অনলাইন ডেস্ক
শনিবার, ০২ মে ২০২৬ প্রিন্ট ৮ বার পঠিত
১. ভূমিকা:
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে বীমা খাতের সম্প্রসারণ অপরিহার্য। জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান মাত্র ০.৫% এর কাছাকাছি, যা ভারত ৪% ও বিশ্ব গড় ৭% এর তুলনায় অনেক কম। এই পিছিয়ে থাকার একটি বড় কারণ হলো গ্রাহকের আস্থার সংকট। আর এই আস্থার সংকট তৈরি হয় মূলত ‘বীমা দাবী প্রদানে উদাসীনতা ও বিলম্ব’ এর কারণে। বর্তমান ডিজিটাল অর্থনীতি ও মধ্যবিত্তের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার চাহিদার প্রেক্ষিতে এই সমস্যার আশু সমাধান জরুরি।
২. বীমা দাবী প্রদানে উদাসীনতা ও বিলম্ব: সমস্যার স্বরূপ, সমস্যার ধরন, বাস্তব চিত্র ও প্রভাব
ক)দলিল জটিলতা: দাবীর সময় অতিরিক্ত কাগজ চাওয়া, ক্ষুদ্র ত্রুটিতে ফাইল বাতিল গ্রাহক হয়রানি, আস্থা নষ্ট।
খ)ইচ্ছাকৃত বিলম্ব: তদন্তের নামে ৬-১২ মাস ঝুলিয়ে রাখা জরুরি প্রয়োজনে টাকা না পাওয়ায় বীমার মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ।
গ)জনবল ও প্রযুক্তির অভাব: ম্যানুয়াল প্রসেস, দক্ষ সার্ভেয়ারের সংকট নিষ্পত্তি সময় ৯০ দিনের বদলে ১৮০+ দিন।
ঘ)স্বচ্ছতার অভাব:স্বচ্ছতার অভাবে দাবী বাতিলের কারণ পরিষ্কার না,নানান আইনি জটিলতা, IDRA-তে অভিযোগ বৃদ্ধি
IDRA এর ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, মোট অভিযোগের ৬৭% ই দাবী নিষ্পত্তি সংক্রান্ত।
৩. বর্তমান বীমা আইন: কী আছে, কোথায় ফাঁক
বীমা আইন, ২০১০ ও IDRA প্রবিধানমালা অনুযায়ী:
1. সময়সীমা: জীবন বীমায় ৯০ দিন এবং সাধারণ বীমায় ৬০ দিনের মধ্যে দাবী নিষ্পত্তি বাধ্যতামূলক।
2. জরিমানা: বিলম্ব হলে বীমা কোম্পানিকে ব্যাংক হারের ৫% বেশি সুদসহ দাবী পরিশোধ করতে হবে।
3. অমবুডসম্যান(স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তিকারী): গ্রাহক IDRA এর বীমা অমবুডসম্যানের কাছে অভিযোগ করতে পারেন।
আইনের দুর্বলতা:
– জরিমানা কার্যকর হয় না বললেই চলে। IDRA-এর মনিটরিং দুর্বল।
– ‘তদন্ত চলছে’ দেখিয়ে আইনি সময়সীমা এড়ানোর সুযোগ আছে।
– ক্ষুদ্র দাবীর জন্য Fast Track ব্যবস্থা নেই।
৪. বর্তমান অর্থনৈতিক চাহিদা:
কেন দ্রুত দাবী নিষ্পত্তি জরুরি-
1. মধ্যবিত্তের উত্থান: স্বাস্থ্য, মোটর ও SME বীমার চাহিদা বাড়ছে। এরা জরুরি টাকার জন্য বীমা করে।
2. ডিজিটাল লেনদেন: মোবাইল ব্যাংকিং-এর যুগে মানুষ ২৪ ঘণ্টায় সার্ভিস আশা করে। ৬ মাস অপেক্ষা অবাস্তব।
3. বৈদেশিক বিনিয়োগ: Reinsurance কোম্পানি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা claim settlement ratio দেখে বাজারে আসে। বাংলাদেশের রেশিও ৫৫% এর নিচে, যা আস্থাহীনতার প্রতীক।
4. জলবায়ু ঝুঁকি: ঘূর্ণিঝড়-বন্যায় কৃষি ও প্রাণ বীমার দাবী দ্রুত না মিটলে গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়ে।
৫. সমস্যা সমাধানে সুপারিশমালা:
ক) আইনি ও নিয়ন্ত্রক সংস্কার:
1. ‘Pay First, Investigate Later’ নীতি: ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবীর ৭০% ১৫ দিনের মধ্যে অগ্রিম প্রদান বাধ্যতামূলক করা। তদন্ত পরে হবে।
2. স্বয়ংক্রিয় জরিমানা: ৬০/৯০ দিন পার হলেই সিস্টেম থেকে অটো সুদসহ জরিমানা গ্রাহকের হিসাবে জমা হবে। IDRA-এর অনুমোদন লাগবে না।
3. Claim Settlement Ratio প্রকাশ: প্রতি কোম্পানির CSR ও গড় নিষ্পত্তি সময় IDRA ওয়েবসাইটে মাসিক ভিত্তিতে প্রকাশ বাধ্যতামূলক।
খ) প্রযুক্তিগত সমাধান:
1. কেন্দ্রীয় e-Claim পোর্টাল: IDRA-এর অধীনে একক পোর্টাল যেখানে গ্রাহক দাবী করবে, ট্র্যাক করবে। বিলম্ব হলে অটো এলার্ট যাবে।
2. AI-ভিত্তিক তদন্ত: ছবি ও ভিডিও দেখে AI দিয়ে প্রাথমিক ক্ষতি নিরূপণ। মোটর বীমায় ৭২ ঘণ্টায় নিষ্পত্তি সম্ভব।
3. ব্লকচেইন স্মার্ট কন্ট্রাক্ট: কৃষি ও স্বাস্থ্য বীমায় সূচক-ভিত্তিক বীমা চালু। বৃষ্টি বা হাসপাতালে ভর্তির ডেটা পেলেই অটো টাকা পেমেন্ট।
গ) প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি:
1. *দক্ষ সার্ভেয়ার পুল: IDRA থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত স্বাধীন সার্ভেয়ারদের ডেটাবেজ। ৪৮ ঘণ্টায় সার্ভে বাধ্যতামূলক।
2. গ্রাহক সচেতনতা: পলিসি বিক্রির সময় ‘দাবী করার সহজ ৩ ধাপ’ লিফলেট বাধ্যতামূলক। দাবী বাতিল হলে কারণ বাংলায় লিখে জানাতে হবে।
৬.উপসংহার:
বীমা হলো ‘আস্থার ব্যবসা’। দাবী প্রদানে উদাসীনতা এই আস্থার মূলেই আঘাত করে। বীমা আইন ২০১০-এর কঠোর প্রয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং IDRA-এর সক্রিয় তদারকির মাধ্যমে ৩০ দিনের মধ্যে ৯৫% দাবী নিষ্পত্তি সম্ভব। এতে শুধু বীমা খাত নয়, পুরো অর্থনীতির ঝুঁকি সহনশীলতা বাড়বে এবং জিডিপিতে বীমার অবদান ২০৩০ সালের মধ্যে ২% এ উন্নীত করা সম্ভব।
Posted ০৭:৪৮ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০২ মে ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: ই-মেইল: bankbima1@gmail.com