নিজস্ব প্রতিবেদক
বুধবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রিন্ট ২২৯ বার পঠিত
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও এগিয়ে নিতে এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বাণিজ্যিক বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি ও চুক্তি বাস্তবায়নের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মত দিয়েছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ। গতকাল ০২ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) ডিসিসিআই আয়োজিত ‘ব্যবসার জন্য বিরোধ নিষ্পত্তি ও চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারটি মতিঝিলের ডিসিসিআই-এর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মহবুবুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আবদুর রহিম খান।
তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ। এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির জন্য কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার বিকল্প নেই।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশের আদালতগুলোতে বিপুল পরিমাণ মামলা ঝুলে আছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শুধুমাত্র বাণিজ্যিক বিরোধের পরিমাণই প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের। তাই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে এ সমস্যার সমাধান এখন সময়ের দাবি।
ডিসিসিআই সভাপতি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে দেওয়ানি কার্যবিধি (সংশোধনী) অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি হলেও জটিল বাণিজ্যিক বিরোধের জন্য আলাদা স্পষ্ট বিধান নেই। তাছাড়া সালিশি আইন ২০০১ প্রত্যাশিতভাবে কার্যকর হয়নি। এ কারণে তিনি বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি বিশেষায়িত আদালত গঠনের প্রস্তাব করেন। তার মতে, প্রশিক্ষিত বিচারক ও আধুনিক পদ্ধতি নিয়ে গঠিত এ আদালত দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হবে যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, ইইউ সবসময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে আছে। কোন রাজনৈতিক দল প্রশাসনে আছে তা দেখার বিষয় নয়, আমরা মূলত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করে যাবো। বিশেষায়িত কার্যক্রমের জন্য ইইউ ইক্সপার্টিস সম্পৃক্ত করার ব্যাপারেও আমরা একমত। অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য ইইউ সবসময়ই বাংলাদেশের সঙ্গে আছে এবং থাকবে। ভবিষ্যতেও যেকোন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে অর্থনৈতিক সহযোগী হিসাবে ইইউ থাকবে বলে তিনি সেমিনারে মত দেন।
প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মহবুবুর রহমান বলেন, আজকে এই সেমিনারে এসে অনেক কিছু শিখতে পারলাম। বাণিজ্য প্রসারের ক্ষেত্রে অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে তা আমি অবশ্যই স্বীকার করি। তবে এসব প্রতিবন্ধকতা অবশ্যই কাটিয়ে উঠতে হবে এবং ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। ভবিষ্যতে বাণিজ্য প্রসারের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো কেটে যাবে বলে তিনি আশা করেন। এক মাসের মধ্যে বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠার খসড়া আইন তৈরি করা হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। এতে ব্যবসায় আস্থা ফেরার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে, আর দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে বলেও আলোচনায় উঠে আসে।
বিশেষ অতিথি’র বক্তব্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও ইপিবি’র ভাইস চেয়ারম্যান মো: আবদুর রহিম খান বলেন, বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে শুধু যে এফডিআই আকর্ষন ব্যাহত তা নয়, বিষয়টি আমাদের রপ্তানি সম্প্রসারণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং সার্বিকভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বাংলাদেশ ক্রমাগত আস্থা হারাচ্ছে। বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তিতে চলমান আদালতের কার্যক্রমের বাইরে ‘আইনী সংস্থা’ তৈরি করা যেতে পারে বলে অভিমত জ্ঞাপন করেন, যার মাধ্যমে বিবাদমান প্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে তুলনামূলক স্বল্প সময়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা চেম্বারের প্রাক্তন সভাপতি ব্যারিস্টার মোঃ সামীর সাত্তার। তিনি বলেন, স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিকট ব্যবসায়িক চুক্তির প্রয়োগের বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক, যেখানে আমরা বেশ পিছিয়ে রয়েছি। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বব্যাংকের ডুইং বিজনে রিপোর্টের কন্ট্রাক এনফোর্সমেন্ট সূচকে আমাদের অবস্থান ১৯০টি দেশের মধ্যে ১৮৯তম, যা অত্যন্ত হতাশার বিষয়। তিনি জানান, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থ ঋণ আদালতে প্রায় ২৫০০০ মামলা রয়েছে বিচারধীন রয়েছে, যা আমাদের আইনী কার্যক্রমের দীর্ঘসূত্রিতাকেই প্রকাশ করে। তিনি, আরবিট্রেশন আইন ২০০১ কে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সংশোধনের উপর জোরোরোপ করেন।
অন্ষ্ঠুানের নির্ধারিত আলোচনায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)’র মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) মোঃ আরিফুল হক, ইউএনডিপি বাংলাদেশ-এর উপ আবাসিক প্রতিনিধি সোনালী দা রত্নে, বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টার (বিয়াক)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কে এ এম মাজেদুর রহমান, সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রাজাহ অ্যান্ড থান-এর কো-হেড ভিকনা রাজা, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের স্পেশাল অফিসার বিচারপতি তারেক মোয়াজ্জেম হোসেন এবং ড. কামাল হোসেন অ্যান্ড এসোসিয়েটস-এর পার্টনার ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওন অংশগ্রহণ করেন।
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের স্পেশাল অফিসার বিচারপতি তারেক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, বাণিজ্যিক আদালত পরিচালনায় বাণিজ্য বিরোধ বিষয়ক অভিজ্ঞ বিচারকদের নিয়োগ প্রদানের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ প্রদান করা প্রয়োজন।
মুক্ত আলোনায় ঢাকা চেম্বারের প্রাক্তন সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তিতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্নে সরকারের আন্ত:মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের বেশ অভাব রয়েছে এবং এ অবস্থার উন্নয়ন না হলে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না। বাণিজ্যিক বিরোধগুলো সমাধানে আদালতে না গিয়ে, আরবিট্রেশন সেন্টারের মাধ্যমে নিষ্পত্তিতে বেশি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
ডিসিসিআই সহ-সভাপতি মোঃ সালিম সোলায়মান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট খাতের স্টেকহোল্ডারবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারে আলোচকরা আশা প্রকাশ করেন, গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে বাস্তবসম্মত নীতিগত সুপারিশ তৈরি হবে যা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিয়ে যাবে।
Posted ০৬:০২ অপরাহ্ণ | বুধবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com