অনলাইন ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ প্রিন্ট ৩৬ বার পঠিত
প্রবাসী আয় কমেছে ১৬.৪ শতাংশ, হুন্ডি নিরুৎসাহিত করতে তিন বিকল্প প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকের
মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশিদের প্রবাসী আয় দেশে পাঠানো সহজ, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ করতে দেশটিতে বাংলাদেশি ব্যাংকের শাখা স্থাপন এবং বিকল্প মুদ্রা নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে মালদ্বীপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মালদ্বীপ মনিটারি অথরিটির (এমএমএ) সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি স্থানীয় মুদ্রা রুফিয়া ব্যবহার করে লেনদেন নিষ্পত্তি, কার্ডভিত্তিক পরিশোধ এবং দ্বিপক্ষীয় কারেন্সি সোয়াপ চালুর সম্ভাবনাও যাচাই করতে চায় তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্য, প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর খরচ ও জটিলতা কমিয়ে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের ব্যবহার বাড়ানো। একই সঙ্গে হুন্ডিসহ অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশে প্রবাসী আয়ের আনুষ্ঠানিক প্রবাহ জোরদার করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “প্রবাসী আয় যাতে বৈধ পথে দেশে আসে, সে জন্য মালদ্বীপে বাংলাদেশি ব্যাংকের শাখা খোলার চেষ্টা করছি।”
এ বিষয়ে সহযোগিতা চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. মোস্তাকুর রহমান মালদ্বীপ মনিটারি অথরিটির গভর্নর আহমেদ মুনাওয়ারকে চিঠি পাঠিয়েছেন। এখন মালদ্বীপের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ।
উদ্যোগটি এগিয়ে নিতে সম্প্রতি মালদ্বীপে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈঠকে দেশটিতে বাংলাদেশি ব্যাংকের শাখা স্থাপন, প্রবাসীদের ব্যাংকিং সেবার সুযোগ বাড়ানো এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা জানান, ব্র্যাক ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকসহ বাংলাদেশের কয়েকটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক মালদ্বীপে শাখা স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে। বর্তমানে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ভারতের কয়েকটি ব্যাংক মালদ্বীপে শাখা পরিচালনা করছে। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর জন্য এসব কার্যক্রম সম্ভাব্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে মালদ্বীপে শাখা স্থাপনের বিষয়টি দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর করবে।
মালদ্বীপ থেকে বাংলাদেশে প্রবাসী আয় কমে যাওয়াও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগের অন্যতম প্রেক্ষাপট। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেশভিত্তিক রেমিট্যান্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মালদ্বীপ থেকে দেশে এসেছে ১১ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ১৪ কোটি ১১ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরে রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ১৬.৪ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে মালদ্বীপ থেকে দেশে এসেছে ৩ কোটি ৮০ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতা এবং বৈধ চ্যানেল ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা প্রবাসীদের জন্য বাড়তি সমস্যা তৈরি করছে। এ কারণে অর্থ স্থানান্তরব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও কম ব্যয়বহুল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ব্যাংকের শাখা স্থাপনের উদ্যোগের পাশাপাশি মালদ্বীপ থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠানো সহজ করতে তিনটি বিকল্প ব্যবস্থা প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গত ৮ অক্টোবর মালদ্বীপ মনিটারি অথরিটির গভর্নরের কাছে পাঠানো চিঠিতে গভর্নর ড. মোস্তাকুর রহমান দুই দেশের মুদ্রা কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় নিরাপদ, দক্ষ, স্বচ্ছ ও কম খরচের রেমিট্যান্স ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
প্রথম প্রস্তাব: স্থানীয় মুদ্রা রুফিয়ায় নিষ্পত্তি
এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (এসিইউ) আওতায় উপযুক্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে মালদ্বীপের স্থানীয় মুদ্রা রুফিয়া ব্যবহার করে লেনদেন নিষ্পত্তির সম্ভাবনা যাচাই করতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ব্যবস্থায় মালদ্বীপ থেকে পাঠানো অর্থের বিপরীতে বাংলাদেশে উপকারভোগীরা অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকের মাধ্যমে সমপরিমাণ টাকা পাবেন।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রতিবার রুফিয়া থেকে মার্কিন ডলারে রূপান্তরের প্রয়োজন কমতে পারে। এতে লেনদেনের খরচ ও মুদ্রা বিনিময়সংক্রান্ত জটিলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয় প্রস্তাব: রুফিয়ায় ভ্রমণসংক্রান্ত পরিশোধ
মালদ্বীপের লাইসেন্সধারী ব্যাংক ও অর্থ স্থানান্তর প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশি নাগরিকদের যোগ্য ভ্রমণসংক্রান্ত পরিশোধ রুফিয়ায় করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো টাকাভিত্তিক কার্ড ইস্যু করবে। দুই দেশের সমন্বিত নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় এসব লেনদেনের নিষ্পত্তি হবে। এর মাধ্যমে ভ্রমণসংক্রান্ত বৈধ পরিশোধে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য আরও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
তৃতীয় প্রস্তাব: দ্বিপক্ষীয় কারেন্সি সোয়াপ
বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় কারেন্সি সোয়াপ ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ধরনের ব্যবস্থায় দুই দেশের মুদ্রা কর্তৃপক্ষের মধ্যে নির্ধারিত শর্তে নিজ নিজ মুদ্রা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায়, এ উদ্যোগ কার্যকর হলে বাংলাদেশি কর্মীদের উপার্জন দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আরও সহজ করার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে তিনটি প্রস্তাবের কোনোটিই এখনো বাস্তবায়িত হয়েছে বলে নিশ্চিত তথ্য নেই। এসব উদ্যোগ কার্যকর করতে দুই দেশের আইন, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
মালদ্বীপে এক লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে মোট বিদেশি কর্মীর সংখ্যা দুই লাখের বেশি, যার মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা এক লাখেরও বেশি।
এত বড় বাংলাদেশি কর্মীসমাজ থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় মুদ্রা রুফিয়া ব্যবহার করে সরাসরি বাংলাদেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। স্থানীয় ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোর রুফিয়া সরাসরি গ্রহণে অনীহার কারণে প্রবাসীদের অনেকে বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে সমস্যায় পড়েন।
ফলে অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের প্রথমে অনানুষ্ঠানিক বাজার থেকে মার্কিন ডলার কিনতে হয়। পরে সেই ডলার ব্যাংক বা এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। এই প্রক্রিয়ায় মুদ্রা রূপান্তরের খরচের পাশাপাশি অতিরিক্ত কমিশন যুক্ত হওয়ায় অর্থ পাঠানো আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ ধরনের জটিলতা বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর আগ্রহ কমাতে পারে। এতে হুন্ডিসহ অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তরব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এর ফলে দেশের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবাসী আয়ের প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থাগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও মালদ্বীপে বাংলাদেশ মিশনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি যৌথ প্রতিনিধিদল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রতিনিধিদল মালদ্বীপ মনিটারি অথরিটির সঙ্গে বৈঠক করতে প্রস্তুত।
সম্ভাব্য বৈঠকে ব্যাংকের শাখা স্থাপনের শর্ত, পরিচালনাগত বিষয়, মুদ্রা নিষ্পত্তির কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক অনুমোদন নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, মালদ্বীপে বাংলাদেশি ব্যাংকের উপস্থিতি বাড়ানো এবং বিকল্প মুদ্রা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালু করা গেলে প্রবাসীদের জন্য আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ পাঠানো আরও সহজ হবে। এতে লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি অর্থ স্থানান্তরের খরচ কমানো এবং অনানুষ্ঠানিক বাজারের ওপর নির্ভরতা হ্রাসের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে উদ্যোগটির সাফল্য নির্ভর করছে মালদ্বীপের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিবাচক সাড়া, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং দুই দেশের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর। প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স পাঠানোর অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন আসতে পারে এবং বৈধ পথে দেশে অর্থ পাঠানোর প্রবাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
Posted ০৩:৩৮ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | Animator Alif
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com
✎ মন্তব্য করুন