সোমবার ৮ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Ad
x
সাক্ষাৎকার : অধ্যাপক ড.তানিয়া হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কন্যা শিশুকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে

রবিবার, ১২ অক্টোবর ২০২৫   প্রিন্ট   ২৬৩ বার পঠিত

কন্যা শিশুকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে

১১অক্টোবর ছিল আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস। এ উপলক্ষে বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস পালিত হয়। আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে কন্যা শিশুদের অবস্থান অন্যান্য বিষয় জানার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সাবেক প্রধান, অধ্যাপক ড. তানিয়া হকের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে তিনি কন্যা শিশুদের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে বর্ণনা করেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন এম এ খালেক। ড. তানিয়া হকের সাক্ষাৎকারেরে বিবরণ এখানে উল্লেখ করা হলো:

দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবসের তাৎপর্য সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?

অধ্যাপক ড.তানিয়া হক: গতকাল (১১ অক্টোবর) বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোও নানা কর্মসূচির আয়োজন করে। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস পালন করা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কন্যা শিশুদের অধিকার আদায়ের জন্য দাবি উত্থাপন করা হয়। ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সর্বসম্মতভাবে আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহীত হয়। তৎপ্রেক্ষিতে পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর তারিখকে ‘আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে প্রতি বছর ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। মূলত কন্যা শিশুর প্রতি বৈষম্যরোধ এবং তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবন পালন করা হচ্ছে। সেই থেকে প্রতি বছর বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস পালন করে আসছে। বছরে একদিন কন্যা শিশুদের অধিকার নিয়ে কথা বলা বা সোচ্চার হওয়াটাই এই দিন পালনের মূল উদ্দেশ্য নয়। পরিবার,সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নারীদের প্রতি যে বৈষম্যমূলক দৃষ্টি ভঙ্গি পোষণ করা হয় তা নিরসনের জন্যই আন্তর্জাতিক কন্যা দিবস পালন করা হয়। আজকে যারা কন্যা শিশু আগামীতে তারাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এবং দায়িত্ব পালন করবে। তাই তাদের যদি শিশুকাল থেকেই সেভাবে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা না যায় তাহলে ভবিষ্যতে তারা অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো শিশুদের যাতে সঠিকভাবে গড়ে তোলা যায়। তারা যেনো দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। একটি মানুষের জন্য তার শিশু কাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কেউ যদি শিশুকালে সঠিকভাবে গড়ে উঠতে না পারে তার পক্ষে ভবিষ্যৎ জীবনে সফল হওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। শিশুকালেই একটি মানুষের চিন্তা শক্তি বিকশিত হয়। কাজেই শিশু কালকে সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।

দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্থেকই নারী। নারীদের অবহেলিত রেখে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব বলে মনে করেন কি?

অধ্যাপক ড.তানিয়া হক: বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। আর শিশুদের মধ্যে নারী শিশুর হার ৫০ শতাংশের মতো। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে অবহেলিত বা উপেক্ষিত রেখে কখনোই সুষম জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই নারী এবং মেয়ে শিশুদের প্রতি পারিবারিক এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আরো উদার এবং ঘটনমূলক হওয়া আবশ্যক। প্রশ্ন হলো,নারী শিশু বলতে আমরা কাদের বুঝবো? বাংলাদেশের প্রচলিত আইন মোতাবেক কোন ব্যক্তির বয়স ১৮ বছর পূর্ণ না হলে তাকে শিশু বলা হয়। সে মোতাবেক কোন নারীর বয়স ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কন্যা শিশু বলা হয়। শিশুরা রাষ্ট্রীয় ভাবে নানা ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাবার অধিকারি। সে হিসেবে নারী শিশুরাও অন্যদের মতো সমান অধিকার পাবার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে,আমাদের দেশে এখনো কন্যা শিশুদের প্রতি সমাজে এবং রাষ্ট্র,এমনকি পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি ততটা উদার নয়,যতটা উদার একজন ছেলে শিশুর প্রতি। আমাদের দেশের সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে এখনো কন্যা শিশুকে কার্যত ‘দ্বিতীয় শ্রেণির’ নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শুধু সমাজ বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নয় একজন কন্যা শিশু তার পরিবারিক পরিমন্ডলেও নানাভাবে অবহেলিত হয়ে থাকে। ছেলে শিশুর চেয়ে কন্যা শিশুকে কম গুরুত্ব দেয়া হয়। অধিকাংশ পরিবারের অভিভাবকগণ মনে করেন, ছেলে শিশু বড় হয়ে সংসারের হাল ধরবে। আর কন্যা শিশু বড় হয়ে শ্বশুর বাড়ি চলে যাবে। আর সেখানে তাকে সাংসারিক কাজ-কর্মই করতে হবে। তাই পরিবার থেকেও ছেলে শিশুকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। কিন্তু একবারও ভাবা হয়না একটি মেয়ে যদি উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে তাহলে সেও পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারে। সমাজ,সংসার এবং রাষ্ট্র প্রতিটি ক্ষেত্রেই মেয়ে শিশুরা অবহেলিত হচ্ছে। আমাদের সমাজে যেসব পরিবার উচ্চ শিক্ষিত এবং সচেতন তারা ইদানিং মেয়ে শিশুদের গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। এটা অবশ্যই প্রশসংনীয় ব্যাপার। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখনো মেয়ে শিশুরা ছেলে শিশুদের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে না। আমরা নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলি। কিন্তু কিভাবে একটি মেয়েকে ক্ষমতায়িত করা যায় তা নিয়ে আমাদের মধ্যে সঠিক ধারনার অভাব রয়েছে। একটি মেয়ে যদি আধুনিক শিক্ষায় উপযুক্ত শিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠে শুধু তাহলেই নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব। নারীর ক্ষমতায়ন কারো দয়ায় হবে না নারীকেই তার অধিকার ছিনিয়ে নিতে হবে। এ জন্য শিক্ষার কোন বিকল্প নেই।

দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: কন্যা শিশুদের প্রতি বৈষম্য কি শুধু উন্নয়নশীল দেশেই পরিলক্ষিত হয় নাকি উন্নত দেশেও বৈষম্য দৃষ্ট হয়?

অধ্যাপক ড.তানিয়া হক: কন্যা শিশুর প্রতি অবহেলা প্রদর্শন শুধু যে স্বল্পোন্নত দেশেই পরিলক্ষিত হয় তা নয়। উন্নয়নশীল, এমনকি বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেই কন্যা শিশুদের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করা হয়। বিশ্বে এমন দেশ খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে যেখানে ছেলে শিশু এবং কন্যা শিশুকে একই দৃষ্টিতে দেখা হয়। কন্যা শিশুদের প্রতি এই অবহেলা হঠাৎ করেই শুরু হয়নি। সৃষ্টির আদি থেকেই বিষয়টি আমরা প্রত্যক্ষ করে আসছি। আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে এক শ্রেণির স্বল্প শিক্ষিত মওলানা আছেন যারা নানাভাবে নারী শিক্ষার প্রতি বিরূপ প্রচারণা চালিয়ে থাকেন। তারা বলেন,মেয়েরা ঘরের বাইরে যেতে পারবে না। এতে পর্দার খেলাপ হবে। কিন্তু তারা ইসলামের মূল বাণীকে আড়াল করে যান। ইসলাম ধর্মে বিদ্যার্জনের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে,বিদ্যার্জন করা প্রত্যেকটি নর-নারীর জন্য ফরজ। এখানে কিন্তু নারীদের বাদ দেয়া হয়নি। নারীরা শালিনতা বজায় রেখে যে কোন কাজে নিয়োজিত হতে পারে। ইসলামের সূচনা যুগে নারীরা পুরুষদের পাশাপাশি যুদ্ধ অংশ গ্রহণ করেছে এমন দৃষ্টান্তও আছে। কাজেই নারীদের কোন অজুহাতেই বিদ্যার্জন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যাবে না। কন্যা শিশু যদি উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠতে না পারে তাহলে তারা ভবিষ্যতে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে না। কন্যা শিশুদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার সক্ষমতা অর্জন করে এবং সুযোগ পায়।

দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: কন্যা শিশু বলতে কাদের বুঝবো। কন্যা শিশুদের প্রতি পারিবারিক এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি কেমন বলে মনে করেন?

অধ্যাপক ড.তানিয়া হক: আমাদের দেশে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধক হচ্ছে কন্যা শিশুদের প্রতি পারিবারিক এবং সামাজিক সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, শিশু বলতে আমরা ১৮ বছরের কম বয়সী ছেলে-মেয়েকে বুঝে থাকি। কিন্তু বয়স সীমা এক হলেও ছেলে শিশু এবং কন্যা শিশুদের মধ্যে পার্থক্য বা ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা কম বয়সে বয়:প্রাপ্ত হয়। আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ঝরে পড়া একটি গুরুতর সমস্যা। ছেলে শিশুরা সাধারণত প্রাথমিক পর্যায়ে বেশি ঝরে পড়ে। আর মেয়ে শিশুরা মাধ্যমিক পর্যায়ে বেশি ঝরে পড়ে। এর কারণ হচ্ছে, বেশির ভাগ দরিদ্র পরিবারের অভিভাবক মনে করেন, ছেলেদের বেশি পড়িয়ে কোন লাভ নেই। কারণ ভবিষ্যতে চাকরি পাবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। তার চেয়ে বরং অল্প বয়সে কাজে লাগিয়ে দেয়া হলে সে কিছু অর্থ উপার্জন করতে পারবে, যা সংসারের ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। আর কন্যা শিশুরা বেশি ঝরে পড়ে মাধ্যমিক পর্যায়ে। কন্যা শিশু কিছুটা বাড়বাড়ন্ত হলেই অভিভাবকগণ তার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান। মনে করেন, কোন কারণে যদি মেয়েটি নির্যাতনের শিকার হয় তাহলে তাকে বিয়ে দেয়া যাবে না। তাই তারা চেষ্টা করেন কিভাবে কত দ্রুত মেয়ের বিয়ে দেয়া যায়। প্রায়শই শিক্ষার্থী মেয়েটির অমতেই তাকে বিয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে একটি মেয়ের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ না হলে তাকে বিয়ে দেয়া যায় না। কিন্তু গ্রামাঞ্চলের অভিভাবকগণ মেয়েদের বয়স বাড়িয়ে তার বিয়ের ব্যবস্থা করেন। এ ক্ষেত্রে যে কাজি বিয়ে পড়ান তারও কিছু করার থাকে না। বাল্য বিয়ে কন্যার শিশুর জন্য মারাত্মক অভিশাপ। বাল্যকালে বিয়ে হলে একটি মেয়ের জীবন ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আমাদের দেশের অভিভাবকগণ নারী অধিকার রক্ষায় সোচ্চার। কিন্তু তারা এটা বুঝতে চান না যে, নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে হলে তাকে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। আর নারীদের সচেতন এবং অধিকার আদায়ে সোচ্চার হবার জন্য শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। কন্যা শিশু আমাদের সমাজে যেভাবে বা যতটা নির্যাতনে শিকার হয়ে থাকে ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে ততটা প্রত্যক্ষ করা যায় না। সমাজে ছেলে শিশু আর মেয়ে শিশুর অবস্থান এক রকম নয়। সমাজে ছেলে শিশু যতটা স্বাধীনতা এবং অধিকার ভোগ করে থাকে মেয়ে শিশুরা তা পায় না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে কন্যা শিশুরা বেশি অবহেলিত। পরিবার থেকে ছেলে শিশুর জন্য যেভাবে অর্থ ব্যয় করা হয় মেয়ে শিশুদের ব্যাপারে ততটা করা হয় না। অভিভাবকগণ ছেলে শিশুর পেছনে অর্থ ব্যয়কে এক ধরনের ‘বিনিয়োগ’ বলে বিবেচনা করেন। কারণ তারা মনে করেন, ভবিষ্যতে ছেলে শিশুই ভবিষ্যতে সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু কন্যা শিশুদের জন্য অর্থ ব্যয় করাকে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

এটা কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবে না যে,আমাদের দেশের শিশুরা ভালো নেই। বিশেষ করে কন্যা শিশুরা নানাভাবে অবহেলিত এবং লাঞ্ছিত হচ্ছে। আমাদের সমাজে শিশু শ্রমের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা কষ্টসাধ্য শ্রমে নিযুক্ত থাকছে। তারা ঠিক মতো মজুরি পায় না। সামান্য বিচ্যুতি ঘটলেই তাদের শারিরিক নির্যাতন করা হয়। বিশেষ করে ছেলে শিশুরা কল-কারখানায় কায়িক পরিশ্রম করছে। মেয়েরা তৈরি পোশাক শিল্পে কাজ করছে। তাদের মজুরি দেয়া হয় খুবই কম। কাজে সামান্য এদিক ওদিক হলেই কপালে জোটে নির্যাতন। শ্রমজীবী কন্যা শিশুরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয় বাসা বাড়িতে কাজ করার ক্ষেত্রে। তাদের উপর শারিরিক নির্যাতন চালানো হয়। এমনকি যৌন নির্যাতন চালানোর ঘটনা ঘটছে অহরহ। পথশিশুরা নানাভাবে অবহেলিত এবং নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে এরা এক শ্রেণির বিকৃত রুচির মানুষের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। আমাদের দেশে প্রতিবন্ধি শিশু সংখ্যাও কম নয়। বিশেষ করে প্রতিবন্ধি মেয়ে শিশুরা সমাজে অত্যন্ত অবহেলিত হয়ে থাকে। যৌন কর্মীদের সন্তান তারাও মানুষ। কিন্তু আমরা তাদের অধিকারের বিষয়টি ভুলে যাই। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এমন যে এখানো কোন কন্যা শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হলে তার সমস্ত দায়ভার মেয়েটির উপর গিয়ে বর্তায়। তার ভালো বিয়ে হবে না। তাকে সমাজে অচ্ছুত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু যে বা যিনি নির্যাতন করলেন সমাজে তাকে দায়বদ্ধ করে না। ভবিষ্যৎ জীবনে এই অন্যায়ের জন্য তাকে কোন দায়ভার বহন করতে হয় না। একটি কন্যা শিশু যদি ছোট বেলায় যৌন নির্যাতন বা অন্য কোনভাবে শারিরিক নির্যাতনের শিকার হয় তাহলে সেই অনাকাঙ্খিত ঘটনা,যার জন্য সে নিজে কোনভাবেই দায়ি নয়, তাকে পরবর্তী জীবনে যন্ত্রণা দেবে। আমাদের সমাজ এমনই যে অন্যায় কর্মের শিকার হয়েও কন্যা শিশুকেই তার দায়ভার বহন করতে হয়। আমাদের সমাজে ছেলে শিশুকে পরিবারের জন্য সম্পদ হিসেবে দেখা হলেও কন্যা শিশুকে দায় বলেই মনে করা হয়। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ এবং রাষ্ট্র কোন পর্যায়েই মেয়ে শিশুকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। কন্যা শিশুকে এখনো আমাদের সমাজে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কন্যা শিশুদের চাওয়া পাওয়ার জায়গাটা অত্যন্ত সীমিত।

দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি: কন্যা শিশুদের প্রতি বৈষম্য কতটা প্রকট বলে মনে করেন?

অধ্যাপক ড.তানিয়া হক: কন্যা শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবার আগে পরিবারকে সচেতন হতে হবে। তাদের বুঝতে হবে ছেলে শিশু আর মেয়ে শিশুতে কোন ব্যবধান করা চলবে না। উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হলে একটি কন্যা শিশুও পরিবারের জন্য সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। আমরা যদি বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বিবেচনা করে তাহলে দেখবো,বাংলাদেশের নারীরা অত্যন্ত সৃজনশীল ক্ষমতার অধিকারি। তারা যে কোন কাজ একবার দেখলেই তা রপ্ত করে ফেলতে পারে। কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি সেক্টরেই নারীরা কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছে। নারীদের প্রতি যদি যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয় তাহলে তারা যে কোন অসাধ্য সাধন করতে পারে। তাই শিশু অবস্থাতেই একটি কন্যাকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। পরিবারে একটি কন্যা সন্তানকে সন্তান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। মেয়ে বা পুরুষ সন্তান হিসেবে তাকে বিবেচনা করা যাবে না। শিক্ষাঙ্গনে বা পারিবারিক পরিমন্ডলে একটি কন্যা শিশুকে উপযুক্ত হিসেবে গড়ে উঠার মতো অনুকূল পরিবেশ দিতে হবে। কন্যা শিশুদের জন্য খেলাধুলার ব্যবস্থা করতে হবে। তারা যাতে অন্য শিশুদের সঙ্গে ভাব বিনিময় করতে পারে তেমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। ছেলে শিশুদের জন্য যেমন খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা আছে মেয়ে শিশুদের জন্যও তেমনটি থাকা দরকার। কোন ক্ষেত্রেই ছেলে শিশু ও মেয়ে শিশুর মধ্যে কোন ভেদাভেদ করা যাবে না। তাদের একই ভাবে সামান সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বেড়ে উঠার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

উন্নত দেশগুলোতে একজন মহিলা সন্তান জন্মদানের সময় তার স্বামীকে উপস্থিত রাখা হয়, যাতে সে বুঝতে পারে সন্তান জন্মদান করা কতটা কষ্টদায়ক। এতে নারীদের প্রতি তাদের মনোভাব ইতিবাচক হতে সাহায্য করে। আমাদের দেশে এক শ্রেণির পুরুষ মানুষ আছেন যারা নারীদের মানুষের মতো মর্যাদা দিতে ইচ্ছুক নন। এমন কিছু কাজ করা প্রয়োজন যাতে একজন পুরুষ বুঝতে পারে নারীরা কতটা কস্ট সহ্য করে। একজন মা সন্তান জন্ম দেন। কিন্তু সেই সন্তান যদি মেয়ে হয় তাহলে বড় তাকে নানা রকম কষ্ট সহ্য করতে হয়। সমাজে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে তাকে বেড়ে উঠতে হয়।

ছেলে এবং মেয়ে শিশুরা হচ্ছে একটি গাছে দু’টি ফুলের মতো। অথবা এক দেহে দুই বাহুর মতো। একটি ছাড়া অন্যটি অসম্পূর্ণ। কন্যা শিশুদের প্রতি পরিবার,সমাজ ও রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক হতে হবে। কন্যা শিশুদের প্রতি কোন ধরনের বৈষম্য প্রদর্শন করা যাবে না। আমাদের এবারের আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবসের অঙ্গিকার হোক, কন্যা শিশুদের প্রতি আর নয় বৈষম্য। ছেলে শিশু আর মেয়ে শিশুদের প্রতি আমরা সমান গুরুত্ব দেবো। ছেলে শিশু আর মেয়ে শিশুরাই সম্মিলিতভাবে গড়ে তুলবে আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে মেয়ে শিশুকে আমরা লিডার হিসেবে দেখতে চাই, নাকি লায়াবিলিটি হিসেবে দেখতে চাই? এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়।

Facebook Comments Box

Posted ০৪:২৯ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১২ অক্টোবর ২০২৫

bankbimaarthonity.com |

আর্কাইভ ক্য

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com