কামারুন-নাহার-মুকুল
সোমবার, ০১ জুন ২০২৬ প্রিন্ট ২২ বার পঠিত
বাংলাদেশের বীমা সেক্টরের অন্যতম ব্যক্তিত্ব সাফাত আহমদ চৌধুরীর ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। এই বীমা ব্যক্তিত্ব ও সমাজসেবক ২০০৭ সালের ১ জুন ইন্তেকাল করেন। তিনি ক্ষুদ্র বীমার প্রবর্তক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন।
সাফাত আহমদ চৌধুরী ১৯৩২ সালের ১ আগস্ট সিলেটের গোপালগঞ্জ উপজেলার ভাদেশ্বর ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন। ১৩ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। তারা বাবা ছিলেন অবিভক্ত ভারতবর্ষের আসাম সিভিল সার্ভিসের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা ।
সাফাত আহমদ চৌধুরী সিলেটের এমসি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে। ১৯৫২ সালে রাস্ট্রভাষা আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন তিনি। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ‘বইপড়া’ কর্মসূচির শুরু থেকেই পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ১৯৫৬ সালে তিনি এমএসসি পাস করার পরে রাজশাহী সরকারি কলেজের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদে পরিসংখ্যান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। কিছুদিন পরে চাকরি ছেড়ে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। সেটাও ছেড়ে দেন তিনি।
১৯৬৩ সালে লন্ডনের বিশ্বখ্যাত ঈগল স্টার ইন্স্যুরেন্স কোং এবং প্রোডেনশিয়াল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল বিভাগে ট্রেইনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তিনি অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল সাইন্সে পড়াশুনা শুরু বরেন। যুক্তরাজ্যের ইনস্টিটিউট অব অ্যাকচ্যুয়ারিজ থেকে তিনি ফেলো ইনষ্টিটিউট অব অ্যাকচ্যুয়ারি (এফআইএ) ডিগ্রি নেন। তিনিই অ্যাকচ্যুয়ারির ওপর দেশের প্রথম উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনকারী ব্যক্তি। ১৯৬৮ সালে দেশে ফিরে তিনি ইস্টার্ন ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল হিসেবে যোগ দেন।
দেশ স্বাধীনের পর তিনি বীমা অধিদপ্তরের প্রথম প্রধান বীমা নিয়ন্ত্রক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। সে সময়ে তিনি জীবনবীমা করপোরেশনের অ্যাকচ্যুয়ারি ও অ্যাডভাইজার হিসেবে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন। বীমা অধিদপ্তরে কয়েক বছর চাকরি করার পর তিনি ১৯৭৬ সালে কাজের নেশায় কুয়েতে চলে যান। কিন্তু মন পড়ে থাকে দেশে। সেখানে গালফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীতে টানা ৯ বছর অ্যাকচ্যুয়ারি হিসেবে চাকরি করার পর ১৯৮৫ সালে দেশে ফিরে গড়ে তোলেন তার স্বপ্নের বীমা সাম্রাজ্য। সে বছরই সরকার বেসরকারি খাতে বীমা ব্যবসা করার অনুমতি দিলে তার নেতৃত্বে প্রবাসী বাংলাদেশি ও দেশীয় কয়েকজন উদ্যোক্তা নিয়ে গঠিত হয় গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী। একে একে গড়ে ওঠে গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, ডেল্টা মেডিকেল সেন্টার, ডেল্টা হাউজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স করপোরেশনসহ অনেক প্রতিষ্ঠান।
আধুনিক চিন্তার মননশীল সাফাত আহমদ নতুন নতুন কর্মপরিকল্পনায় বীমা খাতকে আরও সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেন। প্রথমেই তিনি গ্রামীণ বীমা নামক একটি প্রকল্প তৈরি করেন। ১৯৮৮ সালে বন্যায় যখন সারাদেশ বিপর্যস্ত তখন দুস্থ, গরিব অসহায় স্বল্পআয়ের মানুষের জন্য ‘ক্ষুদ্র বীমা প্রকল্প’ তার পরিকল্পনায় আসে। গরিব মানুষকে বীমার আওতায় এনে তাদেরকে আর্থিক নিরাপত্তা দিতে শিক্ষিত বেকার ছেলেমেয়েদের নিয়ে শুরু করেন ‘ক্ষুদ্র বীমা’। তার উদ্ভাবিত ‘ক্ষুদ্র বীমা প্রকল্প’টি ব্যাপকভাবে ডেল্টা লাইফে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন কোম্পানি এ প্রকল্পটি গ্রহণ করে বীমাশিল্পকে নবজাগরণের সন্ধান দেয়। তিনিই ক্ষুদ্র বীমার প্রবর্তক। ১৯৯৩ সালে তিনি চালু করেন গণবিমা। একইভাবে দুই বীমা সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।
তিনি বিয়ে করেন ঝিনাইদহের লেখক ও শিক্ষাবিদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর বোন ফেরদৌস আরাকে। এই দম্পতির দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তান। ১৯৮২ সালে একমাত্র পুত্র লন্ডনে মারা যান। এক কন্যা যুক্তরাষ্টের এমআইটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। অন্য কন্যাটি যুক্তরাষ্টের হার্ভ্যার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন।
মানবতার সেবা করা ছিল তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মানবদরদী সাফাত আহমদ কাউকেই খালি হাতে ফেরত দেননি। কন্যাদায়গ্রস্ত এক পিতা মেয়ের বিয়ের জন্য তার কাছে পাঁচশত টাকা চাইতে এলে তিনি লোকটিকে বসিয়ে রেখে সহকর্মীদের কাছে জানতে চাইলেন পাঁচশত টাকায় বিয়ে হয় কিনা? অতঃপর নিজের তহবিল থেকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে দিলেন। তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন ভাসমান জীবনতরী হাসপাতাল।
সাফাত আহমদ চৌধুরী কতটা জনদরদী মানুষ ছিলেন তার প্রমাণ মেলে নব্বই দশকে। মোলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানার ছাতকছড়ায় নূরজাহান নামের একটি মেয়ে দ্বিতীয়বার বিয়ে করে। আর এ বিয়ে শরিয়ত মতে জায়েজ হয়নি বলে এলাকার মাওলনা মান্নানসহ কয়েকজন ফতোয়া দেন। ১৯৯২ সালের ১০ জানুয়ারি ফতোয়াবাজরা মেয়েটিকে গর্তে দাঁড় করিয়ে পাথর ছুড়ে মারেন এবং তার বাবা-মাকে বেত্রাঘাত করাসহ কান ধরে উঠবস করায়। নূরজাহান নিজের অপমানের পাশাপাশি বাবা-মায়ের প্রতি এ অপমান সহ্য করতে না পেরে দৌড়ে গিয়ে বিষ পান করেন। এ ঘটনায় সাফাত আহমদ চৌধুরীর উদ্যোগে ওই বছরই ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স ‘নূরজাহান স্মৃতি পুরস্কার’ চালু করে। যদিও এই পুরস্কার বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
তিনি যা অনুধাবন করতেন তারই বিশ্লেষণ তৈরি করে দিতেন। তিনি বলতেন, প্রচার হবে কর্মের মাধ্যমে। তিনি কর্মের মাধ্যমে যে আদর্শ প্রচার করে গেছেন তা মাইলফলক হিসেবে উজ্জ্বল হয়ে আছে। তিনি চারটি উপদেশ দিতেন (১) তোমার মূল্যায়ন তুমি নিজে করো না, অন্যকে করতে দাও, (২) সবার প্রতি সমান দৃষ্টি রেখো, (৩) মনে আর কর্মে দু’রকম করো না; যা সত্যি তাই মানুষকে বলবে। তাতে সন্তুষ্ট হোক বা না হোক এবং (৪) নিজের কর্মশক্তির প্রতি অবিচল আস্থা রেখো। কারণ তুমি জানো যে কাজটি তুমি করতে পারবে, অন্যের কথায় তা যেন ভেঙে না পড়ে।
তিনি যে আলোকিত মানুষের স্বপ্ন দেখতেন, তার আরেকটি নমুনা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের উন্নতির জন্য তিনি সহযোগিতা করেছেন। বার্ধক্যজনিত কারণে নিজ বাসভনে ১ জুন, ২০০৭ সালে ৭৭ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
ইকনোমিক মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশন ১১ মার্চ, ২০১৯ এই বীমা জাগরণের পথিকৃৎকে গুণীজন সম্মাননা (মরণোত্তর) প্রদান করে। ওই অনুষ্ঠানে তার সম্পর্কে ন্যাশনাল লাইফের এমডি জামাল এম এ নাসের (প্রয়াত) বলেছিলেন, বীমাশিল্পে যদি মহীরূহ থেকে থাকে তবে তিনি সাফাত আহমদ চৌধুরী।
Posted ১২:৩৫ অপরাহ্ণ | সোমবার, ০১ জুন ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
এ বিভাগের আরও খবর
আর্কাইভ ক্য
| শনি | রবি | সোম | মঙ্গল | বুধ | বৃহ | শুক্র |
|---|---|---|---|---|---|---|
| ১ | ২ | ৩ | ৪ | ৫ | ||
| ৭ | ৮ | ৯ | ১০ | ১১ | ১ | |
| ১৩ | ৪ | ১৫ | ১৬ | ১ | ৮ | ১৯ |
| ২০ | ২১ | ২২ | ২৩ | ২৪ | ২৫ | ২৬ |
| ২৭ | ২ | ৯ | ৩০ | |||
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com