নিজস্ব প্রতিবেদক
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ১ বার পঠিত
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর জনপ্রতিনিধিদের জন্য বিশেষায়িত, পূর্ণাঙ্গ ও বাধ্যতামূলক নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্তের পাশাপাশি সংসদ সদস্য হিসেবে গাজী নজরুল ইসলামের অবস্থান নিয়ে জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে স্পষ্ট অবস্থান জানানোর আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ আহ্বান জানান।
টিআইবি বলেছে, মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্ক, তাঁকে সংসদে চাকরি দেওয়ার এবং তাঁর বাবাকে ঠিকাদারি লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভনের অভিযোগ, পরে মরিয়মকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে দাবি, দলীয় তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ায় দল থেকে বহিষ্কার এবং সর্বশেষ মরিয়মের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গ্রেপ্তার—এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মরিয়ম খাতুনের মৃত্যু এবং এর আগে যৌন হয়রানি বা সেক্সটরশনসংক্রান্ত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়ে টিআইবি বলেছে, একই সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের সংসদীয় অবস্থান নিয়ে সংসদের মর্যাদাহানিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিরূপণ করা জরুরি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না। তাই বলে সংসদ ও অন্যান্য সংসদ সদস্যদের জন্য মর্যাদাহানিকর এমন অবস্থার জন্য দায়ী ব্যক্তির সংসদ সদস্য পদ অব্যাহত থাকবে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”
তিনি বলেন, দলীয় তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ার পর দল থেকে বহিষ্কার, পদ ও প্রভাব ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ এবং এখন দ্বিতীয় স্ত্রীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলায় গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের পরও গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকাকে অন্য সংসদ সদস্যরা কীভাবে দেখছেন, সে প্রশ্ন রয়েছে।
“ফৌজদারি দায় নির্ধারণ করবে আদালত; কিন্তু সংসদ সদস্যের নৈতিকতা, ক্ষমতার ব্যবহার ও জনগণের আস্থার প্রশ্নে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংসদের। তাই তাঁর সংসদীয় অবস্থান নিয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে স্পষ্ট করতে হবে,” বলেন তিনি।
সংবিধানের বিধান স্পষ্ট করার দাবি
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ড হলে একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য হন। ফলে বর্তমান অভিযোগ, গ্রেপ্তার, রিমান্ড বা দলীয় তদন্তের সিদ্ধান্ত নিজে থেকেই গাজী নজরুল ইসলামের সাংবিধানিক অযোগ্যতা তৈরি করে না।
তবে আইনগত এই সীমারেখাকে নৈতিক স্খলনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি এড়ানোর সুযোগে পরিণত করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, গুরুতর নৈতিক স্খলন, স্বার্থের সংঘাত, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্নকারী আচরণের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্যপদ বাতিল বা আসন শূন্য হওয়ার প্রশ্ন উঠবে—এ বিষয়ে বিধান স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে পদ ও প্রভাবের অপব্যবহার এবং সেক্সটরশনসহ সব অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
‘আচরণবিধির দাবি নতুন নয়’
গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে ঘটনাকে সংসদ সদস্যদের নৈতিক স্খলনের একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদ সদস্যদের নৈতিক স্খলনের তথ্য বিভিন্ন গবেষণা এবং স্থানীয় পর্যায়ের নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে প্রকাশিত গণমাধ্যম প্রতিবেদনে এর আগেও ধারাবাহিকভাবে উঠে এসেছে। তবে তা প্রতিকারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষায়িত, পূর্ণাঙ্গ ও বাধ্যতামূলক নৈতিক আচরণবিধির দাবি টিআইবির নতুন নয়।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, টিআইবির মূল খসড়ার ভিত্তিতে ২০১০ সালে ‘The Members of Parliament Conduct Bill, 2010’ সংসদে উত্থাপিত হলে সংস্থাটি দ্রুত তা পাস এবং সব দলের প্রতিনিধিত্বে একটি Ethics Committee গঠনের দাবি জানিয়েছিল।
প্রস্তাবিত ওই বিলে ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রভাব ব্যবহার না করা, স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলা এবং নিয়োগ, পদোন্নতি বা বদলিতে সুপারিশ না করার মতো বিধান ছিল বলে জানান তিনি। তবে উদ্যোগটি আইনে পরিণত হয়নি।
তিনি বলেন, ২০২৪-পরবর্তী রাষ্ট্রসংস্কারের প্রত্যাশার প্রেক্ষাপটেও বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা আবার সামনে এসেছে। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সংসদ সদস্যদের জন্য পৃথক Member of Parliament Conduct Act প্রণয়নের সুপারিশ করেছে। দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশেও জনপ্রতিনিধিদের সম্পদ বিবরণী বার্ষিক ভিত্তিতে হালনাগাদ করার বিধানসহ আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, টিআইবি ২০২৪-পরবর্তী সংস্কার প্রস্তাব এবং ২০২৬ সালে বর্তমান সরকারের কাছে দেওয়া সুপারিশেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জন্য কার্যকর আচরণবিধির দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
“সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে, সমাধানের পথও জানা—তারপরও বাস্তবায়নে আগ্রহ নেই কেন? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে,” বলেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
উল্লেখ্য, গত জুলাইয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মরিয়ম খাতুনের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। পরে গাজী নজরুল ইসলাম মরিয়মকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে দাবি করেন। ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানোর কথা জানায়।
এরপর ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম খাতুনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গাজী নজরুল ইসলামসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয় এবং পরে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। মামলার অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
Posted ০৭:৫১ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com