নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | 3 বার পঠিত
দেশের ক্ষুদ্রঋণ খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং কাঠামোর আওতায় আনতে এবং ঋণগ্রহীতাদের সরাসরি মালিকানা নিশ্চিত করতে ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে অন্তর্র্বতী সরকার। এই অধ্যাদেশ কার্যকর হলে দেশের প্রচলিত এনজিওভিত্তিক মাইক্রোক্রেডিট ব্যবস্থার বাইরে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিশেষায়িত ব্যাংকিং কাঠামো গড়ে উঠবে, যেখানে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতারাই হবেন মূল শেয়ারহোল্ডার।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) আইন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। গেজেটে বলা হয়েছে, নতুন এই ব্যাংক মূলত সামাজিক ব্যবসার ধারণায় পরিচালিত হবে এবং এর লক্ষ্য হবে দারিদ্র্য বিমোচন, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বিকাশ।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা এবং প্রাথমিকভাবে পরিশোধিত মূলধন হতে হবে কমপক্ষে ২০০ কোটি টাকা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ব্যাংকের মোট শেয়ারের অন্তত ৬০ শতাংশ মালিকানা থাকবে সাধারণ ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের হাতে। ফলে ঋণগ্রহীতারা এখানে শুধু গ্রাহক নন, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারবেন। তবে ব্যাংকটি কোনোভাবেই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারবে না।
অধ্যাদেশে ব্যাংকটিকে একটি সামাজিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, ব্যাংক থেকে অর্জিত মুনাফা ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ না করে পুনরায় ব্যাংকের কার্যক্রম সম্প্রসারণ, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করতে হবে। বিনিয়োগকারীরা কেবল তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন, অতিরিক্ত মুনাফার দাবি করতে পারবেন না। তবে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষেত্রে সীমিত আকারে মুনাফা বণ্টনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
নতুন আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স গ্রহণ সাপেক্ষে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় এই ব্যাংক পরিচালিত হবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ হবে ৯ সদস্যের, যেখানে ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্য থেকে নির্বাচিত ৪ জন পরিচালক থাকবেন। এছাড়া সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনোনীত ৩ জন পরিচালক, ২ জন স্বতন্ত্র পরিচালক এবং ভোটাধিকারবিহীন একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। কোনো পরিচালক পরপর দুই মেয়াদের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না, এতে নেতৃত্বে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
ব্যাংকের কার্যক্রমের মধ্যে থাকবে আমানত সংগ্রহ, ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ প্রদান, উদ্যোগ মূলধন সরবরাহ, কৃষি, মৎস্য, গবাদিপশু পালন, কুটির শিল্প ও যন্ত্রপাতি খাতে আর্থিক সহায়তা। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের জন্য বিনা মূল্যে কারিগরি জ্ঞান, ব্যবসা ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে যা প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার তুলনায় এটিকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দেবে।
ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক প্রয়োজনে অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে। তবে ঋণ আদায়ে কোনো ধরনের জবরদস্তি, হয়রানি বা সামাজিকভাবে অবমাননাকর পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে না—এ বিষয়ে অধ্যাদেশে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টিকে সামাজিকভাবে সংবেদনশীল খাত হিসেবে বিবেচনা করে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান, তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ বাতিল, চেয়ারম্যান বা পরিচালক অপসারণ এবং ব্যাংকের কার্যক্রম স্থগিত করার ক্ষমতাও প্রয়োগ করতে পারবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের কার্যক্রম ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ এবং মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আইন, ২০০৬ এর প্রাসঙ্গিক বিধান অনুসরণ করে পরিচালিত হবে।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, সরকার শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি করে এই আইনের কার্যকর তারিখ ঘোষণা করবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থায় একটি বড় কাঠামোগত পরিবর্তন আসতে পারে এবং ঋণগ্রহীতাদের ক্ষমতায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
Posted ৭:৩৯ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy