নিজস্ব প্রতিবেদক
সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬ প্রিন্ট ১৩ বার পঠিত
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতি পুনর্গঠনের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের নীতিগত সমঝোতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএসএনসিসি) আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভায় যোগ দিতে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা জানান।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গে নীতিগত সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে যৌথ উদ্যোগের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’
অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের সংস্কার প্রস্তাব এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা এক নয়। বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সংস্কারের পথরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লিখিত প্রতিশ্রুতি এবং জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে পাঁচ বছর মেয়াদী অর্থনৈতিক কৌশলে সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এই সংস্কার পরিকল্পনার তিনটি ধাপ রয়েছে। প্রথমে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, দ্বিতীয়ত অর্থনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং তৃতীয়ত দ্রুত অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে সমৃদ্ধির পথে যাত্রা। রাজনৈতিকভাবে এরই মধ্যে এই পথরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে।’
উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে কর আদায় বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানো, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বন্ধ কলকারখানা চালুর মতো সংস্কার প্রত্যাশা করে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দেয়।’
‘ফলে বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কার পরিকল্পনা এবং বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে নীতিগত সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক সরকার সংস্কারের মালিকানা গ্রহণ করলে তা টেকসই হওয়ার ভিত্তি তৈরি হবে’- বলেন তিনি।
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিতুমীর বলেন, ‘অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে সরকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের অভিন্ন লক্ষ্য রয়েছে। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সংস্কার বাস্তবায়নের পাশাপাশি জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়ের চাপও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানির বাজারমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করতে হচ্ছে সরকারকে। একই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ জরুরি।’
দারিদ্র্য হ্রাসে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়নে এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে পাঁচ বছরে দারিদ্র্যের হার প্রায় পাঁচ শতাংশ কমানোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
জলবায়ু সহনশীলতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তার মতে, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বাংলাদেশের সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় এসব বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে।
থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ
বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, ‘থাই চেম্বার অব কমার্সের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য কয়েকটি সম্ভাবনাময় খাত তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য, ফলমূল, দুগ্ধজাত পণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে যৌথ বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ দেখা গেছে।’
তিতুমীর বলেন, ‘বাংলাদেশে মৌসুমে আম, কাঁঠাল, লিচুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন বেশি হলেও পর্যাপ্ত হিমাগার, কোল্ড স্টোরেজ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে এসব পণ্যের একটি অংশ নষ্ট হয়। এতে কৃষকেরাও অনেক সময় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। থাইল্যান্ডের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে মূল্য সংযোজন এবং রফতানির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘কৃষিপণ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী পণ্য হিসেবে রফতানি করা গেলে একদিকে কৃষকের আয় বাড়বে, অন্যদিকে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, ‘বাংলাদেশের উৎপাদিত প্রাথমিক পণ্য থাইল্যান্ডে প্রক্রিয়াজাত হতে পারে। আবার থাইল্যান্ডে উৎপাদিত মধ্যবর্তী পণ্য বাংলাদেশে এনে চূড়ান্ত পণ্য তৈরি করে তৃতীয় দেশের বাজারে রফতানির সুযোগও রয়েছে। এভাবে দুই দেশের শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ বাড়ানো সম্ভব।’
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), আঞ্চলিক বাণিজ্য সহযোগিতা এবং শুল্কসুবিধার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য, শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমানোই নয়, বরং উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সংযোগ বাড়িয়ে সামগ্রিক বাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি করাই বাংলাদেশের লক্ষ্য।
সামুদ্রিক যোগাযোগ ও মৎস্যসম্পদ আহরণে সহযোগিতা
বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং মৎস্যসম্পদ আহরণে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিতুমীর।
তিনি বলেন, ‘রেনং বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা যেতে পারে। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো, সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং মৎস্যসম্পদ আহরণে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আগ্রহ রয়েছে।’
তিতুমীরের মতে, কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, মুক্ত বাণিজ্য সহযোগিতা এবং সামুদ্রিক যোগাযোগ—এসব খাতে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে উঠলে বাংলাদেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার ও পুনর্গঠনের লক্ষ্য যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সমৃদ্ধি অর্জন, তেমনি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণও সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
Posted ০৭:২৯ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com