নিজস্ব প্রতিবেদক
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ প্রিন্ট ৩৭ বার পঠিত
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আরও হতাশাজনক পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। আগের পূর্বাভাসের তুলনায় প্রবৃদ্ধির সম্ভাব্য হার কমেছে ১ দশমিক ১ শতাংশ। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে একদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও উচ্চ পর্যায়ে থাকার ঝুঁকি বাড়ছে।
এর আগে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ এবং বিশ্বব্যাংক ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। আইএমএফের নতুন পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা আরও কমে আসায় দেশের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং মানুষের প্রকৃত আয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা চলাকালে প্রকাশিত সংস্থাটির সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সোমবার (১২ অক্টোবর) শুরু হওয়া বার্ষিক সভা চলবে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত।
এদিকে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উন্নয়ন সহযোগীদের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। ব্যাংককে বার্ষিক সভার ফাঁকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আইএমএফের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশ্বব্যাংকের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে আইএমএফের কর্মকর্তা উরজিত প্যাটেল এবং বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনা বিয়ার্দের সঙ্গে তার আলোচনা হয়।
আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বিশ্ব অর্থনীতি টিকে থাকার সক্ষমতা দেখাচ্ছে। তবে সেই সক্ষমতা ধরে রাখার ব্যয় বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে নতুন চাপ তৈরি করছে। এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদন, বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সহায়তা করছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৭ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। পরের বছর তা কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে।
উন্নত অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ২ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। চীনের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, যা আগের পূর্বাভাসের চেয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল থাকায় প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো হয়েছে।
তবে এআই প্রযুক্তির বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অর্থনীতিগুলো তুলনামূলক ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসা এবং মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা অর্থনীতিতে দ্বিমুখী চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে গেলে নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের আয় বৃদ্ধির ওপর।
অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকলে মানুষের আয় দিয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের চাকরিজীবী, নিম্ন আয়ের পরিবার এবং সীমিত সঞ্চয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারেন।
আয় বৃদ্ধির তুলনায় খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়লে পরিবারের ব্যয় সামলাতে ভোগ কমানো কিংবা সঞ্চয় ভাঙানোর প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন পরিস্থিতি চললে জীবনযাত্রার মানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে আমদানি ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি থাকে। এর প্রভাব পড়তে পারে শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে বিনিময় হার, আমদানি ব্যয়, দেশীয় সরবরাহব্যবস্থা এবং সরকারের নীতিগত পদক্ষেপের ওপর। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনা ও পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আইএমএফ সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও তীব্র হলে বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া বা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া, এআই খাতে বিনিয়োগ নিয়ে প্রত্যাশা কমে গেলে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে এই খাতে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে সরকারি অর্থব্যবস্থার সক্ষমতা পুনর্গঠন, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, এআই ব্যবহারের প্রস্তুতি বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ আরও স্পষ্ট করেছে। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানো, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, আর্থিক খাতের সক্ষমতা শক্তিশালী করা এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি প্রয়োজন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা না গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।
সব মিলিয়ে, প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকার আশঙ্কা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় সতর্কবার্তা। পূর্বাভাস অনুযায়ী পরিস্থিতি তৈরি হলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
Posted ০৭:১৩ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com