এম এ খালেক
রবিবার, ২৭ জুলাই ২০২৫ প্রিন্ট ৭৬৬ বার পঠিত
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি’র (সিপিবি) সভাপতি, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মো. শাহ্ আলম বলেছেন, ‘আগে রাজনীতি ছিল সমাজ সেবার অংশ। আর এখন রাজনীতি রীতিমতো পেশায় পরিণত হয়েছে। এখন শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত হোক তাদের সহজ অর্থ উপার্জনের পথ হয়ে গেছে রাজনীতি। একবার রাজনীতিতে প্রবেশ করে স্থানীয় পর্যায়ের নেতা হলেই কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নেয়া যায়। ব্যবসায়ী এবং বিত্তবান গোষ্ঠী তাদের বিত্তের পরিধি বাড়ানোর নতুন কৌশল হিসেবে রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে এসব রাজনীতিবিদের কোনো সংস্পর্শ নেই। তারা বিভিন্ন সময় বস্তি এবং অন্যান্য স্থান থেকে লোক ভাড়া করে এনে মিছিল করেন। রাজনীতি আদর্শচুৎ হয়ে দুর্বৃত্তায়নের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এটা আমাদের জন্য সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি করছে। রাজনীত কলুুুষিত হবার কুফল আমরা প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করছি।’ জনাব শাহ আলম দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি পত্রিকার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে একথা বলেন। তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের দেশের রাজনীতি ব্যাপকভাবে কলুষিত হয়ে পড়েছে। রাজনীতি এখন দুর্বৃত্তায়িত হয়ে পড়েছে। কোনোভাবেই আমরা স্বাভাবিক রাজনীতি চর্চায় ফিরে যেতে পারছি না। দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি আমাদের দেশে এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।’ সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের চলমান রাজনীতি এবং অর্থনীতির বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন এম এ খালেক। তার সাক্ষাৎকারের পূর্ণ বিবরণ এখানে উল্লেখ করা হলো:
দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: সম্প্রতি রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকায় মর্মান্তিত হত্যাকান্ড সংঘঠিত হয়েছে। সেখানে এক ব্যক্তিকে কয়েক জন মিলে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মৃত্যু নিশ্চত করার জন্য যুবকের মাথায় পাথর নিক্ষেপ করা হয়। এই নির্মমতা মধ্য যুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?
মো. শাহ্ আলম : রাজধানীর পুরান ঢাকায় সম্প্রতি যে মর্মান্তিক হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে তা পুরো জাতিকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। তবে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আমাদের দেশের হত্যাকান্ডের দু’টি প্রেক্ষাপট আছে। এর মধ্যে একটি আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। আর একটি হচ্ছে বর্তমান প্রেক্ষাপট। গত এক বছর ধরে আমাদের দেশে কোনো রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শাসন কার্য পরিচালনা করছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা আছে। তারা চাইলেই রাজনৈতিক সরকারের মতো সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। পুরনো ঢাকায় যে অভিজিৎ হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল এবং অতি সম্প্রতি মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকায় সোহাগ হত্যাকান্ড ঘটে তার পেছনে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট কাজ করেছে। কিন্তু সোহাগ হত্যাকোন্ডের পর নানা শক্তির শ্লোগানের ধরন অন্য উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে আসে।
দেশের বৃহৎ দুই রাজনৈতিক দল দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এক সময় বলেছিলেন, আমি রাজনীতিকে রাজনীতিবিদদের জন্য কঠিন করে তুলবো (‘আই উইল মেইক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট ফর দ্য পলিটিশিয়ান্স’)। জিয়াউর রহমান ঠিক সেটাই করে গেছেন। জিয়াউর রহমানের আরো একটি উক্তি বেশ আলোচিত হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, মানি ইজ নো প্রবলেম। সেই সময় অর্থ এবং ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন দল থেকে নেতা-কর্মীদের ভাগিয়ে আনা হয়েছিল নতুন রাজনৈতিক দলে গঠন করা হয়েছিল।
এখনো অন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলে নতুন দলের তৎপরতা দেখা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। প্রকৃত রাজনীতিবিদদের উপর সমস্ত দোষ চাপিয়ে দিয়ে বিরাজনীতিকরণের তৎপরতাও অব্যাহত আছে। আগে রাজনীতি ছিল অব্যাহত চর্চার বিষয়। যারা জ্ঞানদ্বীপ্ত সাধারণত তারাই রাজনীতিতে যুক্ত হতেন। আইনজীবী, সমাজসেবক এরাই প্রধানত রাজনীতিতে যুক্ত হতেন।
দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: দেশে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। কাক্সিক্ষত মাত্রা বিনিয়োগ আহরিত না হবার কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। এটা কি রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের জন্য কোনোভাবে দায়ী বলে মনে করেন?
মো. শাহ্ আলম : দেশে উপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় বেকারের হার বাড়ছে। দেশে ব্যক্তি খাতে প্রত্যাশিত মাত্রায় বিনিয়োগ হচ্ছে না। ফলে নতুন কর্মসস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। এক শ্রেণির মানুষ কর্মসংস্থানের বিকল্প হিসেবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছে। উচ্চ শিক্ষা লাভ করার পরও একজন ছাত্র বা ছাত্রী উপযুক্ত কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পাচ্ছে না। বেকারদের একটি বড় অংশই রাজনীতির নামে অর্থ উপার্জনের খেলায় মেতে উঠেছে। তারা মনে করছে, যদি চাকরির পেছনে না ঘুরে কোনো বড় রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকতে পারি তাহলে অর্থ-বিত্তের কোনো অভাব হবে না। এমনকি চাকরি পেতে হলেও যোগ্যতার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয় এবং অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হয়। যে কোনো বিচারেই রাজনীতি এখন রীতিমতো লাভজনক পেশায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা একজন শিক্ষার্থীর জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। বরং শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের আত্ম অহমিকাপূর্ণ বেকারে পরিণত করছে। উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ বঞ্চিত অনেকেই এখন রাজনীতিতে যুক্ত হবার মাধ্যমে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন।
স্বাধীনতার পর থেকেই ছাত্র রাজনীতি কলুষিত হতে শুরু করে। ছাত্রদের আদর্শিক এবং চরিত্রবান হিসেবে গড়ে তোলার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সত্তরের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজি মোহাম্মদ মহসিন হলে ‘সেভেন মার্ডারের কথা নিশ্চয়ই আমাদের মনে থাকার কথা। ছাত্র রাজনীতি যদি কলুষিত হয় তাহলে জাতীয় রাজনীতি কখনোই বিশুদ্ধ থাকতে পারে না। কারণ ছাত্ররাই আগামী দিনে জাতির নেতৃত্ব দেবেন। ছাত্ররা যেভাবে গড়ে উঠবে পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতিও ঠিক সেভাবেই পরিচালিত হবে। গত শতাব্দির ষাটের দশক পর্যন্তও আমাদের দেশের রাজনীতি আদর্শিক ধারায় প্রবাহমান ছিল। সেই সময় বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হতো। আলোচনা হতো। কিন্তু খুনোখুনি তেমন একটা হতো না। ভিন্ন মতাদর্শেই ছাত্র সংগঠনের কর্মীরাও একই সঙ্গে হলে সহাবস্থান করতো। আর এখন সরকার সমর্থন ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা হলে অবস্থান করতে পারে না। ছাত্র রাজনীতিতে এখন জ্ঞান চর্চার পরিবর্তে লাঠিতন্ত্র প্রাধান্য পাচ্ছে। রাজনীতি যেহেতু এখন দুর্বৃত্তায়িত হয়ে গেছে তাই যারা নানা অপকর্ম করে থাকে তারা রাজনীতিতে প্রাধান্য পাচ্ছে। আমাদের দেশের সামাজিক অবস্থায় ব্যাপক অধঃপতন ঘটেছে। তারই অনিবার্য প্রভাব পড়েছে রাজনীতির উপর। আরো একটি উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে বর্তমানে রাজনীতির সঙ্গে বড় বড় ব্যবসায়ীরা যুক্ত হয়ে গেছে। ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তারা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে নানাভাবে আর্থিক সুবিধা হাসিল করে নিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং এবং অর্থনীতিতে যে বিপর্যয় ঘটেছে তার পেছনে দেশের কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর দায় রয়েছে। তারা প্রচলিত আইনগুলোকে পরিবর্তন এবং সংশোধন করে তাদের স্বার্থ রক্ষায় উপযোগী করে গড়ে তুলেছে। যেসব ব্যবসায়ী রাজনীতিতে যুক্ত হয় তারা রাজনীতির কোনো রেগুলোর এক্টিভিটিজে থাকেন না। তারা সংসদে বসে নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে আইন প্রণয়নে চাপ প্রয়োগ করে। এবং তারা এ ক্ষেত্রে সফলও হয়। কারণ তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে চাঁদা প্রদান করে। কাজেই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বও তাদের চাওয়া পাওয়াকে উপেক্ষা করতে পারেন না। তারা অর্থকে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। ফলে প্রচলিত রাজনীতি ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা করে, যদিও এতে অধিকাংশ সময়ই সাধারণ মানুষের স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়। রাজনীতি যদি দুর্বৃত্তায়িত হয়ে পড়ে তাহলে তৃণমূল পর্যায়ে তার প্রভাব পড়বেই। বর্তমানে আমরা সেই অবস্থাই প্রত্যক্ষ করছি।
যারা ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি চর্চা করেন, বিশেষ করে জামায়াত-শিবির তারাও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য স্থানে দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি চর্চা করেছে, খুনাখুনির রাজনীতি চর্চা থেকে তারাও মুক্ত নয়। ক্ষমতায় যাবার পদ্ধতি হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলো দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতিকে ব্যবহার করছে। এই ধারাগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে চলমান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমরা কোনো পরিত্রাণ পাচ্ছি না। রাজনৈতিক দলগুলোও দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি চর্চা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো চেষ্টা করছে না। সোহার হত্যাকান্ডের পর যে প্রতিবাদ মিছিল বের হয়েছে সেখানেও হত্যাকান্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের পরিবর্তে রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পর দোষারোপ করছে। হত্যাকান্ডকে আড়াল করার জন্য রাজনৈতিক নানা বিতর্কিত ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসা হয়। এতে হত্যাকান্ডের মূল কারণ ধামাচাপা পড়ে যায়। আমাদের দেশে কোনো রাজনীতি সম্পৃক্ত কোনো হত্যাকান্ডের দ্রুত বিচার হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আদৌ বিচার হয় না। ফলে অপরাধীরা পুনরায় অপরাধ কর্মে যুক্ত হতে সাহসী হয়।
দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: সাম্প্রতিক সময়ে মব জাস্টিজের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর কারণ কি?
মো. শাহ্ আলম: সাম্প্রতিক সময়, বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘মব জাস্টিজ’ প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। এটাকে কোনোভাবেই ‘মব জাস্টিজ’ বলা যাবে না। এটা হচ্ছে ‘মব ক্রাইম।’ কোনো সভ্য সমাজে মব জাস্টিজ বা মব ক্রাইম কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। দেশে বিচারহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি হলে সাধারণত মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চেষ্টা করে। যে কোনোভাবেই মব ক্রাইম বন্ধ করতে হবে। মব ক্রাইমের নামে আর যেনো একটি প্রাণহানি না ঘটে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। গত বছর ৫ই আগস্ট আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে মব জাস্টিজ শুরু হয় না। বেশ কিছুদিন পর মব জাস্টিজ শুরু হয়। প্রথমে একে মব জাস্টিজ বলা হলেও পরবর্তীতে এটা মব ক্রাইমে পরিণত হয়। যে নামেই পরিচিত হোক না কেনো আইন কোনোভাবেই আইনকে নিজের হাতে তুলে নেয়া যাবে না। কোনো সভ্য সমাজে কখনোই আইনকে নিজের হাতে তুলে নেয়া হয় না। মব কালচারের মধ্যে রাজনৈতিক ইন্দন যেমন আছে তেমনি আছে সামাজিক উন্মাদনা। রাজনৈতিক পরিচয়ে কেউ মারাত্মক অপরাধে যুক্ত হলে তাকে সর্বোচ্চ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু শুধু বহিষ্কার করলেই রাজনৈতিক দলগুলো কৃত অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পেতে পারে না। অপরাধীকে আইনের হাতে ন্যস্ত করা এবং বিচারকে ত্বরান্বিত করাও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বের মধ্যে বর্তায়। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোকে এমন একটি কালচার গড়ে তুলতে হবে যাতে সদস্যদের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল থাকে যে, অপরাধ করলে দল তাদের কোনো আশ্রয় দেবে না, বরং বিচারের ব্যবস্থা করবে। এটা করা গেলে রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে অপরাধ প্রবণতা অনেকটাই কমে যাবে।
অন্তর্বর্তিকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না। সেনাবাহিনীর সদস্যদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়ে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু তারপরও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি হচ্ছে না। এর কারণ খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের দেশে তৃণমূল পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বাহিনী বিশেষ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বিগত সরকার আমলে পুলিশ বাহিনীর সদস্যাদের দলীয় ক্যাডারের মতো ব্যবহার করার ফলে নতুন পরিস্থিতিতে তারা স্বাভাবিক উদ্যম নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। পুলিশের অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের অনেকেই কর্মস্থল থেকে পালিয়ে গেছেন। মব ভায়েলেন্সের মাধ্যমে পুলিশের কাজে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেখা যাচ্ছে। ফলে পুলিশ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। মানুষ বুঝতে পারছে না সরকার কারা চালাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে মানুষের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারের ভূমিকা বির্তর্কিত হয়ে পড়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। শুরুতে তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের যে সমর্থন ছিল তা আর আগের মতো নেই। আইন-শৃঙ্খলা ও সামাজিক অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে সক্ষমতা প্রদর্শন করতে না পারা করণে সরকারের প্রতি জনসমর্থন কমে গিয়েছে। তাই এই বিষয়টিকে বিবেচনায় রেখেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে।
দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের রপ্তানি পণ্যের উপর বাড়তি শুল্কারোপ করেছে। এটা বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের উপর কেমন প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?
মো. শাহ্ আলম: সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের আমদানি পণ্যের উপর ব্যাপক হারে শুল্কারোপ করেছে। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নীতিমালার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই বাড়তি শুল্কারোপের উদ্যোগ সাংঘর্ষিক। কারণ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নীতি হচ্ছে পর্যায়ক্রমে আমদানি পণ্যের উপর শুল্ক হার কমিয়ে এনে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার দ্বার উন্মোচন করা। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর তার বিপরীতে গিয়ে অন্তত ৬০টি দেশ থেকে আমদানি পণ্যের উপর বাড়তি শুল্কারোপ করেছে। প্রাথমিকভাবে বাড়তি শুল্কারোপের পর তিন মাস তা স্থগিত রাখা হয়। এই তিন মাসের মধ্যে বিভিন্ন দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ভিত্তিতে তাদের রপ্তানি পণ্যের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত বর্ধিত শুল্ক হার যৌক্তিকভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বর্ধিত শুল্ক হ্রাসের ক্ষেত্রে সব দেশের প্রতি যৌক্তিক আচরণ করা হয়নি। যেমন ভিয়েতনামের রপ্তানি পণ্যের উপর প্রাথমিক ভাবে ৪৬ শতাংশ বর্ধিত শুল্কারোপ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ৩৭ শতাংশ বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। ভিয়েতনামের বাড়তি শুল্ক হার চূড়ান্ত পর্যায়ে ২৬ শতাংশ কমিয়ে ২০ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়েছে। ভারতের উপর আরোপিত শুল্ক হারও কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাড়তি রপ্তানি শুল্ক হার মাত্র ২ শতাংশ কমিয়ে ৩৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের বিদ্যমান ১৫ শতাংশসহ মোট মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হবে। আর ভিয়েতনামের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে সব মিলিয়ে ৩৫ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাড়তি শুল্কারোপের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে। একই সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম-নীতিকে তুড়ি মেরে ফেলে দিয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী যে বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে ভেঙ্গে দিয়েছে। বাংলাদেশের উপর সব মিলিয়ে ৫০ শতাংশ শুল্কারোপের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য বিরূপ প্রতিযোগিতার মুখোমুখি পড়বে। বাংলাদেশ যদি ভিয়েতনামের মতো আরো আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা শুরু করতে পারতো এবং প্রয়োজনে মার্কিন লবিস্ট নিয়োগ দিতে পারতো তাহলে হয়তো শুল্ক হ্রাসের ব্যাপারে ইতিবাচক রেজাল্ট পাওয়া যেতো। ভিয়েতনাম যেটা সম্ভব করেছে বাংলাদেশ তা করতে পারেনি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করে থাকে। অর্থনৈতিক অবরোধ ও শুল্ক নীতি তার মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে কোটা সুবিধা প্রদান করতো। ২০০৫ সালে বিশ্বব্যাপী মুক্ত বাজার অর্থনীতি চালু হবার পর কোটা সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সীমিত পরিসরে শুল্কমুক্ত পণ্য রপ্তানি সুবিধা জিএসপি প্রদান করে। কিন্তু পরবর্তীতে শ্রম অধিকার লঙ্ঘনসহ নানা অভিযোগ তুলে বাংলাদেশকে দেয়া জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধা দিয়ে আসছে। আগামী বছর (২০২৬) বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরো তিন বছর অর্থাৎ ২০২৯ সাল পর্যন্ত জিএসপি সুবিধা প্রদান করবে। তারপর জিএসপি সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক শিল্পে বিস্ময়কর অবস্থানের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া কোটা সুবিধা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি সুবিধা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেয়া জিএসপি সুবিধা বন্ধ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্ক আরোপিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক সামগ্রি রপ্তানি মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে বাধ্য। বাংলাদেশকে চাপে রাখার একটি কৌশল হতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই বাড়তি শুল্কারোপ। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। ভিয়েতনাম তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এবং ভিয়েতনামের অবস্থান এতটাই কাছাকাছি যে সামান্য সুযোগ পেলেই ভিয়েতনাম বাংলাদেশকে টপকে যাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের হিস্যা ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ। আর ভিয়েতনামের হিস্যা হচ্ছে ৬ দশমিক ০৯ শতাংশ। কাজেই মার্কিন শুল্ক নীতির সুযোগ গ্রহণ করে ভিয়েতমান অচিরেই আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে টপকে যাবে এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যেতে পারে। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য তালিকায় তৈরি পোশাকের অংশ ৮৪ শতাশের মতো। কাজেই তৈরি পোশাক রপ্তানি বিঘ্নিত হলে পুরো রপ্তানি বাণিজ্যই মুখ থুবড়ে পড়বে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশি প্রতিনিধি দল আলোচনা চালিয়েছে কিন্তু শুল্ক কমানোর ব্যাপারে তেমন কোনো সমঝোতা হয়নি। আগামীতে আরো আলোচনা হতে পারে। তবে তাতে কতটুকু সুফল অর্জিত হলে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বলা হয়েছে,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির সঙ্গে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক স্বার্থ যুক্ত রয়েছে। আমার প্রশ্ন হলো এই পারস্পরিক স্বার্থটা কি? শুল্ক নীতি দু’টি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু এই অর্থনৈতিক স্বার্থ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক নির্ভরতা দেশটি তা রাজনৈতিক ম্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। সেই অবস্থায় বাংলাদেশ চাইলেও মার্কিন প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রভাব বলয় আমাদের নির্বাচন এবং কড়িডোর দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারে। তারা বলতে পারে, তোমরা যদি আমাদের চাহিদা মতো মিয়ানমারকে মানবিক কড়িডোর দাও তাহলে যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর যদি কড়িডোর না দাও তাহলে নির্বাচন হবে না। এদিক থেকে বিবেচনা করলে আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা আছে বলেই আমার মনে হয়। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের উপর আরোপিত উচ্চ হারে বাড়তি শুল্ক রেখে দিয়েছে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই খেলার সঙ্গে নবগঠিত রাজনৈতিক দল এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তারাও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পর্কিত কিনা তা নিয়ে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। নব গঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপি বলছে, আগে সংস্কার করতে হবে তারপর জাতীয় নির্বাচন। সংস্কার ব্যতীত কোনো নির্বাচন তারা অনুষ্ঠিত হতে দেবে না। আমার প্রশ্ন হলো, পুরো সংস্কার কার্যক্রম এক বা দুই মাসে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এ জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে। আমরা কি সংস্কারের জন্য আজীবন অপেক্ষা করবো? নাকি নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজনে সহায়তা করবো। নির্বাচিত সরকারও তো সংস্কার করতে পারবে। আর কিছু সংস্কার কার্যক্রম আছে যা সম্পন্ন করার জন্য পার্লামেন্ট দরকার, নির্বাচিত সরকার প্রয়োজন।
Posted ০৪:৪১ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২৭ জুলাই ২০২৫
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com