০২৫   প্রিন্ট   ১৪৫৪ বার পঠিত

রেমিট্যান্স ও আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি

যে সমস্ত বাংলাদেশি কর্মসূত্রে বিদেশে গিয়েছেন এবং বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবেই বিদেশ থেকে অর্থ উপার্জন করছেন, দেশে তাদের প্রেরিত অর্থকে বলা হয় ‘‘রেমিট্যান্স’’। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়। দেশে আত্মীয় স্বজন, নিকটজনদের জন্য বিদেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে থাকেন সেখানে কর্মরতরা। নিজেরা দেশে ফিরলেও তাদের সঙ্গে আসে বিদেশ থেকে অর্জিত অর্থ, ভরে ওঠে দেশের ভান্ডার। রেমিট্যান্স সাধারণত বিদেশি মুদ্রায় যেমন-ডলার, ইউরো আসে, যা দেশের রিজার্ভে যোগ হয়। যখন প্রবাসী শ্রমিকরা দেশের মধ্যে অর্থ পাঠায় তখন ওই অর্থের একটা অংশ ব্যাংকিং সিস্টেমের মাধ্যমে বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভে জমা হয়। এর ফলে দেশের রিজার্ভে বৃদ্ধি ঘটে, যা বৈদেশিক মুদ্রার মূল্য সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় মুদ্রার সরবরাহ নিশ্চিত করে।

মূলত প্রবাসী আয়, রপ্তানি আয়, বিদেশী বিনিয়োগ, বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ঋণ ও অনুদান থেকে যে ডলার পাওয়া যায়, তা দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তৈরি হয়। আবার আমদানি ব্যয়, ঋণের সুদ বা কিস্তি পরিশোধ, বিদেশি কর্মীদের বেতন ভাতা, পর্যটক বা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাসহ বিভিন্ন খাতে যে ব্যয় হয়ে থাকে, তার মাধ্যমে বিদেশি মুদ্রা চলে যায়। এভাবে আয় ও ব্যয়ের পর যে ডলার থেকে যায়, সেটাই রিজার্ভে যুক্ত হয়। আর বেশি খরচ হলে রিজার্ভ কমে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে ২৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা আগের অর্থ বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি এসেছে। এটা ঠিক যে, আমরা নিজস্ব সক্ষমতায় রিজার্ভ বাড়াতে পারছি। আমাদের রেমিট্যান্স এবং রপ্তানির প্রবাহ ভালো। দেশের রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে, রেমিট্যান্স প্রবাহও বাড়ছে। পাশাপাশি বিলাসী পণ্য আমদানি কমেছে। এতে ব্যালেন্স অব পেমেন্ট পরিস্থিতি উন্নতি হচ্ছে। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের ঘাটতি কমতে শুরু করেছে। অন্যদিকে চলতি হিসাবের লেনদেন ভারসাম্যও এখন উদ্বৃত্ত।

ব্যালেন্স অব পেমেন্ট কি? বাণিজ্য ও সেবার বিপরীতে যে পরিমাণ অর্থ বিদেশে পরিশোধ এবং দেশে গ্রহণ করা হয় সেটাই ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বা বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য নামে পরিচিত। এই ভারসাম্যের উদ্বৃত্ত ও ঘাটতি একটি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বোঝা যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রত্যেক দেশের কেন রিজার্ভ রাখা প্রয়োজন ? রিজার্ভ রাখা একটি দেশের মুদ্রানীতির কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য অপরিহার্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভের মাধ্যমে অর্থের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ বাড়ায়, তখন সাধারণত সুদের হার কমে যায়, যা ব্যবসায়িক ঋণ ও বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করে। আর রিজার্ভ যখন কমে আসে, তখন সুদের হার বেড়ে যায়, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এভাবে, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অর্থনীতির সঠিক দিক নির্দেশনায় সহায়তা করে।

রিজার্ভ ব্যাংকিং সিস্টেমের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করে। ব্যাংকগুলোকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ রিজার্ভ রাখতে হয় যা তাদের লিকুইডিটি নিশ্চিত করে। এই নিয়ম ব্যাংকিং খাতের উপর গ্রাহকদের আস্থা বজায় রাখতে সাহায্য করে। যখন কোনো অর্থনৈতিক সংকট ঘটে, তখন রিজার্ভ ব্যাংকগুলোকে তাদের কার্যক্রম স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে। এটি ব্যাংকগুলোর মধ্যে লেনদেনের সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং অর্থনৈতিক সংকটের সময় সুষ্ট কার্যক্রম বজায় রাখে।

বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভের তিনটি হিসাব সংরক্ষণ করে। এর মধ্যে প্রথমটি বৈদেশিক মুদ্রায় গঠিত বিভিন্ন তহবিলসহ মোট রিজার্ভ। এর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সহজ শর্তের ঋণ (ইডিএফ) ও আরেকটি তহবিল দ্বিতীয়টি হলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবায়ন পদ্ধতি। এটি বৈদেশিক মুদ্রায় গঠিত তহবিল বা ঋণের অর্থ বাদ দিয়ে একটি তহবিল। এর বাইরে হিসাবটি ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মোতাবেক আইএমএফের ফর্মুলা অনুযায়ী ব্যালেন্স অব পেমেন্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল (বিপিএম-৬) মানদন্ড অনুসারে মোট রিজার্ভ নির্ধারণ করা হয়েছে।

রিজার্ভ বৃদ্ধি কেন দরকার? রিজার্ভের বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং বৃদ্ধির সংকেত দেয়। বিনিয়োগকারীরা এমন দেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী যেখানে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি শক্তিশালী এবং বিদেশী মুদ্রার সংকট কম থাকে। রিজার্ভের বাড়তি পরিমাণ দেশের বাজারকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে, কারণ বিদেশী বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ নিরাপদ মনে করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মোতাবেক অন্তবর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশ থেকে অর্থপাচার না হওয়ায় ও হুুন্ডি কারবারিদের দৌরাত্ম না থাকায় রেমিট্যান্স বাড়ছে ফলে রিজার্ভও ভালো অবস্থানে আছে। বাংলাদেশের রিজার্ভ রেকর্ড গড়ে ২০২১ সালের ২৪ আগষ্ট। ওই দিন রিজার্ভ ৪৮ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন ডলার বা ৪ হাজার ৮০৪ কোটি ডলারে উঠে যায়। এরপর ডলার সংকটে ২০২৩ থেকে রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। আমরা যদি প্রতিবেদন অনুযায়ী গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে থেকে প্রত্যক্ষ করি তাহলে দেখা যায় তখন রিজার্ভ ছিল ২১ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২৫ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩০ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩৩ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩২ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩২ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪১ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে রিজার্ভ কমে দাড়াঁয় ৩১ বিলিয়ন ডলার ও ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে রিজার্ভ আরও কমে দাঁড়ায় ২৬ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারে। ৩০ এপ্রিল ২০২৫ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ২৭ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিভার্জ ২২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।

ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) হালনাগাদ পরিসংখ্যান এর অনুযায়ী অনেক দিন পর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে ভালোভাবে ঘুরে দাড়াঁল বাংলাদেশ। চলতি বছরে প্রথম ৩ মাসে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বাজারে ২২২ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। যা দেশীয় মুদ্রায় ২৭ হাজার ৮৫ কোটি টাকার সমান। এ রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেশি। প্রবৃদ্ধির এ হার চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ভারতসহ শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।

রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি ২৫ শতাংশ কমে ৭২৯ কোটি ডলারে নেমেছিল। এ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার দুই সপ্তাহের মাথায় কানাডা মেক্সিকো ও চীন থেকে পণ্য আমদানিতে বাড়তি শুল্ক আরোপ করায় বাজারটি নিয়ে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা।

দেশ ছেড়ে কাজের খোঁজে কোথায় যান বাংলাদেশীরা? দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের পরিযায়ীদের গন্তব্যই বা কোথায়? পরিসংখ্যান বলছে, এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আরব উপসাগরীয় দেশগুলি। আমেরিকা গন্তব্যের তালিকায় তাদের অনেক পরে।

যে কোনও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ এই রেমিট্যান্স। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির উন্নতি হয়। তবে প্রদীপের তলায় অন্ধকারের মতো রেমিট্যান্স এরও কালো দিক রয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং কাঠামোর দিকে ইঙ্গিত করে রেমিট্যান্স । কারণ রেমিট্যান্স আসে বিদেশে কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকদের কাছ থেকে, সেই শ্রমিকদের সংখ্যা বেশি হলে রেমিট্যান্স এর পরিমান ও বেড়ে যায়। কোনও দেশে বিদেশে কর্মরত নাগরিকদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার একটি অর্থ হল , সে দেশের কর্মসংস্থানে ঘাটতি। নিজের দেশ পর্যাপ্ত রোজগারের উপায় খুজেঁ না পেয়েই বিদেশে পাড়ি দেন মানুষ।

দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্সের উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পেলে দেশের অভ্যন্তরীন উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান খাত দুর্বল হতে পারে। কারণ শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানোর মাধ্যমে স্থানীয় শ্রমবাজারে চাপ পড়তে পারে। রেমিট্যান্সের নির্ভরশীলতা দেশকে স্বাধীন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধায় ফেলতে পারে। যদি কর্মীরা বিদেশে চলে যান, তবে দেশের মধ্যে দক্ষ জনবল সংকট দেখা দিতে পারে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ করতে পারে। প্রত্যেক দেশের জন্য রিজার্ভ রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি মুদ্রানীতি ব্যাংকিং সিস্টেমের স্থিতিশীলতা, পেমেন্ট সিস্টেমের কার্যকারিতা সংকট ব্যবস্থাপনা, বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। একটি সুস্থ রিজার্ভ ব্যবস্থা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে, যা অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখে।

লেখক ঃ অর্থনীতি বিশ্লেষক
ই-মেইল pkroyrajet2016@gmail.com

Facebook Comments Box

Posted ০২:৫৩ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২১ মে ২০২৫

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com