|

Advertisement
×

মাথাপিছু ঋণ ৮০ হাজার টাকা ছাড়াল, রপ্তানি ও রাজস্ব আয় কম থাকায় ঋণ পরিশোধ নিয়ে উদ্বেগ

সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬   প্রিন্ট   ২৭ বার পঠিত

মাথাপিছু ঋণ ৮০ হাজার টাকা ছাড়াল, রপ্তানি ও রাজস্ব আয় কম থাকায় ঋণ পরিশোধ নিয়ে উদ্বেগ

বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ বেড়ে রেকর্ড ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ১৪ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। ঋণের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি তা পরিশোধের চাপও বাড়ছে। দুর্বল রপ্তানি আয়, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম রাজস্ব আদায় এবং বিদেশি ঋণে নেওয়া কিছু প্রকল্পের প্রত্যাশিত সুফল না পাওয়ায় ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল ১১০ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার। মাত্র তিন মাসে তা বেড়ে জুনে দাঁড়িয়েছে ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, এ সময়ে ঋণ বেড়েছে ৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

ডলারপ্রতি ১২৩ টাকা হিসাবে এই ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটের প্রায় দেড় গুণ। বর্তমানে দেশের প্রতিটি মানুষের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৬৫৭ ডলার বা প্রায় ৮০ হাজার ৩২০ টাকা। এক দশকেরও কম সময় আগে মাথাপিছু ঋণ ছিল এর অর্ধেকেরও কম।

সরকারি খাতেই ঋণ বেড়েছে বেশি

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি সরকারি খাত। মার্চে সরকারি খাতের বিদেশি ঋণ ছিল ৯০ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার, যা জুনে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে।

অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ সামান্য কমেছে। মার্চে এ খাতের ঋণ ছিল ২০ বিলিয়ন ডলার, যা জুনে নেমে এসেছে ১৯ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) বিভিন্ন বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে সরকার প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পেয়েছে।

ঋণ নয়, উদ্বেগের কারণ পরিশোধের সক্ষমতা

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি ঋণের পরিমাণ বাড়লেই তা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে না। ঋণের অর্থ যদি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হয় এবং সেখান থেকে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সুফল ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় আসে, তাহলে সেই ঋণ উন্নয়নের সহায়ক হতে পারে।

কিন্তু ঋণের অর্থ থেকে পর্যাপ্ত আয় না এলে মূলধন ও সুদ পরিশোধের চাপ বাড়ে। এতে সরকারি ব্যয়ের অন্য খাতে অর্থ বরাদ্দ কমে যেতে পারে এবং ভবিষ্যতে ঋণসংকটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান নিউ এজকে বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, কম কর-রাজস্ব এবং ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিশোধের চাপের মধ্যে বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধির বিষয়টি উদ্বেগজনক।

তাঁর মতে, মূল প্রশ্ন হলো—ঋণের অর্থ থেকে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সুফল ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে কি না, যাতে নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয়।

তিনি সহজ শর্তের ঋণকে অগ্রাধিকার দেওয়া, কম সুফলদায়ক প্রকল্প এড়ানো, সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা বাড়ানো, কর আদায় শক্তিশালী করা এবং রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার পরামর্শ দেন।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনও মনে করেন, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হলে বিদেশি ঋণ নিজে থেকে ক্ষতিকর নয়। তবে রপ্তানি আয়ের দুর্বলতা ও পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহ করতে না পারায় বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমেছে।

তিনি বলেন, সামগ্রিক ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যা থেকে আসন্ন খেলাপি পরিস্থিতির ইঙ্গিত মেলে। তবে আগের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকা কিছু প্রকল্পে অতিরিক্ত বিদেশি ঋণ নেওয়ার কারণে এমন দায় তৈরি হয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগের সুফল দিয়ে যথাযথভাবে সামাল দেওয়া কঠিন।

জাহিদ হোসেন সতর্ক করে বলেন, একই ধরনের চর্চা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ঋণের ফাঁদে পড়তে পারে।

২০০৯ সালে ঋণ ছিল ২৩.৫ বিলিয়ন ডলার

বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ২০০৯ সালে ছিল ২৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন সরকারি ব্যয় মেটাতে ঋণ নেওয়ার ফলে ২০২৩ সালের মধ্যে তা ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।

তবে কিছু প্রকল্পে বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রত্যাশার তুলনায় কম আর্থিক সুফল পাওয়ায় এসব বিনিয়োগের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনো প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা যাচাই না করে ঋণ নেওয়া হলে ভবিষ্যতে সেই ঋণের বোঝা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।

তিন বছরে ঋণ পরিশোধে লাগবে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে রেকর্ড ৪ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। আগের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে এ ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার।

সরকারের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ আরও বাড়বে।

  • ২০২৬-২৭ অর্থবছরে: ৫ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার
  • ২০২৭-২৮ অর্থবছরে: ৬ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার
  • ২০২৮-২৯ অর্থবছরে: ৭ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার

অর্থাৎ, প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, এই তিন অর্থবছরেই ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে মোট ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হতে পারে।

ঋণ পরিশোধের অর্থ আসে মূলত বৈদেশিক মুদ্রায়। ফলে রপ্তানি আয় ও অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ পর্যাপ্ত না বাড়লে ঋণদাতাদের অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।

বেশি সুদের ঋণে বাড়ছে ঝুঁকি

সহজ শর্তের ঋণের তুলনায় বাণিজ্যিক বা কঠিন শর্তের ঋণে সাধারণত সুদের হার বেশি এবং পরিশোধের সময়সীমা কম থাকে। ফলে এসব ঋণের ক্ষেত্রে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে পরিশোধের চাপ বেশি হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টাকার অবমূল্যায়নের ঝুঁকি। ডলারে নেওয়া ঋণ পরিশোধের সময় ডলারের বিপরীতে টাকার দর কমে গেলে একই পরিমাণ ডলার কিনতে সরকারকে বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়।

এ কারণে ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি ঋণের শর্ত, সুদের হার, মেয়াদ এবং সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি

বৈদেশিক ঋণের চাপের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহেও বড় ঘাটতি রয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা, যেখানে বাজেট লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম হয়েছে।

অন্যদিকে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে উন্নয়ন ব্যয় ও অন্যান্য সরকারি খরচ মেটাতে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়ানোর চ্যালেঞ্জও বড় হয়েছে।

সরকারের ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নেওয়া বকেয়া ঋণ ইতোমধ্যে প্রায় ৬ লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ব্যাংকগুলো সরকারি ঋণপত্রে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। এতে ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আমদানি ঋণেও কিছুটা কমতি

ব্যবসায়ীদের আমদানি ব্যয় মেটাতে ব্যবহৃত স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ ‘বায়ার্স ক্রেডিট’-এর পরিমাণ অবশ্য কিছুটা কমেছে। মার্চে এ ধরনের ঋণ ছিল ৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার, যা জুনে কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে।

তবে সামগ্রিক বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি, ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং রাজস্ব ও রপ্তানি আয়ের সীমাবদ্ধতা মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই চাপ সামাল দিতে নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা, উৎপাদনশীল প্রকল্পে অর্থায়ন, সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আয়ের উৎস সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

Facebook Comments Box

Posted ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com