অনলাইন ডেস্ক
শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রিন্ট ৫০০ বার পঠিত
দেশের বীমা কোম্পানিগুলো দীর্ঘ দিন ধরে ইউএমপি বা ইউনিফায়েড ম্যাসেজিং প্লাটফর্মের নামে অর্থ আদায়ের বিরোধিতা করে আসলেও তা আমলে নিচ্ছে না বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। উল্টো নানা প্রক্রিয়ায় বিতর্কিত এই সার্ভিস বহাল রাখতেই সংস্থাটি কাজ করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ অংশীজনদের। বীমা কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে সম্পূর্ণভাবে ইউএমপি বাতিলের দাবি উঠলেও তা না করে সম্প্রতি এর সার্ভিস ফি সাড়ে তিন টাকা থেকে মাত্র ৫০ পয়সা কমিয়ে তিন টাকা করা হয়েছে। এমনকি ইউএমপি বন্ধে যখন বীমা কোম্পানিগুলো জোর দাবি জানিয়ে আসছে ঠিক সেই মুহূর্তে প্ল্যাটফর্মটির নাম পরিবর্তন করে ইন্স্যুরেন্স ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আইআইএমএস) রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে কর্তৃপক্ষের চাহিদাকৃত সকল ডাটা নিয়মিত আইআইএমএসে প্রেরণ এবং সার্ভিসের বকেয়াসহ সকল বিল প্রদানে বীমা কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়।
সূত্র জানায়, ইন্স্যুরেন্স ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (আইআইএমএস) সার্ভিস ফি পুনঃনির্ধারণ করে চলতি বছরের জুলাই থেকে পলিসি প্রতি ত্রৈমাসিক সাড়ে তিন টাকার পরিবর্তে ৩ টাকা নির্ধারণ করে গত ২৭ আগস্ট বীমা কোম্পানিগুলোকে চিঠি পাঠায় আইডিআরএ। এতে আরো বলা হয়, এসএমএস ফি ৪০ পয়সা পূর্বের ন্যায় অপরিবর্তিত থাকবে। একইসঙ্গে আইআইএমএসে কর্তৃপক্ষের চাহিদাকৃত সকল ডাটা নিয়মিত প্রেরণ এবং সার্ভিসের বকেয়াসহ সকল বিল প্রদানে বীমা কোম্পানিগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়।
অংশীজনরা বলছেন, বীমা কোম্পানিগুলোর আপত্তি সত্ত্বেও তা আমলে না নিয়ে এমনকি অংশীজনদের সঙ্গে এ বিষয়ে আর কোনো আলাপ আলোচনা না করে কার স্বার্থে এই সার্ভিস ফি পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বীমা কোম্পানির পরিচালক ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ইউএমপি বা আইআইএমএস নিয়ে পুরো বীমা খাতের আপত্তি রয়েছে। সরকারও কোনো খাত নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে, মতামত নেয় এরপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু আপত্তি সত্ত্বেও এক্ষেত্রে আইডিআরএ নিজের মতো করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিআইএ’র সঙ্গে আলোচনা করে অথবা সাথে নিয়ে এই সার্ভিস চার্জ অন্তত একটি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। তারা প্রশ্ন তোলেন, মূলত কার স্বার্থে বিনা টেন্ডারের এই সার্ভিস টিকিয়ে রাখা হচ্ছে? সরকারের অনুমোদন ছাড়া যেখানে আইডিআরএ কোনো ফি নির্ধারণ করতে পারে না, সেখানে গোটা সেক্টরের আপত্তি সত্ত্বেও এই ফি বহাল রাখা হচ্ছে?
অংশীজনরা দাবি করেন, আইআইএমএস এর মাধ্যমে যা করা হচ্ছে এটি কোম্পানির কাজ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নয়। গ্রাহকের প্রিমিয়াম পাওয়ার পর এসএমএস দেয়া, ইরিসিপ্ট দেয়া কোম্পানির কাজ। কোম্পানিগুলো এগুলো করছে। আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি কোম্পানিগুলোর ডাটা সংরক্ষণ করতে চায়, তাহলে এর অর্থ কোম্পানিগুলো কেন দিবে? বাংলাদেশ ব্যাংকও নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এ ধরনের কোনো চার্জ নেয় না। গ্রাহকদের এসএমএস দেয়না, এটি ব্যাংকের কাজ, বীমা কোম্পানির কাজ।
বীমা কোম্পানির গ্রাহকদের প্রিমিয়ামের অর্থ লেনদেনসহ একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরির জন্য ২০১৯ সালের ১৫ জুলাই সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তৎকালীন সচিব আসাদুল ইসলামকে চিঠি দেয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকের কাছেও পাঠানো হয় সেই চিঠির অনুলিপি।
২০১৯ সালের দিকে আইডিআরএ’র তৎকালীন চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান পাটোয়ারী বীমা কোম্পানির গ্রাহকদের প্রিমিয়ামের অর্থ লেনদেনসহ একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরির জন্য ইউএমপি নামের উদ্যোগ দাঁড় করান। আর কোনো ধরনের টেন্ডার ছাড়াই এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য বেছে নেওয়া হয় দুয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড নামের একটি কোম্পানিকে। দুয়ার প্রিমিয়াম প্রতি ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ১০ টাকা করে নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। তা দর-কষাকষি করে পরে ৮ টাকায় নামিয়ে আনে আইডিআরএ। আরও পরে এ হার কমে আসে ৩ টাকা ৯০ পয়সায়। এর বাইরে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) যাচাই করার জন্যও ১ টাকা করে পাচ্ছে দুয়ার।
এ সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি বীমা কোম্পানিগুলোর মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ)। শফিকুর রহমান পাটোয়ারী তখন একই বছরের ২১ নভেম্বর তিন পৃষ্ঠার একটি চিঠি দেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে। মুস্তফা কামালও তাতে অনুমোদন দেন। অনুমোদনের আগেই এটি চালু হয়। তবে ২০২০ সালের শুরুর দিকেই পুরোদমে চালু হয়ে যায় ইউএমপি।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পতিত স্বৈরাচারী সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের আত্মীয়-স্বজনের কোম্পানি দুয়ার সার্ভিসেস বিনা টেন্ডারে এই কার্যাদেশ পায়, অথচ স্বৈরাচার পতনের পরেও সেই কার্যাদেশ বাতিল না করে তা বহাল রাখতে নানাভাবে তৎপরতা চলছে। নাম পরিবর্তন করেও টিকিয়ে রাখার চেষ্টা হচ্ছে।
বীমা খাতে রাষ্ট্রীয় সংস্থা রয়েছে দুটি, সাধারণ বীমা করপোরেশন ও জীবন বীমা করপোরেশন। আছে বিদেশি মেটলাইফ ও এলআইসি। এর বাইরে বেসরকারি জীবন বীমা ও সাধারণ বীমা (নন লাইফ) কোম্পানি রয়েছে ৭৯টি। সব মিলিয়ে ৮৩টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বছরে প্রায় এক কোটি পলিসি হয়। এসব পলিসির আওতায় খুদে বার্তাসহ আরও কিছু সেবা বাবদ ১০০ কোটি টাকার কাছাকাছি চলে গেছে দুয়ার সার্ভিসেসের কাছে। পে-অর্ডারের মাধ্যমে মাসের ১ থেকে ৭ তারিখের মধ্যে আইডিআরএকে এ অর্থ দিতে হয়। আইডিআরএ পরে তা দেয় দুয়ার সার্ভিসেসকে।
Posted ০৮:১৭ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com