|

Advertisement
×

ক্যাশলেস বাংলাদেশের স্বপ্ন: প্রযুক্তির অগ্রগতি, আস্থার সংকট ও ই-ক্যাবের করণীয়

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬   প্রিন্ট   ৩৮ বার পঠিত

ক্যাশলেস বাংলাদেশের স্বপ্ন: প্রযুক্তির অগ্রগতি, আস্থার সংকট ও ই-ক্যাবের করণীয়

ডিজিটাল কেনাকাটা, কিন্তু লেনদেনের শেষ ধাপে নগদ

কিশোরগঞ্জের একজন নারী উদ্যোক্তা ফেসবুক পেজে শাড়ি বিক্রি করেন। ঢাকার এক ক্রেতা মুঠোফোনে পণ্যের ছবি দেখেন, দরদাম করেন, ঠিকানা দেন এবং অর্ডার নিশ্চিত করেন। পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হলেও টাকা পরিশোধের সময় ক্রেতা পণ্য হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন। কুরিয়ারকর্মী পণ্য পৌঁছে দিয়ে নগদ অর্থ সংগ্রহ করেন। এরপর সেই টাকা বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে কয়েক দিন পর পৌঁছায় বিক্রেতার হাতে।

এই চিত্র বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তুলে ধরে। পণ্য খোঁজা, অর্ডার দেওয়া ও যোগাযোগের ব্যবস্থা প্রযুক্তিনির্ভর হয়েছে, কিন্তু লেনদেনের শেষ ধাপে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে।

কেন এমন হচ্ছে? উত্তরটি শুধু প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতায় খুঁজলে চলবে না। ক্রেতার কাছে অগ্রিম অর্থ পরিশোধের পর পণ্য না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, বিক্রেতার জন্য বিক্রির অর্থ দ্রুত পাওয়া, লেনদেনের খরচ কমানো এবং সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি সামলানো গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, ক্যাশলেস অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু ডিজিটাল পেমেন্টের সুযোগ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সেই ব্যবস্থাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশের পথে ই-কমার্স ও ই-ক্যাবের ভূমিকা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই আস্থার সংকটকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ বাড়লেই নগদনির্ভরতা কমবে না। এর জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য পেমেন্ট ব্যবস্থা, কার্যকর ভোক্তা সুরক্ষা, স্বচ্ছ নীতিমালা এবং ব্যবসায়ীদের জবাবদিহি।

ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার, নগদনির্ভরতার বাস্তবতা

বাংলাদেশে ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশে ইন্টারনেট সাবস্ক্রিপশনের সংখ্যা ১৩ কোটি ৫৯ লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ১২ কোটি ৮ লাখের বেশি মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ। তবে সাবস্ক্রিপশনের সংখ্যা স্বতন্ত্র ব্যবহারকারীর সংখ্যা নয়; একজন ব্যক্তি একাধিক সংযোগ ব্যবহার করতে পারেন।

মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এ খাতে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের ১৩ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকার তুলনায় ২৮ দশমিক ৪২ শতাংশ বেশি। ওই বছর দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা।

ব্যাংক কার্ডের ব্যবহারও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে ব্যাংক কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৭০ লাখ। ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে ৫ কোটি ২৯ লাখে পৌঁছায়। একই সময়ে মাসিক কার্ড লেনদেনের পরিমাণ ২৪ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৪৯ হাজার ৭৭০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাসিক লেনদেন ৪৬ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৯১৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে এমএফএসের মাসিক লেনদেনও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে এসব পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যায় সতর্কতা প্রয়োজন। এমএফএসের মোট লেনদেনের মধ্যে টাকা জমা ও উত্তোলনসহ এমন কিছু কার্যক্রম রয়েছে, যেগুলো সরাসরি পণ্য বা সেবার মূল্য পরিশোধের সমতুল্য নয়। একইভাবে, একাধিক হিসাব ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের কারণে হিসাবের সংখ্যা প্রকৃত গ্রাহকসংখ্যার চেয়ে বেশি হতে পারে। ফলে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার তথ্যকে নগদ অর্থের ব্যবহার একই হারে কমে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না।

বাংলাদেশের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো, ডিজিটাল লেনদেনের এই বিস্তার দৈনন্দিন কেনাকাটা ও ব্যবসায়িক লেনদেনে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে।

বাংলা কিউআর: সম্ভাবনা আছে, প্রয়োজন আরও বিস্তার

ক্যাশলেস অর্থনীতির প্রসারে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম উদ্যোগ বাংলা কিউআর। একটি কিউআর কোড ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার অ্যাপ থেকে অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি করাই এই ব্যবস্থার মূল সুবিধা। এতে ব্যবসায়ীদের আলাদা আলাদা পেমেন্ট ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমতে পারে এবং ক্রেতাদের জন্য লেনদেন সহজ হতে পারে।

২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাংলা কিউআর ব্যবহারের নির্দেশনা কার্যকর হওয়ার ফলে এ ব্যবস্থার সম্প্রসারণে নতুন গতি এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৩৯ লাখ মার্চেন্ট পয়েন্টে এ সেবা পাওয়া যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুনে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে দৈনিক গড়ে প্রায় এক লাখ লেনদেনে ২৮ কোটি টাকার বেশি অর্থ পরিশোধ হতো। পরবর্তী সময়ে দৈনিক লেনদেনের সংখ্যা বেড়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ এবং লেনদেনের মূল্য ১৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকায় পৌঁছায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানও বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেন সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১ অক্টোবর থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেনের মাশুল শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। আগামী নভেম্বর থেকে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মধ্যে (পিটুপি) বাংলা কিউআর লেনদেন চালুর পরিকল্পনার কথাও তিনি জানিয়েছেন। এর ফলে বিভিন্ন পেশার মানুষ নিজস্ব কিউআর কোড ব্যবহার করে অর্থ গ্রহণের সুযোগ পেতে পারেন।

তবে কিউআর কোডের ব্যবহার বাড়লেই ক্যাশলেস অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে না। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যদি সহজে কোড সংগ্রহ করতে না পারেন, লেনদেনের অর্থ পেতে বিলম্ব হয় অথবা ভুল লেনদেনের সমাধান না পান, তাহলে নতুন প্রযুক্তির সুবিধা তাঁর কাছে সীমিত হয়ে পড়বে। তাই প্রযুক্তির সম্প্রসারণের পাশাপাশি ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা উন্নত করাও জরুরি।

ক্যাশ অন ডেলিভারি কেন এখনো জনপ্রিয়

বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজারে ক্যাশ অন ডেলিভারি বা পণ্য হাতে পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধের প্রবণতা ক্রেতাদের আস্থার সংকট বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

ই-ক্যাবের একটি গবেষণার বরাতে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রশাসন জানিয়েছে, দেশের ই-কমার্স ব্যবহারকারীদের ৯০ শতাংশের বেশি ক্যাশ অন ডেলিভারি পছন্দ করেন। অন্য একটি পেমেন্ট-শিল্পভিত্তিক সূত্রে এ পদ্ধতির অংশ ৭৫ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। একই সূত্রে ডিজিটাল ওয়ালেটের অংশ ১১ শতাংশ, ক্রেডিট কার্ডের ৮ শতাংশ এবং ডেবিট কার্ডের ৬ শতাংশ বলা হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের পরিসংখ্যানে পার্থক্য থাকলেও অনলাইন কেনাকাটায় ক্যাশ অন ডেলিভারির গুরুত্ব স্পষ্ট।

এর পেছনে রয়েছে বাস্তব অভিজ্ঞতা। ইভ্যালিসহ কয়েকটি অনলাইন বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্মের ব্যর্থতা এবং অগ্রিম অর্থ নেওয়ার পর পণ্য সরবরাহে অনিয়মের ঘটনা ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে পণ্য হাতে পাওয়ার আগে টাকা না দেওয়াকে অনেকেই নিজেদের সুরক্ষার উপায় হিসেবে দেখেন।

এই পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের শুধু ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারে উৎসাহিত করলেই হবে না; অগ্রিম অর্থ পরিশোধের ঝুঁকি কমানোর কার্যকর ব্যবস্থাও তৈরি করতে হবে। পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত না হলে অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে কি না, অভিযোগ করলে প্রতিকার মিলবে কি না এবং বিক্রেতা কতটা বিশ্বাসযোগ্য—এসব প্রশ্নের উত্তর না পেলে ক্রেতারা পরিচিত নগদনির্ভর পদ্ধতি ছাড়তে চাইবেন না।

অন্যদিকে, ক্যাশ অন ডেলিভারির কারণে ব্যবসায়ীদেরও বাড়তি ব্যয় বহন করতে হয়। কুরিয়ারকর্মীর মাধ্যমে নগদ অর্থ সংগ্রহ, অর্থ নিষ্পত্তিতে বিলম্ব, পণ্য ফেরত আসা এবং নগদ অর্থ পরিবহনের ঝুঁকি পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। বিক্রির অর্থ দেরিতে হাতে এলে সীমিত মূলধনের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নতুন পণ্য কেনা, সরবরাহকারীর পাওনা পরিশোধ এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে সমস্যা হয়।

দারাজের তথ্য অনুযায়ী, তাদের প্ল্যাটফর্মের প্রায় ৯৫ শতাংশ বিক্রেতা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা। এ পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসার শুধু ক্রেতার সুবিধার বিষয় নয়; এটি ক্ষুদ্র ব্যবসার অর্থপ্রবাহ ও দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গেও যুক্ত।

ই-কমার্সের সম্ভাবনা ও তথ্যের সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজারের সম্প্রসারণ ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর বড় সুযোগ তৈরি করেছে। ই-ক্যাবের প্রশাসকের একটি লেখায় বাজারের আকার ২০২৩ সালে প্রায় ৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০২৪ সালে ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার উল্লেখ করা হয়েছে। একই সূত্রে ২০২৮ সালে বাজারের আকার ৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে।

অন্যদিকে, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) আগের একটি প্রাক্কলনে ২০২৬ সালেই বাজারের আকার ১০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুমানে এই পার্থক্য বাজারের প্রকৃত আকার নির্ধারণে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেয়।

ই-ক্যাবের ওই লেখায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের মোট খুচরা বাণিজ্যের আনুমানিক ৩ থেকে ৫ শতাংশ অনলাইনে সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ, বাজারের সম্ভাবনা বড় হলেও সামগ্রিক খুচরা বাণিজ্যের তুলনায় ই-কমার্সের অংশ এখনো সীমিত।

এই অবস্থায় নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য বাজারতথ্য প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইনে কত অর্ডার হচ্ছে, কতগুলোতে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে, কী পরিমাণ পণ্য ফেরত আসছে এবং ক্রেতাদের অর্থ ফেরত দিতে গড়ে কত সময় লাগছে—এসব তথ্য ছাড়া বাজারের প্রকৃত অবস্থা বোঝা কঠিন।

কার্ডভিত্তিক ই-কমার্স লেনদেনেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ই-ক্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ ধরনের লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ হাজার ৩৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। তবে এই প্রবৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় না যে অনলাইন কেনাকাটার সব ক্ষেত্রেই নগদ অর্থের ব্যবহার একই গতিতে কমছে।

আস্থা তৈরিতে ই-ক্যাবের চারটি অগ্রাধিকার

২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করা ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) দেশের ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন। নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সংলাপ, সদস্যদের সক্ষমতা উন্নয়ন এবং খাতের মানোন্নয়নে সংগঠনটির ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।

সিএসইআরের বিশ্লেষণে এই ভূমিকার কয়েকটি দিক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, বিক্রেতার বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই ও অভিন্ন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা। সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক পরিচয় যাচাই, পণ্যের বিবরণে স্বচ্ছতা, অর্ডার বাতিলের নিয়ম, অর্থ ফেরতের সময়সীমা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির পদ্ধতি নির্ধারণ করা যেতে পারে। এসব মানদণ্ড বাস্তবায়নে নিয়মিত তদারকি ও নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এতে ক্রেতারা নির্ভরযোগ্য বিক্রেতা শনাক্ত করতে পারবেন এবং দায়িত্বশীল ব্যবসায়ীরা বাড়তি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাবেন।

দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল পেমেন্টে যুক্ত করা। ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসাসহ ছোট অনলাইন উদ্যোগের জন্য সহজ পেমেন্ট লিংক, বাংলা কিউআর এবং স্বয়ংক্রিয় হিসাব সংরক্ষণের ব্যবস্থা জনপ্রিয় করা প্রয়োজন। ব্যাংক, এমএফএস প্রতিষ্ঠান ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কম খরচে এসব সেবা নিশ্চিত করা যেতে পারে। পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেন গ্রহণ, অর্থ ফেরত দেওয়া, হিসাব সংরক্ষণ ও প্রতারণা শনাক্ত করার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, ক্ষুদ্র ব্যবসাবান্ধব নীতিকাঠামো গড়ে তোলা। ই-ক্যাবের পক্ষ থেকে প্ল্যাটফর্ম কমিশনের ওপর মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের হার ৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে বৃদ্ধিকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বাড়তি চাপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আন্তঃসীমান্ত ই-কমার্সের নীতিমালা নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে। রাজস্ব আহরণ ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি এমন নীতিকাঠামো প্রয়োজন, যাতে আনুষ্ঠানিক ডিজিটাল লেনদেনে অংশ নেওয়ার কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিক ব্যয়ের মুখে না পড়েন। অতিরিক্ত খরচ ও নিয়মের অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা এড়িয়ে চলতে উৎসাহিত করলে ক্যাশলেস অর্থনীতির লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হবে।

চতুর্থত, বাজারের নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ। ব্যাংক, পেমেন্ট সেবাদাতা, এমএফএস প্রতিষ্ঠান এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমন্বয় করে বাজারের আকার, অর্ডারের সংখ্যা, পেমেন্ট পদ্ধতিভিত্তিক লেনদেন, পণ্য ফেরতের হার ও অর্থ ফেরতের সময় নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা যেতে পারে। অভিন্ন সংজ্ঞা ও পরিমাপ পদ্ধতি অনুসরণ করলে নীতিনির্ধারক, বিনিয়োগকারী এবং উদ্যোক্তারা বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

ক্রেতার সুরক্ষা ও বিক্রেতার নিশ্চয়তা—দুটিই জরুরি

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি কয়েকটি বাস্তব উদ্যোগ ডিজিটাল পেমেন্টের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে।

প্রথমত, প্রিপেইড অর্ডারে যুক্তিসংগত ছাড় বা বিনা ডেলিভারি চার্জের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ক্যাশ অন ডেলিভারির ক্ষেত্রে নগদ সংগ্রহ ও নিষ্পত্তিতে যে ব্যয় হয়, তার একটি অংশ সাশ্রয় করা সম্ভব হলে সেই সুবিধা ক্রেতার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে। তবে এ ধরনের প্রণোদনা যেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর নতুন আর্থিক চাপ সৃষ্টি না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পণ্য সরবরাহ ও অর্থ পরিশোধের মধ্যে নিরাপদ সমন্বয় প্রয়োজন। পণ্য ক্রেতার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত অর্থ নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের কাছে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে বিক্রেতা অর্থ পাবেন; পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতা বা প্রমাণিত বিরোধের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়মে অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর করতে স্পষ্ট শর্ত, বিরোধ নিষ্পত্তির নিয়ম এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, অভিযোগ নিষ্পত্তি আরও সহজ করতে হবে। ভুল হিসাবে অর্থ চলে যাওয়া, ব্যর্থ লেনদেন, পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতা কিংবা প্রতারণার ঘটনায় ক্রেতা ও বিক্রেতা কোথায় যোগাযোগ করবেন, তা পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে। ব্যাংক ও পেমেন্ট সেবাদাতাদের অভিযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর গ্রাহকসেবা সমন্বয় করা গেলে প্রতিকার পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।

চতুর্থত, আর্থিক ও ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়াতে হবে। ভুয়া পেজ শনাক্ত করা, সন্দেহজনক লিংক এড়িয়ে চলা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা এবং নিরাপদে অর্থ পরিশোধের নিয়ম সম্পর্কে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কে সচেতন করা জরুরি। ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা ও ভোক্তা সুরক্ষার গুরুত্বও বাড়বে।

নগদকে সরিয়ে দেওয়া নয়, ডিজিটালকে নির্ভরযোগ্য করে তোলা

ক্যাশলেস অর্থনীতি বলতে নগদ অর্থ নিষিদ্ধ করা বোঝায় না। এর লক্ষ্য এমন একটি আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে ডিজিটাল লেনদেন হবে নগদের তুলনায় সহজ, সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য। মানুষ বাধ্য হয়ে নয়, সুবিধা ও নিরাপত্তার কারণে ডিজিটাল পদ্ধতি বেছে নেবেন।

বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামো বিস্তৃত হয়েছে, মোবাইল আর্থিক সেবার ব্যবহার বেড়েছে এবং বাংলা কিউআর নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন এই অগ্রগতিকে দৈনন্দিন বাণিজ্যে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো। এর জন্য ক্রেতাকে অগ্রিম অর্থ পরিশোধের পর পণ্য পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে, বিক্রেতাকে দ্রুত অর্থ নিষ্পত্তির সুযোগ দিতে হবে এবং লেনদেনে সমস্যা হলে কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।

ই-ক্যাবের সামনে তাই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। সংগঠনটি যদি বিশ্বাসযোগ্যতার অভিন্ন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল পেমেন্টে যুক্ত করা, বাজারের নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ এবং নীতিগত সমন্বয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে ক্যাশলেস অর্থনীতির পথে অগ্রগতি ত্বরান্বিত হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত ক্যাশলেস বাংলাদেশের সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু কতটি কিউআর কোড চালু হলো বা কত টাকার ডিজিটাল লেনদেন হলো, তা দিয়ে নয়। সাফল্য নির্ভর করবে একজন ক্রেতা কতটা নিশ্চিন্তে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন, একজন উদ্যোক্তা কত দ্রুত বিক্রির অর্থ হাতে পাচ্ছেন এবং প্রতারণা বা ভুল লেনদেনের ঘটনায় কতটা কার্যকর প্রতিকার মিলছে, তার ওপর।

প্রযুক্তি ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই অর্থনীতিকে টেকসই করবে মানুষের আস্থা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি।

Facebook Comments Box
✎ মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Posted ০১:০৩ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com