|

Advertisement
×

হিমাগারে আলুর পাহাড়, এবার ক্ষতি ৫ হাজার কোটি টাকা

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬   প্রিন্ট   ১০ বার পঠিত

হিমাগারে আলুর পাহাড়, এবার ক্ষতি ৫ হাজার কোটি টাকা

আলুর বাম্পার ফলন ও বাজারে দরপতনে বিপর্যস্ত উত্তরাঞ্চলের আলুচাষিরা। হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এখনো অবিক্রীত পড়ে আছে। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে নতুন মৌসুমের আলু চাষ। ফলে উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কৃষকরা। বর্তমান বাজারদরে প্রতি কেজি আলুতে ১০-১১ টাকা লোকসান ধরে শুধু রংপুর বিভাগেই কৃষকদের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর রংপুর বিভাগে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১৬ হেক্টর জমিতে ৫১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৮৭ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে ১২৪টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৫৯২ টন, যা মোট উৎপাদনের ২৩ দশমিক ১ শতাংশ। সংরক্ষিত আলুর ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ, অর্থাৎ ৮ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮ টন এখনো হিমাগারে পড়ে আছে।

এদিকে হিমাগারের গেটে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১১ থেকে ১৪ টাকায়। অথচ উৎপাদন খরচই পড়েছে কেজিপ্রতি ১৭ থেকে ১৮ টাকা। ফলে ৬১ কেজির এক বস্তা আলুতে কৃষকের উৎপাদন পর্যায়েই লোকসান হচ্ছে ১৮৩ থেকে ৪২৭ টাকা। এর সঙ্গে হিমাগার ভাড়া, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যোগ হওয়ায় লোকসানের বোঝা আরও বাড়ছে।

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের কৃষক মিজানুর রহমানের সঙ্গে কথা হয় সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের। তিনি জানান, এবার ৪৯ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। ৬১ কেজির ৫ হাজার ২০০ বস্তা আলু হিমাগারে রাখেন। এর মধ্যে ৩ হাজার ১৪২ বস্তা বিক্রি করে পেয়েছেন ১৪ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। তবে হিমাগার ভাড়া ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট আলু বিক্রি করে কত টাকা উঠবে, তা নিয়ে গভীর সংশয়ে রয়েছেন তিনি।

মিজানুর রহমান বলেন, হিমাগার থেকে আলু বের করা এবং অন্যান্য খরচ মিলিয়ে কেজিপ্রতি ব্যয় আরও প্রায় সাত টাকা বেড়েছে। ফলে বর্তমান দরে আলু বিক্রি করলে লোকসান আরও বাড়বে। এ পরিস্থিতিতে অনেক কৃষকই হিমাগার থেকে আলু তোলা বন্ধ রেখেছেন।

রংপুর নগরীর নগরমীরগঞ্জ এলাকার কৃষক জসিম উদ্দিনও দুটি হিমাগারে ৫০০ বস্তা আলু রেখেছেন। তিনিও একই সংকটের কথা জানালেন। তাঁর ভাষ্য, বর্তমান দামে আলু বিক্রি করলে কেজিপ্রতি সাড়ে ১৫ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত লোকসান হতে পারে। তাই লোকসান জেনেও আলু বের করবেন, নাকি আরও ভালো দামের আশায় অপেক্ষা করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

রংপুরের কৃষকদের কাছে আলু একসময় ছিল ‘নগদ টাকার ফসল’। কিন্তু বাজারে বারবার দরপতন ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে সেই আলুই এখন আতঙ্কের নাম। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও কৃষি বিপণন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১২ বছরের মধ্যে সাত বছরই আলু চাষ করে লোকসান গুনতে হয়েছে কৃষকদের।

গত বছরও লোকসানের কারণে কৃষকরা হিমাগার থেকে প্রায় চার লাখ বস্তা আলু তোলেননি। এতে তাঁদের ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ৬০ কোটি টাকা। এবারও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছেন চাষিরা। তাঁদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম না পাওয়ায় আলু চাষ এখন ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকটের পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন। দেশে বছরে আলুর চাহিদা প্রায় ৮৯ লাখ টন, অথচ গত মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ১২ লাখ টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ টন বেশি আলু উৎপাদিত হয়েছে। বিপুল এই উদ্বৃত্ত উৎপাদনের বিপরীতে পর্যাপ্ত বাজার ও রফতানি সুবিধা না থাকায় দাম ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

দ্বিতীয়ত, সংরক্ষণ সুবিধার সীমাবদ্ধতা। রংপুর বিভাগে মোট উৎপাদিত আলুর মাত্র ২৩ শতাংশ হিমাগারে সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণের বাইরে থেকে যায়। আবার হিমাগারে রাখা আলুর বড় অংশ মৌসুমের শেষেও বিক্রি না হওয়ায় কৃষকদের নতুন করে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।

তৃতীয়ত, হিমাগার ভাড়া। কৃষকদের অভিযোগ, হিমাগার মালিকরা প্রতি কেজি আলুর জন্য ছয় থেকে সাত টাকা ভাড়া নিচ্ছেন, যা তাঁদের উৎপাদন খরচের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। তাঁদের দাবি, হিমাগার ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে না নামালে বাজারদর কিছুটা বাড়লেও লোকসান থেকে রেহাই পাওয়া কঠিন হবে।

এ পরিস্থিতিতে সরকার হিমাগারের গেটে আলুর সর্বনিম্ন দাম কেজিপ্রতি ২২ টাকা নির্ধারণ এবং সরকারি উদ্যোগে ৫০ হাজার টন আলু কেনার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে কৃষকদের অভিযোগ, এসব ঘোষণা কার্যকর হয়নি। তাঁরা কোনো প্রণোদনাও পাননি। ফলে সরকারি ঘোষণার সুফল না পেয়ে বাজারের ওপর নির্ভর করেই লোকসান সামলানোর চেষ্টা করছেন তাঁরা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তাৎক্ষণিকভাবে কৃষকদের লোকসান কমাতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। তবে দীর্ঘমেয়াদে আলুর বাজার স্থিতিশীল করতে হলে উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রফতানির মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। শুধু ভর্তুকি দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আলুর বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো, নতুন রফতানি বাজার তৈরি এবং আলুভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।

বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু সারাবাংলাকে বলেন, “সরকার কৃষককে ভর্তুকি দিক, প্রয়োজনে কিছু আলু কিনে নিক।”

কৃষি অর্থনীতিবিদ রায়ান আহমেদ রাজু মনে করেন, কৃষকদের ক্ষতি কমাতে হিমাগার ভাড়ার অর্ধেক ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি আলুচাষিদের সরাসরি মূল্য সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষকদের পরিকল্পিতভাবে আলু চাষ করতে হবে এবং ফসলের বৈচিত্র্য আনতে হবে। শুধু আলুর ওপর নির্ভর না করে ভুট্টা, সবজি কিংবা ধান চাষের দিকেও নজর দিতে হবে। এতে একটি ফসলে লোকসান হলে অন্য ফসলের আয় দিয়ে সেই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

তবে কৃষকদের আশঙ্কা, বাজার ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ সুবিধা ও ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা না গেলে প্রতি বছর বাম্পার ফলনই তাঁদের জন্য বড় আর্থিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

Facebook Comments Box
✎ মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Posted ০৯:৫৪ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com