রজত রায়
রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬ প্রিন্ট ১১৯ বার পঠিত
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যুগে পরিবহন, জাহাজ চলাচল, যোগাযোগ এবং বাণিজ্য উদারীকরণের অগ্রগতির ফলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে তরান্বিত হয়। কোকা-কোলা, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস কর্পোরেশন (আইবিএম) এবং ম্যাকডোনাল্ডসের মতো বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডের উত্থান বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান নাগাল এবং প্রভাব প্রদর্শন করে। এই বৈশ্বিক সত্তাগুলোর সীমান্ত পেরিয়ে অর্থনীতি, শিল্প এবং সমাজ গঠনের ক্ষমতা ছিল, যা তাদেরকে আধুনিক বিশ্বে গণ্য করার মত একটি শক্তিতে পরিণত করেছিল। সমালোচকদের কাছে মনে হয়েছিল যে, ইউরোপের সেনাবাহিনী তাদের উপনিবেশ সরে যাওয়ার সাথে সাথে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের স্থান দখল করতে এগিয়ে এসেছে।
বহুজাতিক কোম্পানি হলো সেই সব কর্পোরেশন যাদের আবাসস্থল এক দেশে কিন্তু তারা বিভিন্ন দেশে কাজ করে এবং টিকে থাকে। পরিবহণ, যোগাযোগ এবং প্রযুক্তির অসাধারণ এবং বিশাল বিকাশের কারণে দেশগুলোর মধ্যে দূরত্ব আগের চেয়ে কম হয়ে গেছে এবং তাদের মধ্যে ভৌগলিক বাধাগুলো কার্যত শেষ এবং অদৃশ্য হয়ে গেছে। দূরত্ব এবং সর্বনিম্ন বাধাগুলোর এই হ্রাসের ফলে দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ব্যবসায়িক সংগঠনের একটি মেগা রূপ। মহাদেশ বিস্তৃত এবং অনেক দেশের বার্ষিক আয়ের চেয়ে ও বেশি সম্পদ সংগ্রহের ক্ষমতাসম্পন্ন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো লক্ষ লক্ষ মানুষের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উন্নয়ন চালাতে পারে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুবিধার জন্য প্রশংসা পেয়েছে এবং তথাকথিত ‘আয়োজক’ দেশগুলোর উপর অযৌক্তিক প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনার জন্য সমালোচনা পেয়েছে যে দেশগুলোতে তাদের সহায়ক সংস্থাগুলো তাদের কর্পোরেট হাউস স্থাপন করে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং অন্যান্য অর্থনীতিবিদরা সাধারণত বিশ্বব্যাপী উন্নয়নে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ইতিবাচক অবদানকে কৃতিত্ব দেন। কিন্তু কারণটা কি? সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ করার ক্ষমতা , যা অর্থনীতিতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মূলধন, প্রযুক্তি এবং দক্ষতা প্রবেশ করাতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের তথ্য মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মোট এফডিআই প্রবাহ ছিল ১ দশমিক ৩৭ ট্রিলিয়ন ডলার। সাধারণত অর্থনীতিবিদরা নির্দিষ্ট দেশগুলোর জন্য বিনিয়োগ প্রবাহ বিশ্লেষণ করে দেখেন যে, বহুজাতিক কোম্পানি এবং অন্যান্যরা কোন ও দেশকে বিনিয়োগের জন্য একটি ভালো জায়গা খুঁজে পাচ্ছে কিনা। একটি দেশে যত বেশি এফডিআই আসবে, তত বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং তত বেশি কর আদায় করা যাবে।
কেন একটি ব্যবসা বহুজাতিক কোম্পানি হতে চায়? সাধারণত একটি ব্যবসার প্রাথমিক লক্ষ্য হলো মুনাফা এবং প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি করা। যদি এটি বিশ্বব্যাপী গ্রাহক বেস বৃদ্ধি করতে পারে এবং বিদেশে তার বাজার অংশীদারীত্ব বৃদ্ধি করতে পারে, তবে এটি বিশ্বাস করতে পারে যে বিদেশে অফিস খোলা ব্যয় এবং প্রতিষ্ঠার যোগ্য। কোম্পানিগুলো বিদেশে পাওয়া কিছু কর কাঠামো বা নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা থেকে উপকৃত হতে পারে। কোম্পানিগুলো লবিং প্রচেষ্টা এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে বাণিজ্য নীতিগুলোকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তারা তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের পক্ষে বাণিজ্য চুক্তি এবং নিয়মকানুনগুলোর পক্ষে কথা বলে, প্রায়শই শুল্ক হ্রাস, বাজারে প্রবেশাধিকার উন্নত এবং বৌদ্বিক সম্পত্তির অধিকার রক্ষার জন্য নীতি গঠনের সহায়তা করে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের অর্থনৈতিক শক্তিকে সরকারের সাথে অনুকুল শর্তাবলী নিয়ে আলোচনা করার জন্য কাজে লাগায়, আন্তর্জাাতিক বাণিজ্যকে প্রভাবিত করে তাদের প্রবৃদ্ধির জন্য অনুকুল পরিবেশ অর্জন করে। গুগল কিংবা অ্যামাজনের মতো টেক জায়ান্ট কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ মুনাফা নিয়ে যাচ্ছে তার বিপরীতে সরকারি কোষাগারে যথাযথ রাজস্ব কি প্রদান করছে?
হ্যাঁ, কর আমাদের দিতেই হয়। তবে বহুজাতিক টেক জায়ান্টের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। তারা বিভিন্ন দেশে ব্যবসা করছে। আয় করছে, কিন্তু কর দিতে হচ্ছে না। যেমন করোনা মহামারির বছরে অ্যালফাবেট প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ কোটি টাকা আয় করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। এই টাকা বাংলাদেশের প্রায় তিনটি বাজেটের ব্যয়ের সমান। বাংলাদেশ থেকেও আয় করেছে অ্যালফাবেট। আমরা কি সকলেই অ্যালফাবেটকে চিনি? তবে অ্যালফাবেটের সেবা নিচ্ছি আমরা। যে ইউটিউবে ভিডিও দেখি, সেটির মালিক অ্যালফাবেট। যে গুগলের ম্যাপ দেখে উবার ডাকি, সেটার মালিক ও অ্যালফাবেট। সোজা কথায় গুগল ইউটিউবের মূল কোম্পানি হলো অ্যালফাবেট। শুধু অ্যালফাবেট নয়, ফেসবুক, ইয়াহু, নেটফ্লিক্স, অ্যামাজান এই টেক জায়ান্টরা সুদূরে বসে এ দেশের মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যাচ্ছে, এ দেশে তাদের সেবা আসছে, এ দেশ থেকে তারা বিজ্ঞাপনের বিল নিচ্ছে, কিন্তু এ দেশকে কোনো আয়কর দিচ্ছে না।
বিশ্বায়নের যুগে কখনো বড় কোম্পানিকে বাধা দিয়ে রাখা যাবে না। ক্রেতাদের ও ভোগ্যপণ্য ব্যবহারের মানসিকতায় পরিবর্তন আসছে। এক্ষেত্রে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে প্রতিযোগিতা করার একমাত্র উপায় হচ্ছে ছোট ছোট কোম্পানিগুলো কীভাবে আর ও বেশি সক্ষম হয়ে উঠতে পারে, সেদিকে মনোযোগ দেয়া দরকার। বিশ্বায়নের এই যুগে প্রতিযোগিতা যত বেশি হবে যারা দুর্বল বা অদক্ষ, তাদের মার্কেট থেকে একসময় বেড়িয়ে যেতে হবে। যারা টিকে থাকবে, তাদের দক্ষতা বাড়াতে প্রযুক্তি সক্ষমতা বাড়াতে হবে, তারাই জায়ান্টদের সাথে প্রতিযোগিতা করে মার্কেটে টিকে থাকবে। বাংলাদেশেও কোন কোন কোম্পানি বিশ্বের বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে যাচ্ছে। একসময় রেফ্রিজারেটরের মার্কেট বিদেশি কোম্পানির দখলে থাকলেও এখন বাংলাদেশি কোম্পানি কিন্তু এটার বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। ফলে দক্ষতা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা বাড়িয়ে ছোট কোম্পানি ও ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারে।
অনেক দেশ বাণিজ্য বাধা হ্রাস করে, মূলধন প্রবাহের উপর বিধিনিষেধ শিথিল করে এবং আরও অনুকুল বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করে তাদের অর্থনীতি বিদেশি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করেছে। যোগাযোগ ও পরিবহনের উন্নতির ফলে কোম্পানিগুলোর জন্য সীমান্ত পেরিয়ে কাজ করা এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল পরিচালনা করা সহজ হয়েছে। বাংলাদেশে বিদেশি কর্পোরেট বিনিয়োগের কি কি ইতিবাচক দিক অর্জন সম্ভব? কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধি ইত্যাদি। বহুজাতিক কোম্পানি যে দেশে ব্যবসা করে সে দেশের কাঁচামাল ব্যবহার করে, সে দেশের মানুষের কর্মসংস্থান করে, সে দেশের বাজারে পণ্য বিক্রি করে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসছে, তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা আছে।
এ সব কোম্পানি তাদের বিশাল পুঁজির সুবিধা নিয়ে প্রয়োজনে বাজারমূল্যের চেয়ে কম মূল্যে পণ্য বিক্রি করে বাজার দখল করছে। একটা সময় ক্রেতা তাদের পণ্যে অনুগত হয়ে পড়লে, যাকে আমরা ব্র্যান্ড আনুগত্য বলি, পণ্যের মূল্য স্বাভাবিকের চেয়েও বেড়ে যায়। এতে স্থানীয় কোম্পানিগুলো বাজারে সুবিধা করতে পারে না। তারা তাদের স্বাভাবিক ভোক্তা বাজারও হারায়। ২০২১ সালে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হলো সবচেয়ে বেশি বহুজাতিক কর্পোরেশনের দেশ, যার সংখ্যা ৭১৯টি। এটি বিশ্বব্যাপী মোট বহুজাতিক কোম্পানির শতকরা ৩৩ ভাগ যাদের সদর দপ্তর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত। তারপর জাপান রয়েছে যেখানে ২৬৪টি বহুজাতিক কোম্পানি শতকরা ১২ ভাগ, চীন ২১৯ টি কোম্পানি শতকরা ১০ ভাগ, যুক্তরাজ্য ১১৮টি কোম্পানি শতকরা ৫ ভাগ এবং ভারত ৮১টি কোম্পানি শতকরা ৪ ভাগ।
বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের মুনাফা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে না। দেশিয় কোম্পানির লাভ দেশে থাকে। বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। বহুজাতিক কোম্পানির একচেটিয়া আধিপত্যে সর্বস্বান্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয় দেশিয় ব্যবসায়ীরা। অর্থনীতি হলো একটি রাষ্ট্রের উন্নতি ও অবনতির মাপকাঠি। প্রত্যেক রাষ্ট্রের একটি অর্থনৈতিক অবস্থা বিদ্যমান, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের অর্থ সংক্রান্ত বিষয়গুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং সেই সাথে দেশিয় প্রবৃদ্ধিকে হরণ করে।
পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রচুর পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে। তারা ক্রমাগত হারে তৃতীয় বিশ্বের অর্থনৈতিক সম্পদ কুক্ষিগত করে। বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত প্রতিবেদন মোতাবেক খাদ্য, পানীয়, কৃষি, কাঁচামাল, খনিজ দ্রব্য ইত্যাদি রপ্তানিতে ৮০ থেকে ৯০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে ৩ থেকে ৬টি বৃহৎ বহুজাতিক সংস্থা। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বাণিজ্যিক তৎপরতায় উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে প্রতি বছর ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় নিয়ে যাচ্ছে।
বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে সাধারণত মুনাফার ওপর শতকরা ২২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শতকরা ৪৫ ভাগ হারে কর্পোরেট কর প্রদান করে। এছাড়া শতকরা ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়। কিছু বহুজাতিক কোম্পানি, বিশেষ করে টেক জায়ান্টরা, তাদের মুনাফার একটি অংশ বিদেশে স্থানান্তরের মাধ্যমে কর ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এটি ‘‘ট্রান্সফার প্রাইসিং’’ নামে পরিচিত। এই প্রক্রিয়ায় কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের দাম কম বা বেশি দেখিয়ে বা মুনাফার অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য দিয়ে কর ফাঁকি দেয়। আবার, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সরকারের পক্ষ থেকে কর ছাড় ও বিভিন্ন প্রণোদনা দেয়ার পরও অনেক কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি হচ্ছে না। অথচ, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো জনগণের কাছ থেকে ব্যবসা করে মুনাফা করে।
বহুজাতিক কোম্পানিগুলো স্থানীয় শিল্পের জন্য হুমকিস্বরূপ। ফলস্বরূপ, আয়োজক দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই বহুজাতিক কোম্পানির উত্থান থেকে বাঁচতে হলে দেশিয় শিল্প ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে।
লেখক – অর্থনীতি বিশ্লেষক
ই-মেইল-pkroyrajat2016@gmail.com
Posted ০৩:৩৩ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: ই-মেইল: bankbima1@gmail.com