মঙ্গলবার ১০ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫ ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

https://www.guardianlife.com.bd/
Ad
x
নোট বদলে বেসরকারি ব্যাংকের স্বদিচ্ছা থাকলেও অনীহা সরকারি ব্যাংকগুলোর

ছেঁড়া টাকা নিয়ে বিড়ম্বনা

সজল সরকার   |   শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   350 বার পঠিত

ছেঁড়া টাকা নিয়ে বিড়ম্বনা

দেশজুড়ে ছেঁড়া, জীর্ণ ও পুরোনো নোট নিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ মানুষ। দৈনন্দিন কেনাকাটা, যানবাহন ভাড়া, বাজার সদাই কিংবা ছোটখাটো লেনদেনে এসব নোট গ্রহণে যেমন অনিচ্ছা দেখাচ্ছেন ব্যবসায়ী ও সেবাদানকারীরা, তেমনি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও নোট বদলে তফসিলি ব্যাংকগুলোর রয়েছে চরম অনীহা। ফলে হাতে টাকা থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ পড়ছে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ। খুচরা দোকান, হকার, বাস ও অটোরিকশা চালকরা ছেঁড়া বা পুরোনো নোট নিতে রাজি হচ্ছেন না। এতে শুধু দিনমজুর, শ্রমজীবী মানুষ ও গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দাদের ভোগান্তিই বাড়ছে না বরং আপামর জনগণই পড়ছে বিপাকে।

অনীহা বেশি সরকারি ব্যাংকের: ব্যাংকে এসব নোট বদলাতে গেলে সমস্যার শেষ নেই। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েকটি সাধারণ সেবা বন্ধ ঘোষণা করে একটি সার্কুলার জারি করে। যেখানে বলা হয়, সেবাদানকারী সব ব্যাংক ও শাখা যেসব সার্ভিস দেবে তার মধ্যে পুরোনো, ছেঁড়া ও অচল নোট বদল করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে (যদিও ছেঁড়া-ফাটা নোট বদলের বাধ্যবাধকতা আগে থেকেই ছিল)। কিন্তু অনেক সরকারী ব্যাংকের অধিকাংশ শাখায়ই মানুষ কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। মতিঝিল, কারওয়ানবাজার, মালিবাগ ও শান্তিনগরে ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় গিয়ে এর সত্যতা মিলেছে। ‘ব্যাংক বীমা অর্থনীতি’র প্রতিবেদক নিজ পরিচয় না দিয়ে সাধারণ গ্রাহক হিসাবে ঢাকার শান্তিনগরে জনতা ব্যাংকের শাখায় যান। সেখানে পরিবর্তনযোগ্য ছেঁড়া একটি ২০ টাকার নোট কাউন্টারে দিলে কর্মকতা তা পরিবর্তন করতে অস্বীকৃতি জানান। পরে শাখার দ্বায়িত্বে থাকা উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শওকত আকবর ভূঁঞা’র কাছে বিষয়টি জানালে তিনি সাংবাদিক পরিচয় জেনে সঙ্গে সঙ্গেই নোটটি পরিবর্তন করে দিতে চান। প্রথমে কেন অনীহা জানিয়েছেন সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ক্ষীপ্ত হয়ে ওঠেন এবং কোন মন্তব্য করবেন না বলে জানান। তিনি বলেন, ‘আপনি প্রধান কার্যালয়ে কথা বলেন।’ ছেঁড়া-ফাটা নোট বদল করার দায়ভার তো সব শাখারই, প্রধান কার্যালয়ে কেন এ বিষয়ে কথা বলতে হবে জানতে চাইলে তিনি কোন উত্তর দেননি। সোনালী ব্যাংকের মালিবাগ শাখায় সেই ২০ টাকার নোটটি কাউন্টারে দিলে একইভাবে দায়িত্বরত কর্মকর্তা পরিবর্তন করতে অস্বীকৃতি জানান। শাখা প্রধান কাজী বশির আহমেদ সুজন (এজিএম) বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক সভায় উপস্থিত থাকায় সে সময় শাখার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াসমিন (এসপিও) এ বিষয়ে বলেন, আমাদের অচল নোট নিয়ে জমা রাখতে হয় এবং পরবর্তীতে আবার তা লোকাল অফিসে জমা দিয়ে নতুন টাকা আনতে হয়। তাই শাখার নিয়মিত কাজে ব্যস্ত থাকায় কর্মকর্তাগণ অচল নোট বদলে অনীহা দেখান। ‘অচল ও ছেঁড়া নোট বদল’ সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার কোন পোস্টার বা ব্যানারও টাঙ্গানো নেই অধিকাংশ ব্যাংকেরই বিভিন্ন শাখায়।

বেসরকারি ব্যাংকের চিত্র কিছুটা আশাব্যঞ্জক : ঢাকার মালিবাগ ও শান্তিনগর এলাকার সাউথইস্ট, পূবালী ও ইউসিবি ব্যাংকে গেলে কাউন্টারের কর্মকর্তাগণ সঙ্গে সঙ্গেই টাকা বদল করে দেন। সাউথইস্ট ব্যাংকের মালিবাগ শাখায় সহকারী কর্মকর্তা (ক্যাশ) ইমতিয়াজ আহমেদ ছেঁড়া টাকা বদল করে দেন এবং শাখা প্রধান মো. আব্দুর রশিদ বলেন, আমরা কর্মকর্তাদের নিয়মিত ট্রেনিং দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছি যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। অনেক সময়ই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাগণও ছদ্মবেশে এসে আমাদের পরীক্ষা নিতে পারে।’ একইভাবে ইউসিবি’র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শাখার অপারেশন ম্যানেজার হাসান হাফিজুর রহমান বলেন, নোট অদল-বদল ও ধাতব মুদ্রা বিনিময়ে আমরা সব সময় গ্রাহকদের সার্ভিস দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকি। আপনি সাংবাদিক সেই পরিচয় পাওয়ার আগেই কিন্তু আমরা আপনাকে সার্ভিস দিয়েছি।’ পূবালী ব্যাংকের শাখা প্রধান উজ্জল কুমার সাহা বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা নোট অদল-বদল বা ছেঁড়া-ফাটা নোট পরিবর্তনে কোন গড়িমসি করি না।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য : এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘অচল, ছেঁড়া-ফাটা নোট বদলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার জারি করার পরও যদি কোন ব্যাংকের শাখা তা পালন করতে অনীহা দেখায় তাহলে তা দুঃখজনক। যদি কাউকে নিয়মের মধ্যে না আনা যায় তাহলে তো মুসকিল। বেসরকারী ব্যাংক পারলে সরকারী ব্যাংকগুলো পারবে না কেন? তফসিলি ব্যাংকগুলো নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রমের মধ্যেই ছেঁড়া-ফাটা নোট বদল, সঞ্চয়পত্র বিক্রি বা মুদ্রা বিনিময় এসব কাজ করবে বলেই তো লাইলেন্সপ্রাপ্ত হয়, তাহলে এসব কাজের জন্য নতুন করে কেন বলতে হবে। আমরা অবশ্যই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেব।’

তবে ছেঁড়া-ফাটা নোট বদলের ক্ষেত্রে তফসিলি ব্যাংকগুলোকেও ভোগান্তি পোহাতে হয়। প্রথমে অচল নোটগুলো একসঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণে (যেকোন নোট ১শ টি) শাখায় জমা করতে হয় এবং তারপর প্রধান কার্যালয়ে দিতে হয়। প্রধান কার্যালয় আবার জমা করা নোটগুলো নির্দিষ্ট পরিমাণে বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়ে পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকও সব সময়ই ছেঁড়া-ফাটা নোট বদল করে দিতে চায় না। এজন্য ব্যাংকগুলোও গ্রাহকদের কাছ থেকে ছেঁড়া-ফাটা নোট নিতে অনীহা প্রকাশ করে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, ‘আসলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ছেঁড়া-অচল নোট রাখার জায়গার একটু স্বল্পতা রয়েছে। যদি দেশের সব ব্যাংক একসঙ্গে এসব অচল নোট নিয়ে আসে তাহলে আমাদের রাখার একটু সমস্যা হয়ে যায়। তাই আমরা ধাপে ধাপে এসব অচল নোট জমা করার পরামর্শ দিই, কারণ পূর্বে রাখা একেবারে অচল নোটগুলো ধ্বংস করে জায়গা খালি করতে হয়।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগ ‘ক্যাশলেস-বাংলাদেশ’: বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ছেঁড়া-ফাটা অচল নোটের ভোগান্তি নিরসনে আমরা চেষ্টা করছি ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ গড়তে, যেখানে লেনদেনে ক্যাশ থাকবে না। আমরা ইতোমধ্যে বাংলা ‘কিউআর’ তৈরীও করেছি। এক কিউআর-এই সব লেনদেন করা যাবে। এটা শুধু অভিজাত বিপণী বিতানেই নয় বরং রাস্তার সবজি দোকান থেকে শুরু করে ছোট বড় সবার কাছেই থাকবে। আমরা বুঝাবো ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী ও লেনদেনকারীদের, আপনারা ছেঁড়া-ফাটা নোট লেনদেনের চেয়ে ক্যাশলেস ‘কিউআর’ লেনদেনে আসেন, তাহলে অনেক ঝামেলা থেকেই মুক্ত থাকবেন। নতুন এ উদ্যোগটি সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সংবাদ মাধ্যমের সহায়তাও চান তিনি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ছেঁড়া ও অচল নোট ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। ব্যাংকগুলোতে সহজে নোট বদলের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত নতুন নোট সরবরাহ এবং জনগণকে পরিষ্কার নির্দেশনা দেওয়া না হলে এই ভোগান্তি কমবে না। সরকারের ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবতায় এখনো নগদ অর্থের ওপর মানুষের নির্ভরতা অনেক বেশি।

 

Facebook Comments Box

Posted ১০:০৫ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Page 1

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

SatSunMonTueWedThuFri
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031 
প্রধান সম্পাদক: মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
নিউজরুম:

মোবাইল: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১

ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫, ই-মেইল: bankbima1@gmail.com

সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।