নিজস্ব প্রতিবেদক
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ৩৩ বার পঠিত
বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের মোড় ঘোরানো নানা বাঁকে এমন কিছু ক্ষণজন্মা মানুষের দেখা মেলে, যাঁদের জীবন, দর্শন ও কর্ম একটি দেশ ও জাতির পরিচয়ের সাথে সমান্তরালভাবে মিশে যায়। ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশ পুলিশের প্রাক্তন দক্ষ কর্মকর্তা, তৈরি পোশাক ও বীমা খাতের সফল শিল্প-উদ্যোক্তা এবং নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবক প্রয়াত মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস ছিলেন তেমনই এক বহুমাত্রিক ও অনন্য ব্যক্তিত্ব। ২০২৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি এই মহৎপ্রাণ মানুষটি আমাদের ছেড়ে অনাগত ধামে পাড়ি জমান।
১৯৪৯ সালের ৪ঠা মার্চ কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রামের মিয়াবাজারে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস। শৈশব ও কৈশোর থেকেই তাঁর মধ্যে ন্যায়পরায়ণতা, সুদৃঢ় শৃঙ্খলা ও অসাধারণ নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশ লাভ করে। দেশ মাতৃকার সংকটে সাড়া দিতে তিনি পিছপা হননি; ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজের প্রাণ বাজি রেখে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করেন। বীরোচিত এই অধ্যায় তাঁর সারা জীবনের চিন্তা ও কর্মে দেশপ্রেমের মূল প্রেরণা হিসেবে বিদ্যমান ছিল। স্বাধীনতার পর জাতির পুনর্গঠনে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে সিনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান এবং সততা ও আপসহীনতার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা আজ আজও পুলিশ প্রশাসনে গভীর শ্রদ্ধা ও গৌরবের সাথে স্মরণ করা হয়। পুলিশ প্রশাসনের কর্মজীবন শেষে শিল্প উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ—‘সুয়েটার্স খাত’-এর পথিকৃৎ ছিলেন তিনি। তাঁর হাত ধরেই এ দেশে সুয়েটার্স শিল্পের বাণিজ্যিক ও সুসংগঠিত অগ্রযাত্রা সূচিত হয়। বিজিএমইএ-র সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পোশাক খাত যখন নানা আন্তর্জাতিক চাপ ও সংকটের মুখোমুখি, তখন তিনি বীরোচিত ও দূরদর্শী নেতৃত্ব দেন। বিশেষ করে, তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শিশু শ্রম নির্মূলে তাঁর গৃহীত ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের ভাবমূর্তি, মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতাকে অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করে।
উদ্যোক্তা হিসেবে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের প্রতিভা শুধু পোশাক শিল্পেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের বীমা সেবাকে আমজনতার দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন রূপালী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এবং সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড। বিশেষ করে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মাধ্যমে তিনি বীমা খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা, আধুনিক ইআরপি সফটওয়্যারের ব্যবহার এবং দ্রুততম সময়ে বীমাদাবি পরিশোধের এক বৈপ্লবিক সংস্কৃতি গড়ে তোলেন। গ্রাহককেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও করপোরেট শৃঙ্খলার মাধ্যমে সোনালী লাইফকে তিনি লক্ষ লক্ষ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা ও আস্থার প্রধান ভরসাস্থলে পরিণত করেন। সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেও মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও প্রচারবিমুখ। নিজের জন্মমাটি কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি নিরবে-নিভৃতে অসংখ্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। শিক্ষা ও মানবকল্যাণে তাঁর অবদানের সুফল ভোগ করছে হাজার হাজার মানুষ।
মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না; তিনি ছিলেন সততা, সাহস, উদ্যোগ ও ত্যাগনির্ভর একটি আদর্শ। তাঁর রেখে যাওয়া দূরদর্শী চিন্তা, দেশপ্রেম ও মানবসেবার দর্শন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথচলায় চিরকাল আলো ছড়িয়ে যাবে। মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস আমাদের স্মৃতিতে চিরঅম্লান, চিরভাস্বর।
Posted ০৭:৩৬ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com