সজল সরকার
শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬ প্রিন্ট ১৯ বার পঠিত
স্বর্ণ শুধু অলংকারের ধাতু নয়; বিশ্ব অর্থনীতিতে এটি সম্পদ সংরক্ষণ, বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আর্থিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও মূল্যস্ফীতির সময়ে স্বর্ণের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ সাধারণত বাড়ে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে।
এই বাড়তি চাহিদার বিপরীতে বিশ্বে স্বর্ণের নতুন সরবরাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো খনি। বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে খনি থেকে স্বর্ণ উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় ২ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৩ হাজার ৮১৫ টনে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদনের দিক থেকে চীন শীর্ষে রয়েছে। তবে শীর্ষ উৎপাদক দেশগুলোর তালিকায় উত্তর আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর উপস্থিতি বৈশ্বিক স্বর্ণ সরবরাহের বিস্তৃত ভৌগোলিক চরিত্র তুলে ধরে।
নিচে ২০২৫ সালের উৎপাদন তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বের শীর্ষ ১০ স্বর্ণ উৎপাদক দেশের অবস্থান তুলে ধরা হলো।
১. চীন (৩৮০.২ টন):
বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণ উৎপাদক দেশ চীন। ২০২৫ সালে দেশটি প্রায় ৩৮০.২ টন স্বর্ণ উৎপাদন করেছে বলে বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের তথ্যভিত্তিক তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি আসে চীনের খনি থেকে।
চীনের স্বর্ণশিল্পের প্রধান কেন্দ্রগুলোর মধ্যে শানতুং, হেনান ও জিয়াংসি উল্লেখযোগ্য। তবে শুধু উৎপাদন নয়, চীন বিশ্বের অন্যতম বড় স্বর্ণ ভোক্তাও। অলংকার, বিনিয়োগ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মজুত—সব ক্ষেত্রেই দেশটির স্বর্ণের চাহিদা বড়।
বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদও ২০২৫ সালে চীনকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ স্বর্ণ উৎপাদক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
২. রাশিয়া (৩৩০ টন):
শীর্ষ তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া। ২০২৫ সালে দেশটির স্বর্ণ উৎপাদন প্রায় ৩৩০ টন। সাইবেরিয়া ও রাশিয়ার দূরপ্রাচ্য অঞ্চল দেশটির স্বর্ণ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
২০২৫ সালে রাশিয়ার উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছে বলে বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের তথ্য বলছে। বিশাল ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে দেশটির স্বর্ণ খাতের সম্প্রসারণের সুযোগও রয়েছে।
রাশিয়ার জন্য স্বর্ণ শুধু রপ্তানি পণ্য নয়; অর্থনৈতিক ও আর্থিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
৩. অস্ট্রেলিয়া (২৮৪ টন):
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম স্বর্ণ উৎপাদক অস্ট্রেলিয়া। ২০২৫ সালে দেশটির উৎপাদন ছিল প্রায় ২৮৪ টন।
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া দেশটির স্বর্ণশিল্পের প্রাণকেন্দ্র। উন্নত খনি প্রযুক্তি, অবকাঠামো, দক্ষ জনবল ও দীর্ঘদিনের খনিজ অনুসন্ধানের অভিজ্ঞতা অস্ট্রেলিয়াকে বিশ্ব স্বর্ণবাজারের অন্যতম শক্তিশালী সরবরাহকারী করেছে।
২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে অস্ট্রেলিয়ার উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের হিসাবে, বিভিন্ন খনিতে উৎপাদন বৃদ্ধিই এ অগ্রগতির প্রধান কারণ।
৪. কানাডা (প্রায় ২০২ টন):
চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে কানাডা। ২০২৫ সালে দেশটির স্বর্ণ উৎপাদন প্রায় ২০২ টন। অন্টারিও, কুইবেক, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ও নুনাভুটসহ বিভিন্ন অঞ্চলে স্বর্ণের খনি রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, শক্তিশালী খনি অবকাঠামো এবং কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কারণে কানাডার স্বর্ণশিল্প আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৫ সালে কানাডার উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছে। নতুন কয়েকটি খনি চালু হওয়া এবং বিদ্যমান খনিতে উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে এ অগ্রগতি হয়েছে।
৫. যুক্তরাষ্ট্র (১৫৮ টন):
প্রায় ১৫৮ টন উৎপাদন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে পঞ্চম অবস্থানে। দেশটির স্বর্ণ উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র নেভাডা। আলাস্কাসহ আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও স্বর্ণ উত্তোলন করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণশিল্পে আধুনিক প্রযুক্তি ও বৃহৎ পরিসরের খনি পরিচালনার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে নতুন খনি উন্নয়ন, পরিবেশগত বিধিনিষেধ ও অনুমোদন প্রক্রিয়া ভবিষ্যৎ উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৫ সালের স্বর্ণ উৎপাদনের তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপের সর্বশেষ খনিজ প্রতিবেদনেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
৬. ঘানা (১৪০.৬ টন):
আফ্রিকার স্বর্ণশক্তি হিসেবে ঘানার অবস্থান দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। ২০২৫ সালে দেশটির উৎপাদন প্রায় ১৪০.৬ টন, যা দেশটিকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ উৎপাদকের তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে রেখেছে।
২০২৫ সালে ঘানার উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের হিসাবে, দেশটির উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বা ৩৪ টন বেড়েছে। নতুন প্রকল্পের উৎপাদন এবং ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্রতর খনির উৎপাদন বৃদ্ধিও এতে ভূমিকা রেখেছে।
স্বর্ণ ঘানার রপ্তানি আয় ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৭. মেক্সিকো (১৪০.৩ টন):
প্রায় ১৪০.৩ টন উৎপাদন নিয়ে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে মেক্সিকো। দেশটির উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন খনি থেকে স্বর্ণ উত্তোলন করা হয়।
মেক্সিকো ঐতিহাসিকভাবে রূপা উৎপাদনের জন্য পরিচিত হলেও স্বর্ণও দেশটির খনিজ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিক খনি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ এবং নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সহায়তা করছে।
স্বর্ণ ও রূপা দুই ধরনের মূল্যবান ধাতুর বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় মেক্সিকোর অবস্থান উল্লেখযোগ্য।
৮. ইন্দোনেশিয়া (১৪০.১ টন)
ইন্দোনেশিয়া প্রায় ১৪০.১ টন উৎপাদন নিয়ে শীর্ষ দশে রয়েছে। দেশটির অন্যতম পরিচিত খনি হলো গ্রাসবার্গ, যা স্বর্ণ ও তামা দুই ধরনের খনিজের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার স্বর্ণ উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় কমেছে। বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের হিসাবে, দেশটির উৎপাদন ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বা ৩৬ টন কমে যায়। ফলে উচ্চ উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যে ইন্দোনেশিয়াই ছিল উল্লেখযোগ্য পতন দেখা যাওয়া দেশগুলোর একটি।
৯. পেরু (১৩৬.৯ টন):
দক্ষিণ আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ স্বর্ণ উৎপাদক পেরু। ২০২৫ সালে দেশটির উৎপাদন প্রায় ১৩৬.৯ টন।
পেরুর অর্থনীতিতে খনিজ সম্পদের বড় ভূমিকা রয়েছে। স্বর্ণের পাশাপাশি দেশটি তামা ও অন্যান্য ধাতুরও গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদক।
তবে স্বর্ণ খাতের ক্ষেত্রে পরিবেশ, অবৈধ খনন এবং ক্ষুদ্র খনি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্বর্ণের দাম বাড়লে দেশটির খনি খাতে বিনিয়োগের আগ্রহও বাড়তে পারে।
১০. উজবেকিস্তান (১২৯.১ টন):
শীর্ষ ১০-এর শেষ অবস্থানে রয়েছে মধ্য এশিয়ার দেশ উজবেকিস্তান। ২০২৫ সালে দেশটির স্বর্ণ উৎপাদন প্রায় ১২৯.১ টন।
উজবেকিস্তানের মুরুনতাউ খনি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণখনি হিসেবে পরিচিত। দেশটির অর্থনীতিতে স্বর্ণ রপ্তানির গুরুত্ব অনেক।
খনি আধুনিকীকরণ, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন প্রকল্প উন্নয়নের মাধ্যমে উজবেকিস্তান ভবিষ্যতে বৈশ্বিক স্বর্ণ সরবরাহে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রেকর্ড উৎপাদনের পেছনে কী?
২০২৫ সালে বিশ্বে খনি থেকে স্বর্ণ উৎপাদন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোর পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করেছে। নতুন খনি ও প্রকল্প চালু হওয়া, পুরোনো খনিতে উৎপাদন বাড়ানো এবং উচ্চ স্বর্ণমূল্যের কারণে খনি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ও উৎপাদন আগ্রহ বৃদ্ধি এসবই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে একই সময়ে খনি পরিচালনার ব্যয়ও বেড়েছে। বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের হিসাবে, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে স্বর্ণ খাতের গড় সর্বমোট টেকসই উৎপাদন ব্যয় প্রতি আউন্সে রেকর্ড ১,৭০৬ ডলারে পৌঁছায়, যা এক বছর আগের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি।
স্বর্ণের ভবিষ্যৎ কোথায়?
বিশ্ব স্বর্ণবাজারে এখন শুধু উৎপাদনের পরিমাণ নয়, উৎপাদন ব্যয়, পরিবেশগত ঝুঁকি, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাহিদাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীন ও রাশিয়ার মতো বড় উৎপাদকদের পাশাপাশি ঘানা, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার উৎপাদন বৃদ্ধিও বৈশ্বিক সরবরাহে প্রভাব ফেলছে।
বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট খনি উৎপাদন ৩,৮১৫ টনে পৌঁছানো ছিল নতুন রেকর্ড। একই সঙ্গে তথ্য সংগ্রহ ও ক্ষুদ্র খনি খাতের হিসাব উন্নত হওয়ায় ভবিষ্যতে বিভিন্ন দেশের উৎপাদন পরিসংখ্যানে আরও সংশোধন আসতে পারে।
বিশ্বের স্বর্ণ উৎপাদনের কেন্দ্র এখন আর কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এশিয়া, ইউরোপ-এশিয়া অঞ্চল, উত্তর আমেরিকা, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ মিলে একটি বিস্তৃত সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করেছে। স্বর্ণের দাম ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে এই মূল্যবান ধাতুর উৎপাদন, মজুত ও বাণিজ্য আগামী দিনেও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে থাকবে।
শীর্ষ ১০ দেশের তালিকা এক নজরে:
অবস্থান দেশ ২০২৫ সালের স্বর্ণ উৎপাদন
১ চীন ৩৮০.২ টন
২ রাশিয়া ৩৩০.০ টন
৩ অস্ট্রেলিয়া ২৮৪.০ টন
৪ কানাডা ২০২.১ টন
৫ যুক্তরাষ্ট্র ১৫৮.০ টন
৬ ঘানা ১৪০.৬ টন
৭ মেক্সিকো ১৪০.৩ টন
৮ ইন্দোনেশিয়া ১৪০.১ টন
৯ পেরু ১৩৬.৯ টন
১০ উজবেকিস্তান ১২৯.১ টন
(এই তালিকার টনসংখ্যাগুলো বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের ২০২৫ সালের উৎপাদনভিত্তিক তথ্য থেকে নেওয়া।)
Posted ০৮:০৬ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com