রবিবার ৩১ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Ad
x
অধিকাংশ কার্যক্রমই প্রকল্পভিত্তিক

ঢিলেঢালা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো

মঙ্গলবার, ২৬ আগস্ট ২০২৫   প্রিন্ট   ৩৫২ বার পঠিত

ঢিলেঢালা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র (বিবিএস) প্রধান কাজ দেশের আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রের নির্ভরযোগ্য এবং সময়োপযোগী পরিসংখ্যান সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং প্রকাশ করা। এই সংস্থাটি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, গবেষণা, এবং নীতি নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে। এছাড়াও বিবিএস জনশুমারি, কৃষি শুমারি, অর্থনৈতিক শুমারিসহ বিভিন্ন শুমারি ও জরিপ পরিচালনা করে থাকে। তবে প্রায়শই অভিযোগ ওঠে বিবিএস-এর ঢিলেঢালা কাজ নিয়ে।

কার্যালয়ের কম্পিউটার বিভাগ থেকে জানা যায়, ৮টি উইংয়ে বিবিএস’র কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সেসব উইংয়ের আওতায় অন্যান্য প্রায় ৪০ উপশাখা জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোতে বর্তমানে দুই হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছে। ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছে ৫শ’র বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী, বাকি দেড় হাজারের বেশি দেশের বিভিন্ন উপজেলায় নিয়োজিত। কর্মযজ্ঞ অনুয়ায়ী চার হাজারের বেশি জনবল প্রয়োজন হলেও সংকট প্রায় অর্ধেক। তবে জনবল অর্ধেক হলেও কার্যক্রম পরিচালনায় তেমন সমস্যা হয় না কারণ বিবিএস-এর অধিকাংশ কার্যক্রম প্রকল্পভিত্তিক। পরিসংখ্যান ব্যুরো’র প্রধান কার্যক্রম কৃষিভিত্তিক। বাংলাদেশে প্রায় ১শ ৪৫ ধরণের শস্য উৎপাদনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে জড়িত পরিসংখ্যান ব্যুরো। বাকি তথ্য সংগ্রহ নির্ভর করে চলামান প্রকল্পের ওপরে। বাজেটের প্রায় ৯৫ ভাগ আসে সরকারিভাবে এবং বাকি ৫ শতাংশের মত আসে বিদেশি সাহায্য সংস্থা থেকে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিরুদ্ধে প্রায়ই কাজের গুণগত মান এবং সময়মতো ডেটা সরবরাহের ক্ষেত্রে ঢিলেমির অভিযোগ ওঠে। বিবিএস দেশের প্রধান জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা হিসেবে বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক সূচক সম্পর্কিত ডেটা সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও প্রকাশ করে থাকে। তবে প্রায়শই ডেটার গুণমান, ডেটা সংগ্রহে বিলম্ব এবং ডেটা সরবরাহে ঘাটতি দেখা যায়, যা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা এবং নীতি-নির্ধারণে সমস্যার সৃষ্টি করে বিশেষ করে, জনশুমারি ও অর্থনৈতিক শুমারির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে প্রায়ই সময়মতো ডেটা প্রকাশে ব্যর্থতা দেখা যায়। এ প্রসঙ্গে মন্তব্য চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিচালক বলেন, প্রকল্পভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এ ধরণের গ্যাপ থাকাটাই স্বাভাবিক কারণ আমরা একটা প্রজেক্ট প্রপোজাল সরকারের কাছে জমা দিই। সেটা যাচাই-বাছাই হয়ে আসতে সময় লাগে। অনেক সময় ২/৩ বছরেরও বেশি সময় লাগে। তাহলে ইতিমধ্যেই তো ওই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির তথ্য গ্যাপ হয়ে যায়। এজন্যই তো পরিসংখ্যান ব্যুরোকে কমিশন করার প্রস্তাবনা দেওয়া হচ্ছে। তাহলে নিজের অর্থায়নে যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ খাত সেসব খাতে প্রকল্প অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না এবং তথ্য গ্যাপও থাকবে না। এ বিষয়ে ফাইন্যান্সিয়াল, এডমিনিস্ট্রেশন ও এমআইএস পরিচালক এইচ এম ফিরোজের সঙ্গে কথা হলে তিনি কোন মন্তব্য করতে চাননি। বর্তমানে চলমান সবচেয়ে বড় প্রকল্প ‘ইকোনোমিক সেন্সাস’ সম্পর্কে জানার জন্য প্রকল্প পরিচালক জনাব দীপংকরকে ফোন করলে তিনি ফোন ধরেননি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র (বিবিএস) ওয়েবসাইটে দেখা যায় অধিকাংশ তথ্য ৩/৪ বছরের আগের। ডকুমেন্টেশনে ‘পপুলেশন এন্ড মাইগ্রেশন’, ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড’, ‘ক্রপ’, ‘ফিসারিজ’ ও ‘হেল্থ’ বিষয়ে কার্যক্রমের তথ্য ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের আপডেট করা। পরবর্তীতে ডকুমেন্টেশনে কাজ হয়েছে কিনা তা জানা যায়নি। ওয়েবসাইটের ‘নিউজ’ সেকশনে গেলে ২০২২ সালের জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস সম্পর্কিত একটি মাত্র খবরই পাওয়া গেল।

ইতিবাচক ঊর্ধ্বতন মহল:
তবে ঊর্ধ্বতন মহল বেশ ইতিবাচকভাবেই সামনে এগিয়ে যাবার ব্যাপারে আশাবাদী। সচিব (পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ) আলেয়া আক্তার বলেন, আমরা চেষ্টা করছি পরিসংখ্যান ব্যুরোকে আরও আধুনিক করার। শুধু কমিশন করলেই যে সব সমস্যা কেটে যাবে আমি তা মনে করি না কারণ উন্নত দেশগুলো কীভাবে কাজ করে তা আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। আমাদের অনেক কিছুতেই সংস্কার দরকার। পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গে অর্থ বিভাগের একটা লিয়াজোঁও খুব দরকার। আমি সম্প্রতি কোরিয়াতে দেখলাম ওরা কীভাবে কাজ করে। আমাদের এ বিষয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে দেওয়া হয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে। কমিটির রিপোর্ট আমরা এ মাসের শেষেই পেয়ে যাবো। আশা করি সে অনুযায়ী এগুতে পারলে ভবিষ্যতে আরও ভাল ফল পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানও একই মত দিলেন। তিনি বলেন, টাস্কফোর্সের রিপোর্ট পেলে পরিসংখ্যান ব্যুরো’র গতি আরও বাড়বে বলে মনে করি। আমার যেটুকু ধারণা তাতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কমিশনের মতই পরিবেশ পেতে যাচ্ছে। আশা করি সংশ্লিষ্ট সবাই সন্তুষ্ট হবেন ভবিষ্যতে।

বিবিএসকে স্বাধীন কমিশনে রূপান্তরের পক্ষে বিপুল সমর্থন:
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রতিষ্ঠানটিকে স্বাধীন পরিসংখ্যান কমিশন হিসেবে দেখতে চান। চারটি বড় সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত বিবিএস কর্মকর্তা–কর্মচারী ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই দাবি তোলা হয়। সংগঠনগুলোর সম্মিলিত জনবল বিবিএসের মোট কর্মীর প্রায় ৯৬ শতাংশ যা স্পষ্টতই ব্যাপক সমর্থনের ইঙ্গিত দেয়।

টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান জানান, পরিসংখ্যানের গুণগত মান ও স্বচ্ছতা উন্নয়নের লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়নে কাজ করছে একটি বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স। আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে প্রস্তাবনা জমা দেওয়া হবে। এর মধ্যে স্বাধীন পরিসংখ্যান কমিশন গঠনের রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তিনি বলেন, প্রক্রিয়া, কাঠামো এবং সম্ভাব্য সুবিধাসহ বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে সুপারিশ চূড়ান্ত করা হবে।

বিবিএসের মোট অনুমোদিত জনবল ৪ হাজার ৩৫৮ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংগঠন বিবিএস কর্মচারী কেন্দ্রীয় পরিষদে রয়েছেন ৩,৭৭৪ জন, যা মোট জনবলের প্রায় ৮৬ শতাংশ। এছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণির অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সংখ্যা ১২৪, আইটি অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনে ২৯ এবং নন- ক্যাডার অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনে ২৬১ জন। চারটি সংগঠন মিলেই ৯৬.১৫ শতাংশ কর্মীর প্রতিনিধিত্ব করে।

অধিকাংশ কর্মী মনে করেন, স্বাধীন কমিশন হলে তথ্য ব্যবস্থাপনা হবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। তাদের মতে, অন্তবর্তীকালীন সরকারের সুশাসন প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ জরুরি। এর আগে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন শ্বেতপত্র কমিটি ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনও এ বিষয়ে সুপারিশ করেছে। শ্বেতপত্র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তথ্যের অখণ্ডতা নিশ্চিত করতে বিবিএসকে রাষ্ট্রপতির অধীনে সরাসরি প্রতিবেদনকারী কমিশনে রূপান্তরের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে জাতীয় সংসদের কাছে জবাবদিহি করবে এমন একটি স্বশাসিত কমিশনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেখানে ক্যাডার সার্ভিসের বিধান থাকবে না।

ঐক্য পরিষদের এক নেতা মন্তব্য করেন, এই কমিশন গঠিত হলে সরকারের নীতি, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন মূল্যায়ন আরও শক্তিশালী হবে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। এজন্য তিনি দ্রুত আইন বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রক্রিয়া শুরু করার আহ্বান জানান।

 

Facebook Comments Box

Posted ০১:৫২ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৬ আগস্ট ২০২৫

bankbimaarthonity.com |

আর্কাইভ ক্য

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১৩১৫
১৬১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭
৩০৩১  
সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com