|

Advertisement
×
ডলার কেনাবেচা ও অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক

পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬   প্রিন্ট   ৫০ বার পঠিত

পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

দেশের অন্যতম পুরোনো বেসরকারি খাতের পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও মোহাম্মদ আলীকে ঘিরে একাধিক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচা, আমদানি বিল পরিশোধ, ঋণ বিতরণ এবং ব্যাংকের পরিচালনায় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে।

দুদক সূত্র জানায়, পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য একটি দল গঠন করা হয়েছে। ঢাকা-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের একজন সহকারী পরিচালক অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউও ডলার কেলেঙ্কারীর বিষয়ে তদন্ত করেছে যেখানে বেশি দামে ডলার ক্রয়ের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানা যায়।

নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে ডলার কেনার অভিযোগ:
পূবালী ব্যাংককে ঘিরে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত একটি অনুমোদিত ডিলার শাখার মাধ্যমে নির্ধারিত বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে ডলার কেনার তথ্য উঠে আসে। ওই সময় ডলারের নির্ধারিত দর ছিল ১০৯ থেকে ১১০ টাকা ৫০ পয়সার মধ্যে। কিন্তু পূবালী ব্যাংকের ওই শাখা বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে ১১৩ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা পর্যন্ত দামে ডলার কেনে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, এভাবে ডলার কেনার ফলে ব্যাংকটির একটি শাখাতেই প্রায় ২১১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ওই সময়ের লেনদেনের বিস্তৃত পর্যালোচনা করলে অন্য শাখাগুলোতেও অনিয়মের তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে অতিরিক্ত পরিদর্শন বা পরবর্তী নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশিত হয়নি।

সে সময় ডলার কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও প্রকাশিত হয়েছিল বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে। পূবালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলী সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ব্যাংকটি নিয়ম মেনেই লেনদেন করেছে। অন্যদিকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শাহাদত হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্ধারিত দরে বাজারে পর্যাপ্ত ডলার পাওয়া যাচ্ছিল না। আমদানিকারকদের দায় পরিশোধ এবং রেমিট্যান্স সংগ্রহের প্রয়োজনে ব্যাংককে বেশি দামে ডলার কিনতে হয়েছে। কিন্তু এখন এসে আবারও দুদকের তদন্তে চেয়ারম্যান ও এমডির যোগসাজশে অনিয়মের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসছে।

আমদানি বিল পরিশোধে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ:
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে আমদানি বিল পরিশোধের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণের দায়িত্ব ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কেন্দ্রীয় ট্রেড প্রসেসিং ইউনিটের হলেও আমদানিকারকদের কাছ থেকে নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করা হয়েছে। এভাবে গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অতিরিক্ত আদায় করা অর্থ মতিঝিল ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার একাধিক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছিল। সেখানে বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর নামে অনুমোদন ছাড়াই সাতটি হিসাব খোলার বিষয়ও প্রতিবেদনে উঠে আসে। এসব হিসাবের মাধ্যমে লেনদেনের প্রকৃতি ও অর্থের চূড়ান্ত গন্তব্য যাচাই করা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঋণ বিতরণ ও পরিচালনায় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে প্রশ্ন:
বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের পাশাপাশি পূবালী ব্যাংকের ঋণ বিতরণ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়া এবং কিছু ঋণের অর্থ অন্য ব্যাংকের দায় পরিশোধে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংকের পরিচালনা ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্ষমতা কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকার বিষয়টিও অভিযোগের অংশ।

ডেল্টা লাইফের অভিযোগও আলোচনায়:
পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমানের নাম ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক অনিয়মসংক্রান্ত অভিযোগেও এসেছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) করা মামলায় তাঁরসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম এবং কোম্পানির তথ্য পরিবর্তন বা মুছে ফেলার অভিযোগ আনা হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানসংক্রান্ত সংবাদেও পূবালী ব্যাংক ও ডেল্টা লাইফকে ঘিরে অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে ডেল্টা লাইফের পক্ষ থেকে দুদকের তদন্তের জন্য নির্ধারিত নথিপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। তবে জমা দেওয়া নথির পূর্ণাঙ্গ তালিকা কিংবা সেগুলোর ভিত্তিতে তদন্তে কী অগ্রগতি হয়েছে, তা জানা যায়নি।

কর্মকর্তাদের শুনানি, বক্তব্য ও তদন্তের অগ্রগতি:
দুদক গত কয়েক মাসে পূবালী ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান—মহাব্যবস্থাপক পদমর্যাদার কর্মকর্তা—সহ কয়েকজনের বক্তব্য শুনেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এসব শুনানিতে বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচা, বিনিময় হার নির্ধারণ, গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবের লেনদেন সম্পর্কে তথ্য চাওয়া হয়েছে।

তবে দুদকের অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। অনুসন্ধানে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন ও বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, বিষয়টি দুদক তদন্ত করছে। এ কারণে এ পর্যায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মন্তব্য করার সুযোগ নেই; দুদক প্রয়োজনীয় তথ্য চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংক সহযোগিতা করবে।

পূবালী ব্যাংকের জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে প্রতিবেদককে জানান। চেয়ারম্যান ও এমডি এ বিষয়ে সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলবেন না বলে জনসংযোগ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানিয়েছেন।

Facebook Comments Box

Posted ০৮:০২ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com