|

Advertisement
×

সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারে ভোক্তার নাভিশ্বাস

রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫   প্রিন্ট   ২৮৩ বার পঠিত

সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারে ভোক্তার নাভিশ্বাস

সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারে গিয়ে ভোক্তার নাভিশ্বাস উঠছে। নিত্যপণ্যের বাজারে নেই স্বস্তি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, আগস্ট মাসে দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৮.২৯ শতাংশে। এটি গত তিন বছরে সবচেয়ে কম হার। তবে এর মানে এই নয় যে, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমেছে।

বরং উল্টো, খাবার-দাবারের ক্ষেত্রে দাম আরো বেড়েছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, শুধু খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেই মূল্যস্ফীতি এখন ৭.৬০ শতাংশ, যা আগের মাসে দশমিক ০৪ পয়েন্ট কম ছিল। চাল, ডাল, ডিম, মুরগি, পেঁয়াজের মতো প্রতিদিনের খাদ্যপণ্য কিনতে ক্রেতাদের আগের চেয়ে বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। কিন্তু একই সময় খাদ্যবহির্ভূত খাতের কিছু জিনিস যেমন পোশাক, টেলিযোগাযোগ খরচ, কিছু ভোগ্যপণ্য বা সেবার দাম কিছুটা কমেছে। এর ফলেই গড় হিসাবে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমে এসেছে। ফলে সরকারি পরিসংখ্যান ইতিবাচক হলেও ভোক্তার জীবনে সেই স্বস্তি আসছে না।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজারের বাস্তবতা আর সরকারি পরিসংখ্যানে আশার খবরের বৈপরীত্য ভোক্তার অসহায়ত্বই প্রকাশ করছে।
এদিকে মূল্যস্ফীতির হার ভোক্তার জন্য সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনতে প্রধান তিনটি চ্যালেঞ্জ শনাক্ত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে আছে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করা। এগুলো নিয়ন্ত্রণে থাকলে মূল্যস্ফীতির হারও প্রত্যাশিত মাত্রায় নেমে আসবে বলে আশাবাদী কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অর্থনীতির চলমান বাস্তবতায় দেশে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ৩ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে থাকলে তা ভোক্তাদের কাছে সহনীয়। কিন্তু বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। যা সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ থেকে ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি। মূল্যস্ফীতির হার সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনতে কমপক্ষে ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ কমাতে হবে।

রাজধানীর ভিভিন্ন বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, মোটা চালের কেজি ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, মাঝারি চাল ৭০ থেকে ৭৫ টাকা, আর মিনিকেট বা নাজিরশাইল বিক্রি হচ্ছে ৮৫ টাকার কাছাকাছি। এক ডজন ডিমের দাম ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৬৫ থেকে ১৮৫ টাকা, পেঁয়াজ ৮০ থেকে ৮৫ টাকা কেজি, রসুন ১৫০ থেকে ২০০ টাকার ওপরে। সবজির দামও বেশ চড়াÑ কাঁচা মরিচ ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কেজি, টমেটো ১৫০ টাকার ওপরে।

ক্রেতাদের অভিযোগ, মাসের শুরুতে বেতন হাতে পেলেই অর্ধেক খরচ বাজারে শেষ হয়ে যায়। খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী হোসনেয়ারা বেগম বলেন, প্রতিদিনের বাজারে আগের তুলনায় অন্তত এক হাজার টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। অথচ বেতন বাড়েনি।
অন্যদিকে বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজারে দাম না কমলে খুচরা বাজারে দাম কমানো সম্ভব নয়। আবার আমদানিনির্ভর পণ্যে ডলার রেট স্থিতিশীল হওয়ায় নতুন করে দাম বাড়েনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতির হার ভোক্তার সহনীয় মাত্রা অর্থাৎ ৩ থেকে ৪ শতাংশের ওপরে আছে। ২০২২ সালের আগস্টে এ হার সাড়ে ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। এরপর থেকে সামান্য নামলেও বেশির ভাগ সময়ই ছিল ৯ শতাংশের ওপরে। গত বছরের জুলাইয়ে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে ওঠে। এরপর থেকে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানামুখী পদক্ষেপের ফলে মূল্যস্ফীতির হার কমতে থাকে। গত আগস্টে তা ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে নেমেছে। যা সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ থেকে ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ চলমান মূল্যস্ফীতির হার সহনীয় মাত্রার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি।

সহনীয় মাত্রায় মূল্যস্ফীতির হার নামাতে আরও কমপক্ষে ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ কমাতে হবে। এই হার নামিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। চ্যালেঞ্জ তিনটি নিয়ন্ত্রণে থাকলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। ইতিমধ্যে বিদেশি বিনিয়োগ আসার ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে ডলারের প্রবাহ বাড়বে। এতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিজনিত আমদানি ব্যয় সামাল দিতে গেলেও বিনিময় হারের ক্ষেত্রে বাড়তি কোনো চাপ তৈরি হবে না। বিপরীতে বাড়বে কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ড হবে গতিশীল। তখন মূল্যস্ফীতির হার কমবে। আর ওই তিন চ্যালেঞ্জের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালে কোনো খাতেই সফলতা আসবে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে হবে। তা হলে মুদ্রানীতি শিথিল করা যাবে। অন্যথায় মুদ্রানীতি শিথিল করলে আবার ঋণপ্রবাহ বাড়বে। একই সঙ্গে বাড়বে আমদানি ব্যয়ও। তখন বিনিময় হার অস্থির হয়ে উঠলে মূল্যস্ফীতির হারে চাপ বাড়বে।

রিপোর্টে বলা হয়, সম্ভাব্য রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল থাকে। তখন এতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করবে। কাজেই সবকিছু নির্ভর করছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ফলে মূল্যস্ফীতির হার বার্ষিক তিন থেকে চার শতাংশের মধ্যে গ্রহণযোগ্য স্তরে নেমে আসলে নীতিগত সুদের হার এমনভাবে কমানো হবে যাতে প্রকৃত নীতিগত সুদ বার্ষিক দুই থেকে তিন শতাংশের মধ্যে থাকবে। তখন একটি কার্যকর হবে। বাজারে ঋণের সুদের হারও কমে যাবে। এতে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়বে। সার্বিক অর্থনীতি গতিশীল হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে মূল্যস্ফীতির হার কমানো অত্যন্ত জরুরি। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে দেশে চড়া মূল্যস্ফীতির বৃত্তে আটকে আছে। এটা কমিয়ে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হলে অর্থনীতিতে বহুমুখী সুফল মিলবে। স্বল্প আয়ের মানুষের দুর্ভোগ কমানো যাবে, ভোক্তার মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার নিম্নপর্যায়ে বজায় রাখার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর আস্থা জন্ম নেবে। নিম্ন এবং স্থিতিশীল মূল্যস্ফীতি শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ভোক্তার জীবনযাত্রায় খাদ্যপণ্যের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। একটি পরিবারের মাসিক ব্যয়ের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই যায় খাবার কেনার পেছনে। তাই খাদ্যদ্রব্যের দাম না কমলে পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমলেও সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, খাদ্য খাতের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে মানুষের দুর্ভোগ কমবে না। পরিসংখ্যানে ইনফ্লেশন কমলেও বাস্তবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে।

তিনি মনে করেন, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা জরুরি। পাইকারি পর্যায়ে মনোপলি ভাঙা, খাদ্য আমদানিতে শুল্ক কমানো এবং কৃষিপণ্যের সরাসরি বিপণন চ্যানেল শক্তিশালী করতে হবে। না হলে খাদ্যদ্রব্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকবেই।

 

Facebook Comments Box

Posted ০৪:২০ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com